প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার। বৃহস্পতিবার দিল্লির একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর প্রয়াণে ইতিহাসচর্চার জগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
১৯৩৯ সালে জন্ম সুমিত সরকারের। তাঁর বাবা সুশোভনচন্দ্র সরকারও ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ। ফলে ছোটবেলা থেকেই ইতিহাসচর্চার আবহে তাঁর বেড়ে ওঠা। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী সুমিত সরকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা করেন তিনি। এছাড়াও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
– বিজ্ঞাপন –
বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে সুমিত সরকারের নাম গভীর ভাবে জড়িত। তাঁর লেখা ‘Swadeshi Movement in Bengal’ এই বিষয়ে ইতিহাসচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিহাসের ছাত্রছাত্রী এবং গবেষকদের মধ্যে বইটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
এ ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘Writing Social History’ এবং ‘Modern India’। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ইতিহাস, নারী ইতিহাস এবং রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা ও লেখালেখি করেছেন তিনি।
সুমিত সরকারের ইতিহাসচর্চায় বামপন্থী ও মার্কসীয় চিন্তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। পরবর্তী সময়ে সাবঅলটার্ন বা নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার প্রাথমিক পর্বের অন্যতম প্রবক্তা হিসাবেও পরিচিতি পান তিনি। তবে পরবর্তী সময়ে সাবঅলটার্ন স্টাডিজের বেশ কিছু প্রবণতার সমালোচনাও করেন। তাঁর ‘The Decline of the Subaltern in Subaltern Studies’ প্রবন্ধটি সাম্প্রতিক ইতিহাসচর্চায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
ভারতে দক্ষিণপন্থী চরমপন্থী শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন কলম ধরেছেন সুমিত সরকার। পাশাপাশি সমাজ-ইতিহাস ও নারী ইতিহাস নিয়েও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। ইতিহাসের ঘটনাকে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।
বিজ্ঞাপন
২০০৪ সালে তাঁর ‘Writing Social History’ গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে রবীন্দ্র পুরস্কার পান তিনি। তবে ২০০৭ সালে কৃষকদের জমি অধিগ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের নীতির প্রতিবাদে সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন সুমিত সরকার। তাঁর এই সিদ্ধান্ত তাঁর আপসহীন রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক অবস্থানের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি দক্ষিণপন্থী চরমবাদের বিরুদ্ধেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হল।
সুমিত সরকারের স্ত্রী তনিকা সরকারও দেশের প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ। ইতিহাসচর্চায় তাঁরও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
