
ছবি: সংগৃহীত
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন শেষে বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফেরাতে চার দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখ্য সংগঠক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৪র্থ বৈঠকে লিখিত প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকট শুধু ঘোষিত খেলাপি ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ওই বছর শেষে ব্যাংক খাতের বিপন্ন সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
প্রস্তাবে ব্যাংক খাতের সংকটের পেছনে ঋণগ্রহীতার তথ্য সরবরাহে স্বার্থের সংঘাত, ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ এবং শাখা পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্বল নজরদারিকে দায়ী করা হয়েছে।
প্রথম প্রস্তাবে জাতীয় ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা চালু এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণসীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ঋণগ্রহীতার তথ্য ব্যাংকের একক নিয়ন্ত্রণের বাইরে এনে স্বাধীন তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সীমার বাইরে ঋণ দিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আগাম অনুমোদন, লিখিত ব্যতিক্রমী কারণ এবং কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তার ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে ৯০ দিনের ঋণ শ্রেণীকরণ বিধি কঠোরভাবে বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে। ৩১ আগস্ট জারি করা পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতিমালার শিথিলতার বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, অতীতে কম ডাউন-পেমেন্টে বড় ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হলেও এতে খেলাপি ঋণ কমেনি; বরং বেড়েছে।
তৃতীয় প্রস্তাবে ইচ্ছাকৃতভাবে অসত্য বা অসম্পূর্ণ ঋণতথ্য দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংককে জরিমানা না করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অনুমোদনকারী পরিচালকের ব্যক্তিগত দায় নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
চতুর্থ প্রস্তাবে বড় ঋণের ক্ষেত্রে ক্রেডিট রেটিং সংস্থার নির্বাচন ও ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া ঋণগ্রহীতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অধীনে রেটিং এজেন্সির একটি পুল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি রেটিং সংস্থার অতীতের নির্ভুলতার রেকর্ড প্রকাশের কথাও বলা হয়েছে।
এদিকে, অর্থঋণ আদালতে বর্তমানে ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পৃথক বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন হাসনাত।
সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া প্রস্তাবে খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি সংস্কারের ধীরগতিতেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। সংকটাসন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইন-২০০৩-এর সংশোধনী দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় আগামী বৈঠকের জন্য ছয়টি সিদ্ধান্তও প্রস্তাব করেছেন হাসনাত। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক রেজোলিউশন (সংশোধন) বিল-২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিল, ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় ক্রেডিট স্কোরিং কাঠামোর বাস্তবায়ন রূপরেখা, পুনঃতফসিল নীতিমালা পর্যালোচনা এবং প্রতি তিন মাসে শাখাভিত্তিক খেলাপি ঋণ ও ঋণসীমা ব্যত্যয়ের প্রতিবেদন দাখিল।
এছাড়া অসত্য ঋণতথ্যের জন্য ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠায় ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী এবং সংকটাসন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন ও অর্থঋণ আদালত আইনের সংশোধনের অগ্রগতি কমিটিতে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
গত রোববার জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৪র্থ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ব্যাংক রেজোলিউশনের ১৮(ক) ধারা সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের চাপে বাতিল করেছে। রুগ্ন শিল্পে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি। তার আশঙ্কা, বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণ করা হলে রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা যাতে নতুন করে ঋণ নিতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
