ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নানা সময় আলোচনা সামনে এসেছে। কথা হয়েছে বিচারকের জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রসঙ্গেও।
বিচারক সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর সাজা নির্ধারণ করেন, যা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু, একজন বিচারকের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, দুর্নীতি কিংবা ত্রুটিপূর্ণ বিচারের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়টিও নানা সময় ঘুরেফিরে সামনে এসেছে।
সম্প্রতি, ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা এবং পিরোজপুরে একটি মামলার রায় নিয়ে আবারও বিচারকদের জবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে এলো।
যেখানে নিম্ন আদালত বা বিচারিক আদালতের দুইজন বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত।
এমনকি নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকারী বিচারক মামুনুর রশিদের ফৌজদারি বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহারের কথাও বলেছে হাইকোর্ট বিভাগ।
পৃথক দুই ঘটনায় বিচারকের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার নজির পাওয়া গেছে বলে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।
যা বিচারকদের জবাবদিহিতার বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে। এক্ষেত্রে বিচার ব্যবস্থার যে-কোনো পর্যায়ে একজন বিচারক বা বিচারপতির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আর এর প্রক্রিয়াই বা কী?
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থায় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য ঠিক রাখতে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।
এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ায় বিচারিক আদালতের বিষয়ে যেমন বিচারপতিরা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, তেমনি সর্বোচ্চ আদালতের বিষয়েও রয়েছে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।
এছাড়া বিচার ব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সর্বোপরি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন অর্থাৎ সংবিধান, সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
ছবির উৎস, Getty Images
দুই বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কেন
মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ২০১৯ সালে ফেনীর নিম্ন আদালত যে রায় দিয়েছিল, সেখানে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু ২৪শে অগাস্ট হাইকোর্ট ডিভিশনের দেওয়া এই মামলার রায়ে বড়ো ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যেখানে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের মধ্যে চারজনকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দশ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে এই মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায় নিয়েও।
হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে, এই মামলার রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারক তার দায়িত্ব পালনের বিচারিক যে জুডিসিয়াল মনোভাব থাকা দরকার, সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢালাওভাবে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকটা ‘মাইন্ড লেস সেন্টেন্স’ বলেও উল্লেখ করেছে হাইকোর্ট।
রায় ঘোষণার পর গণমাধ্যমকে হাইকোর্টের এসব পর্যবেক্ষণের কথা জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
তিলি বলেন, “একজন বিচারকের কোনো মামলায় দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের বিচারিক মন প্রয়োগ করার প্রয়োজন, বিচারক মামুনুর রশিদ সেই বিচারিক মন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন বলে হাই কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।”
বহুল আলোচিত এই মামলায় ফেনীর নিম্ন আদালত বা বিচারিক আদালতের যে বিচারক ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন, তার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এদিকে, পিরোজপুরে প্রায় দেড় দশক আগের একটি হত্যা মামলায়, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়ায় বিচারক মো. কবির উদ্দিন প্রামাণিক এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এই মামলায় উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিবদ্ধ করার সময় ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি, যা নিয়ম বহির্ভূত।
ছবির উৎস, BBC/JANNATUL TANVEE
বিচারকের জবাবদিহি
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভারসাম্য রক্ষার আলোচনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বিচারাঙ্গনে ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তন হয়েছে।
বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা নিয়েও বাংলাদেশের সংবিধানে বেশ কয়েকবার বড়ো পরিবর্তন এসেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিকভাবে এই ক্ষমতা ছিল জাতীয় সংসদের হাতে। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন চালু হলে সেই ক্ষমতা চলে যায় রাষ্ট্রপতির কাছে।
এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে।
২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ষোড়শ সংশোধনী পাস করে। যেখানে আবারও বিচারপতি অপসারণের এখতিয়ার সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারও পুনর্বহাল করা হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, যা বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল হলো উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অযোগ্যতা বা অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত ও অপসারণের ক্ষমতা সম্পন্ন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলছেন, বিচারকদের বিরুদ্ধে ওঠা যে-কোনো অভিযোগ যাচাই, নিষ্পত্তি এবং ব্যবস্থা নেওয়ার মূল দায়িত্ব সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অসদাচরণসহ কোনো অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থা নিতে পারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।
“সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল চাইলে একজন বিচারককে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দিতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মোরসেদ।
তবে, অধস্তন বিচারিক আদালত- অর্থাৎ নিম্ন আদালত-এর ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগে হাইকোর্টকে বিশেষ অধিকার দিয়েছে সংবিধান।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলছেন, “হাইকোর্টের একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে সংবিধানে, যেটাকে ওয়ান জিরো নাইন বলা হয়। সুপারিনটেনডেন্স কন্ট্রোল অব হাইকোর্ট ডিভিশন ওভার অল দ্যা কোর্টস, বিলোও দ্যা হাইকোর্ট ডিভিশন।”
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অর্থাৎ অধিনস্ত যে-কোনো ট্রাইবুনাল বা কোর্টের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ ওঠে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনাল বা কোর্টের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে হাইকোর্ট।
“সংবিধানেই এই ক্ষমতা দেওয়া আছে। যদিও এই ক্ষমতা খুবই সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. করিম।
তিনি বলছেন, অধস্তন আদালতের কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও হাইকোর্টের ওপর ন্যস্ত। এক্ষেত্রে হাইকোর্ট চাইলে সরাসরি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তও করতে পারে।
এছাড়া নিম্ন আদালত বা বিচারিক আদালতের কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে আইন মন্ত্রণালয়ও ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জানান অ্যাডভোকেট মনজীল মোরসেদ।
বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে মি. মোরসেদ বলছেন, “কোনো মামলার রায় যদি ঊর্ধ্বতন আদালতে বাতিল হয়ে যায়, তাহলে সেখানে তো বেনিফিট হয়েই গেল। তারপরও যদি মোর সিরিয়াস হয়, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারককে ভর্ৎসনা বা তিরস্কার করে বা তাকে সতর্ক করে উচ্চ আদালত।”
রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন বিচারকে প্রভাবিত হওয়ার বা দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেই মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞ ফৌজিয়া করিম ফিরোজ।
“বিচারকরা অনেক সময় মিডিয়া ট্রায়াল বা সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণায় প্রভাবিত হচ্ছেন, কিংবা কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা পক্ষপাত-এর অভিযোগ উঠছে। যার ফলে এই ধরনের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
বিচারকদের জবাবদিহির বিষয়ে তিনি বলছেন, “একজন জজের (ফৌজদারি) বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এর থেকে বড়ো শাস্তি আর কী হতে পারে। তাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে।”
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন মিজ ফিরোজ। বিচার ব্যবস্থার ভারসাম্য এবং নিরপেক্ষ অবস্থায় নিশ্চিত করা জরুরি বলেই মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
“একটি মামলায় ১৬ জন আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। কিন্তু সব আসামিই কি হত্যাটা করেছে। অপরাধের ধরণ ও মাত্রায় তফাত থাকতে পারে,” বলেন মিজ ফিরোজ।
