ছবির উৎস, Getty Images
১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অস্থিরতা চলছে, তখন যুদ্ধের খবর আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য বিবিসি নতুন কিছু ভাষা বিভাগ চালু করার উদ্যোগ নেয়। যার মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলা—যেটির প্রথম সম্প্রচার হয় সে বছরের ১১ই অক্টোবর। তখন থেকে গত ৮৫ বছরে বিশ্বের বাংলাভাষীদের কাছে নানা সময়ে সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পাশে থেকেছে বিবিসি বাংলা।
শুরুর গল্পটা অবশ্য আজকের দিনের তুলনায় বেশ সংক্ষিপ্ত। লন্ডন থেকে প্রচারিত প্রথম অনুষ্ঠানটির দৈর্ঘ্য ছিল সপ্তাহে মাত্র ১৫ মিনিট!
আজকের রিলস বা শর্টসের যুগে ১৫ মিনিটকে বেশ দীর্ঘ মনে হতে পারে, কিন্তু তখন গোটা সপ্তাহের বিশ্বযুদ্ধের খবর জানার জন্য এটুকু সময়ই পেতেন শ্রোতারা।
মজার বিষয় হলো, শুরুর দিকে লন্ডনে বিবিসির ইন্ডিয়া সেকশনে বসে বাংলা অনুষ্ঠানের তদারকি করতেন এবং ইংরেজি কপিগুলো লিখতেন এরিক ব্লেয়ার নামের এক ব্যক্তি, সাহিত্যজগৎ যাকে চেনে জর্জ অরওয়েল নামে।
তার কালজয়ী উপন্যাস ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’ কিংবা ‘১৯৮৪’ লেখার আগেই তিনি বিবিসি বাংলার সূচনার সাথে জড়িয়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু অরওয়েল তখন জানতেন না, লন্ডনের স্টুডিওতে শুরু হওয়া এই ছোট্ট অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংবাদমাধ্যম একদিন শুধু বিশ্বজুড়ে কোটি-কোটি বাঙালির কাছে শুধু পৌঁছুবেই না, এমন এক দেশের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যাবে, যে দেশটির জন্মই তখনও হয়নি!
ছবির উৎস, Getty Images
১৯৪৪ সালে অনুষ্ঠানের পরিধি বেড়ে যুক্ত হয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বিচিত্রা’।
এরপর ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসিত ভারত ভাগ হলো। নতুন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিল বিবিসি বাংলা।
খবরের পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আলোচনার হাত ধরে ধীরে ধীরে সামনে চলে এলো উত্তপ্ত রাজনীতি।
ষাটের দশকে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে যাত্রা শুরু করে ‘প্রবাহ’- যা কেবল একটি অনুষ্ঠানের নাম থাকেনি, হয়ে উঠেছিল বিবিসি বাংলার পরিচয়ের অংশ।
বিবিসি তখন শুধু দূরের পৃথিবীর খবরই বলছে না, বলছে বাঙালির চারপাশে কী ঘটছে।
ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকবদল- বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ওয়ান-ইলেভেন এবং ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময়ে বিবিসি বাংলা পাঠক-দর্শক এবং শ্রোতাদের কাছে নিয়ে গেছে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ।
বিশ্বের বড় সব ঘটনাপ্রবাহ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জানা-অজানা নানা বিষয় নিয়ে বিবিসি বাংলা তার বাংলাদেশ, ভারত এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী পাঠক-দর্শকদের কাছে সংবাদ পরিবেশন করেছে।

এর মধ্যে ১৯৭১ সাল বিবিসি বাংলার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ককে চিরতরে বদলে দেয়।
২৫শে মার্চের পর সেনা অভিযান, নিপীড়ন আর কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যেও রেডিওর তরঙ্গ থামানো সহজ ছিল না।
সংবাদদাতারা মাঠ থেকে খবর পাঠিয়েছেন, আর মানুষ আশ্বাসের জন্য জড়ো হয়েছে রেডিওর চারপাশে।
এই ভালোবাসার সবচেয়ে অদ্ভুত ও সুন্দর নিদর্শনটি তৈরি হয়েছিল পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে।
একাত্তরে সেখানকার এক ছোট্ট চায়ের দোকানে থাকা একটিমাত্র রেডিওতে প্রতি সন্ধ্যায় বিবিসি শুনতে ভিড় জমাতেন স্থানীয়রা।
পাকিস্তানি সেনাদের গাড়ির শব্দ পেলে সবাই ছুটে পালাতেন, গাড়ি চলে গেলে আবার ফিরে এসে বসতেন রেডিওর সামনে।
সেই চায়ের দোকানের জটলা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আস্ত এক বাজার, মানুষের মুখে মুখে যার নাম হয়ে যায় ‘বিবিসি বাজার’।
একটি সংবাদমাধ্যমের নামে ভবন বা স্টুডিও হয়, কিন্তু একটা বাজার? এমনটা কেবল শ্রোতাদের নিখাদ ভালোবাসা থেকেই তৈরি হওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সামরিক শাসন, হরতাল, বিক্ষোভ কিংবা নির্বাচনের উত্তাপে বিবিসি বাংলার সাংবাদিকরা কখনো গ্রেফতারের মুখোমুখি হয়েছেন, কখনো লুকিয়ে পাঠিয়েছেন খবর।
তবে বিবিসি বাংলার গল্প কেবল রাজনীতির বা ক্ষমতার করিডোর নিয়ে নয়।
সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন কিংবা প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
দুর্যোগের খবর মানে শুধু সংখ্যার হিসাব নয়- কার ঘর ভেসে গেল, কে আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখল, সেই মানুষগুলোর গল্পও তুলে ধরেছে বিবিসি বাংলা।

বিবিসিতে একটি কথা আমরা বলি, ‘ট্রাস্ট ইজ আর্নড’ – অর্থাৎ ‘বিশ্বাস অর্জন করতে হয়’। বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালারও প্রথম কথাটিই হচ্ছে ‘বিশ্বাস’, এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অডিয়েন্সের কাছে দায়বদ্ধতা।
আর সেই বিশ্বাস থেকেই শত পরিবর্তনের মাঝেও মানুষ বারবার বিবিসি বাংলার সাথে থেকেছে।
বিবিসি বাংলার এই দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস শুধুমাত্র সংবাদ পরিবেশনের নয়, সময়ের সাথে সাথে নতুন প্রযুক্তির সাথেও নিজেকে বিবর্তন করেছে বিবিসি।
গত ৮৫ বছরের মধ্যে ৮১ বছর বিবিসি বাংলার সবচেয়ে পরিচিত মাধ্যমটি ছিল রেডিও। ২০২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর যখন বিবিসির আরও কিছু ভাষা বিভাগের সাথে বাংলা ভাষায়ও রেডিও বন্ধ হয়ে যায়।
সেই রাতে যখন থেমে যায় চিরচেনা ‘প্রবাহ’ আর ‘পরিক্রমা’র সুর তখন শ্রোতাদের মধ্যে যে দুঃখ আমরা দেখেছি, সেটি বিবিসি বাংলার প্রতি তাদের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
তবে প্রযুক্তিগত কারণে রেডিওর শ্রোতা কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে বিবেচনা করতে হয়েছে।
রেডিওর দিনগুলো যতই আবেগের হোক না কেন, চারপাশে সবার হাতে যখন স্মার্টফোন, তখন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নতুন মাধ্যমে জায়গা করে নেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।
বিবিসি বাংলা তাই দীর্ঘদিনের লিগ্যাসি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরে এলেও অডিয়েন্সের কাছে আরও প্রাসঙ্গিক হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমে।
২০০৫ সালে ওয়েবসাইট চালুর মধ্য দিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিবিসি বাংলার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২২ সালের পর তাতে পুরোদমে মনোনিবেশ করেছে বিবিসি।
আগে সাংবাদিকদের ভাবনা ছিল খবরটা কীভাবে শোনানো যাবে; এখনকার প্রশ্ন- খবরটা মোবাইলের পর্দায় কীভাবে দেখানো ও বোঝানো যাবে।

এই ডিজিটাল রূপান্তরের একটি বড় পরীক্ষা দেখা যায় ২০২৪ সালে।
বাংলাদেশ যখন এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট ও গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি হলো, যখন তথ্যের গতি ছিল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি এবং ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় চারপাশ তথ্যের অন্ধকারে ডুবে ছিল।
তখন বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাভাষীর কাছে তাৎক্ষণিক খবর নিয়ে হাজির হয়েছে বিবিসি বাংলা।
অনলাইন এবং সামাজিক মাধ্যমে নানা মত-পথ, সত্য এবং অপতথ্যের ভিড়ে বিবিসি বাংলা আরও জোরালোভাবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের চর্চা করে এসেছে।
কারো অনুরাগ বা বিরাগভাজন হবার পরোয়া করেনি।
এরই মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে বিবিসি বাংলার পদচারণা আরো বিস্তৃত হয়েছে।
জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক এবং ইউটিউবের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম, যা বিবিসি বাংলাকে তরুণ অডিয়েন্সের আরো কাছে নিয়ে এসেছে।
টেলিভিশনেও বিবিসি বাংলা নতুনত্ব নিয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছেছে।
রাজনীতিক এবং ক্ষমতাবানদের প্রশ্নের মুখোমুখি করতে চালু করেছিল ‘বাংলাদেশ সংলাপ’।
পরবর্তীতে টেলিভিশনের পর্দায় চালু হয়েছে ‘বিবিসি প্রবাহ’ এবং ‘বাংলাদেশ ট্রেন্ডিং’।

ডিজিটাল মাধ্যমেও বাংলা ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ভিডিও কন্টেন্ট তৈরিতেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে বিবিসি বাংলা।
বিশ্বজুড়ে কোভিড মহামারির সেই কঠিন সময়ে নানা অপতথ্যের ভিড়ে পাঠক-দর্শকদের জন্য বস্তনিষ্ঠ এবং তথ্যভিত্তিক খবরাখবর নিয়ে এসেছে।
নানা জটিল বিষয়কে সহজভাবে দর্শকের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে, যে ধারা অব্যাহত আছে এবং সময়ের সাথে আরো বিবর্তিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানী এবং ঘটনার গভীরে গিয়ে সংবাদ পরিবেশনে গুরুত্ব বাড়ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের এই রোমাঞ্চকর এবং একইসাথে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার এই সময়ে সাংবাদিকতায় পেশাদারত্ব এবং বস্তুনিষ্ঠতার গুরুত্ব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বিবিসি বাংলা পেশাদারত্বের সাথে বরাবরের মতোই নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
আজ বিবিসি বাংলা আর শুধু লন্ডনের একটি রেডিও সার্ভিস নয়; ঢাকা, কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাংবাদিকদের নেটওয়ার্ক মিলিয়ে একটি আধুনিক ডিজিটাল নিউজরুম।
সময়ের সাথে বিবিসি বাংলার এই প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তন, সংবাদ এবং সংবাদ পরিবেশনের ধরন নিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের নানা মতামত আছে এবং থাকবে, এবং তার সবগুলোই আমরা গুরুত্বের সাথে নিই।
সময়ের সাথে সাথে বিবিসি বাংলা আরো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে, কিন্তু যে বিষয়টি বিবিসি বাংলার ৮৫ বছর আগে থেকে ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে, তা হচ্ছে সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং দর্শক-পাঠক-শ্রোতাদের প্রতি বিবিসি বাংলার দায়বদ্ধতা।

