তপন মল্লিক চৌধুরী
মূলস্রোতের মিডিয়া মূক ও বধির হয়ে গেলেও পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জমি, জঙ্গল, পাহাড় এবং জাতিসত্তার অধিকারের দাবিগুলি একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি হল এক বিশাল প্রতিরোধের মঞ্চ। এই রাজ্যে এমন ব্যাপক জনসমাবেশ এর আগে সম্ভবত হয়েছে বলে মনে পড়ে না। অথচ মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুলি অদ্ভুতভাবেই নীরব। এর কারণ হিসাবে বলা যায়, প্রান্তিক মানুষের কথা, তাঁদের লড়াই, তাঁদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস সাধারণত সংবাদমাধ্যমে দেখা যায় না।
গত ২ নভেম্বর পুরুলিয়ার মানবাজার ১ নম্বর ব্লকের পাথরকাটা ফুটবল ময়দানে জল-জঙ্গল-জমির অধিকার রক্ষা অথবা আদিবাসী সম্প্রদায়ের কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং জীবন-জীবিকার সুরক্ষার দাবিতে, রেয়ার আর্থ উত্তোলনের বিরোধিতায় বা পুরুলিয়া জেলাজুড়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে রেয়ার আর্থ (Rare Earth) খনিজ উত্তোলনের বিরুদ্ধে, খনি কিংবা সোলার প্রজেক্টের নামে আদিবাসীদের নিজস্ব বাস্তু, বন ও পাহাড় পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে এবং এলাকাজুড়ে দূষণ সৃষ্টিকারী কারখানা বন্ধের দাবিতে সোচ্চার প্রতিবাদ জানাতে ও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হন।
পাথরকাটা ফুটবল ময়দানে ২ নভেম্বরের জনসমাগমকে ঐতিহাসিক আদিবাসী মহাসমাবেশ বলে অভিহিত করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে এবং সামাজিক মাধ্যমে এই সমাবেশে লক্ষাধিক আদিবাসী মানুষ যোগদান করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অযোধ্যা পাহাড় এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনে করে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। ভিড় এতটাই বেশি ছিল যে বহু মানুষ মাঠের ভেতরে ঢোকার জায়গা পাননি।
অংশগ্রহণকারীদের মূল দাবি ছিল আদিবাসী সমাজের ঐক্য রক্ষা, জল-জঙ্গল-জমির অধিকার রক্ষা, জীবন-জীবিকার সুরক্ষা এবং অ-আদিবাসীদের ভুয়ো তফশিলি উপজাতি (ST) তালিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এ ছাড়াও পুরুলিয়ায় আদিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্প প্রকল্পের বিরুদ্ধেও সরব হন আদিবাসী নেতৃত্ব। সমাবেশে যোগ দেওয়া মানুষজন নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষার স্লোগান তুলে এই ঐতিহাসিক সমাবেশকে সফল করে তোলেন। এই মহাসমাবেশের কারণে মানবাজারের পাথরকাটা সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয় এবং রাস্তাঘাটে প্রবল ভিড় ও যানজটের সৃষ্টি হয়।
সমাবেশে সরকারের স্তুতি, কর্পোরেট স্বার্থের জয়গানের বদলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে মানুষ মাটি, জঙ্গল, পাহাড়ের কথা বললেও প্রান্তিক মানুষের সমাগম জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এই অভূতপূর্ব জনজোয়ারকে বলা যায়, প্রান্তিক মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা এবং স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার এক শক্তিশালী আন্দোলনের ইঙ্গিত। জঙ্গলমহলের জল, জঙ্গল, পাহাড় ও নিজেদের আদিভূমি রক্ষার লড়াইয়ে আদিবাসী সমাজ যে অনড়, জনসমাগম তারই বার্তা দেয়।
এই সমাবেশ থেকে শিল্পের নামে প্রাকৃতিক সম্পদ, খনি ইত্যাদি কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিরোধের ইঙ্গিত মেলে। অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দাবিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রকাশ পায়। সংক্ষেপে বলা যায়, পাথরকাটা ময়দানের এই জনসমুদ্র প্রমাণ করে যে প্রান্তিক মানুষ এখন তাঁদের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে অত্যন্ত সচেতন এবং যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা সংগঠিতভাবে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
‘ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল’-সহ বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের যৌথ আহ্বানে ২ নভেম্বরের সমাবেশ প্রান্তিক মানুষের অধিকার সচেতনতার প্রতীক। আদিবাসীদের নিজস্ব ভূখণ্ড ও বনাধিকার রক্ষার লড়াইয়ের এটি একটি তীব্র ইঙ্গিত। খনি বা সোলার প্রজেক্টের নামে আদিবাসী সমাজকে তাদের বাস্তুভিটা, বন ও পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করার যে চেষ্টা চলছে, তাঁরা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।
অ-আদিবাসী বা ভুয়ো আদিবাসীদের বেআইনিভাবে এসটি (ST) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যে চেষ্টা বা দাবি উঠছে, তার বিরুদ্ধে নিজেদের জাতিসত্তা ও আইনি অধিকার ধরে রাখার জন্য এটি আদিবাসী সমাজের এককাট্টা প্রতিরোধ। তা ছাড়া, এই সমাবেশ থেকে পঞ্চায়েত (তফশিলি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন বা PESA চালু করে আদিবাসী-প্রধান অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং গ্রামসভার অধিকার সুনিশ্চিত করার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে।
The post পুরুলিয়ায় জল-জঙ্গল-জমি রক্ষার দাবিতে আদিবাসী মহাসমাবেশ, মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন appeared first on KhaborOnline.
