দৈনন্দিন রান্নায় স্বাদ বাড়াতে নুন বা লবণের ভূমিকা অপরিহার্য। তবে স্বাস্থ্য সচেতনতার যুগে এখন সাধারণ সাদা নুন বা টেবিল সল্টের (Table Salt) পাশাপাশি রান্নাঘরে জায়গা করে নিয়েছে বিট নুন (Black Salt)। ফল বা স্যালাড তো বটেই, অনেকে রান্নায় বা লেবুর জলেও বিট নুন ব্যবহার করতে বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের নিরিখে এই দুই নুনের মধ্যে কোনটি বেশি উপকারী?

রসায়নের ভাষায় দুটি নুনই সোডিয়াম ক্লোরাইড হলেও, এদের তৈরি হওয়ার উৎস ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সাধারণ লবণ (Table Salt): এটি মূলত সমুদ্রের জল বা খনি থেকে পাওয়া নুন পরিশোধনের (Refine) মাধ্যমে তৈরি হয়। এই পরিশোধন প্রক্রিয়ায় নুনের প্রাকৃতিকভাবে থাকা খনিজ উপাদানগুলি নষ্ট হয়ে যায়। তবে এতে কৃত্রিমভাবে আয়োডিন মেশানো হয়, যা থাইরয়েডের সমস্যা দূর করতে অত্যন্ত জরুরি। বিট নুন (Black Salt): এটি এক প্রকার হিমালয় অঞ্চলের খনিজ লবণ। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই নুনকে কয়লা ও অন্যান্য ভেষজ উপাদানের সঙ্গে উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে তৈরি করা হয়। এর ফলে এতে থাকা সালফারের কারণে একটি বিশেষ গন্ধ ও হালকা গোলাপি-কালো রঙ তৈরি হয়। বিট নুন রিফাইন বা পরিশোধিত করা হয় না বলে এর প্রাকৃতিক খনিজ উপাদানগুলি অক্ষুণ্ণ থাকে।

পুষ্টিবিদদের মতে, দুটি নুনেরই নিজস্ব কিছু ভালো ও মন্দ দিক রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে বিট নুন সাধারণ নুনের চেয়ে বেশি উপকারী প্রমাণিত হতে পারে। সাধারণ সাদা নুনের তুলনায় বিট নুনে সোডিয়ামের পরিমাণ কিছুটা কম থাকে। শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম জমা হলে জল জমার (Water Retention) সমস্যা দেখা দেয়, যা ওজন বাড়িয়ে তোলে। বিট নুন খেলে এই জল জমার সমস্যা কম হয়, যা পরোক্ষভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বিট নুনকে অত্যন্ত উপকারী বলে মনে করা হয়। এতে থাকা প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান ও সালফার যৌগ পেটের অম্লতা দূর করে পাচক রস ক্ষরণে সাহায্য করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস, অম্বল বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যায় বিট নুন তাৎক্ষণিক আরাম দেয়। সাধারণ নুনে শুধুমাত্র সোডিয়াম ও আয়োডিন থাকে। অন্যদিকে, বিট নুনে সোডিয়াম ছাড়াও অল্প পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো জরুরি খনিজ উপাদান প্রাকৃতিক রূপেই উপস্থিত থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের রোগীদের জন্য নুন খাওয়া এমনিতেই ক্ষতিকর। অনেকেই মনে করেন সাধারণ নুন বন্ধ করে বিট নুন খেলে ব্লাড প্রেশার বাড়বে না। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। সাধারণ নুনের চেয়ে সোডিয়াম কম হলেও বিট নুনেও যথেষ্ট পরিমাণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই ব্লাড প্রেশার বা হৃদরোগের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে দুই ধরনের নুনই মেপে খাওয়া উচিত।

দিনের শেষে কোনও নুনই অতিরিক্ত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে ৫ গ্রামের (১ চা চামচ) বেশি নুন খাওয়া উচিত নয়।

শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি মেটাতে ও থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের রান্নায় আয়োডিনযুক্ত সাধারণ সাদা নুন ব্যবহার করা জরুরি। তবে হজমের সমস্যা দূর করতে, স্যালাড, টক দই বা ফলের স্বাদে ভিন্নতা আনতে এবং সোডিয়ামের মাত্রা সামান্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডায়েটে বিট নুন রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ, সুস্থ থাকতে কোনও একটির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে, রান্নায় সাধারণ নুন এবং পরিপূরক হিসেবে বিট নুনের পরিমিত ব্যবহারই হতে পারে সেরা বিকল্প।

তথ্য- হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের বিভিন্ন গবেষণাপত্র।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *