ছবির উৎস, Sol de Zuasnabar Brebbia via Getty Images
পিসার হেলানো টাওয়ার ইতালির অন্যতম প্রতীকী স্থাপনা। তবে এটি একমাত্র কাঠামো নয় যা একপাশে হেলে আছে।
নেদারল্যান্ডসের ড্যান্সিং হাউস থেকে শুরু করে চীনের টাইগার হিল প্যাগোডা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে এমন অনেক বেঁকে বা হেলে থাকা স্থাপনা রয়েছে।
কিন্তু এগুলো কেন হেলে থাকে? আর কেন হেলে থাকারও পরও সেগুলো ভেঙে পড়ে না?
কেন কিছু ভবন হেলে থাকে?
কোনো কাঠামো একপাশে হেলে থাকার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে- জানান নেদারল্যান্ডসের ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেল্টারেস-এর জিওটেকনিক্যাল প্র্যাকটিসের সহযোগী অধ্যাপক ড. ম্যান্ডি কর্ফ।
কিছু ক্ষেত্রে ভবনের ভিতের ধরনের কারেণেও এটা হয়, যেমন নেদারল্যান্ডসের ড্যান্সিং হাউজ।
ছবির উৎস, Karl Hendon via Getty Images
“আমস্টারডাম শহরের কেন্দ্রে বেশিরভাগ বাড়িই কাঠের খুঁটির ওপর নির্মিত,” বলেন কর্ফ।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, খুঁটিগুলো ভবনের দেয়াল ও সামনের অংশের নিচে জোড়ায় জোড়ায় স্থাপন করা হয়।
এই খুঁটিগুলো প্রায় ১২ মিটার গভীরে মাটির মধ্যে প্রবেশ করে, যেখানে মাটি নরম কাদা, পিট অথবা বালু দিয়ে গঠিত।
“এই অবস্থায়ও যদি খুঁটিগুলো ভালো থাকে, তাহলে ভবনের কোনো সমস্যা হয় না,” তিনি বলেন।
কিন্তু খুঁটিগুলো যদি ক্ষয় হয় বা পচতে শুরু করে, তাহলে ফাটল দেখা দিতে পারে এবং অসম ক্ষয় বা ওজনের বণ্টনের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবন হেলে যেতে পারে।
পিসার ঘটনা
মাটির অবস্থাও ভবনকে একপাশে হেলে যেতে বাধ্য করতে পারে, যেমনটি পিসার টাওয়ারের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
পিসার টাওয়ারের হেলে যাওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে যে দল, তার সদস্য নুনজিয়ান্তে স্কুয়েগলিয়া। তিনি ইউনিভার্সটি অফ পিসায় মাটির বলবিদ্যা ও ভিত্তি বিষয়ের অধ্যাপকও।
“নির্মাণের শুরু থেকেই এই টাওয়ারটি হেলে পড়তে শুরু করে, কারণ মাটির অত্যন্ত নরম অবস্থা। (এটি) তিন থেকে চার মিটার পর্যন্ত বসে গিয়েছিল,” বিবিসি রেডিও প্রোগ্রাম উইটনেস হিস্ট্রি-কে বলেন তিনি।
মাটিতে মানুষের সৃষ্টি করা কোনো পরিবর্তনের কারণেও ভবন হেলে যেতে পারে, যেমনটা হয়েছে ডেলফ্টের সবচেয়ে পুরোনো গীর্জা আউডা কার্ক-এর টাওয়ারে।
“এটি ততটা পরিচিত নয়, কিন্তু পিসার টাওয়ারের মতোই একই দিকে হেলে আছে,” বলেন কর্ফ।
“এটি খালের দিকে হেলে রয়েছে, কারণ খালের জন্য একপাশের মাটি খনন করা হয়েছিল এবং সেই পাশে মাটি বেশি নরম। ফলে সেটিকে সোজা রাখার চাপ কম থাকে, আর নির্মাণের সময় থেকেই এটি হেলে যেতে শুরু করে।”
ছবির উৎস, Sergio Amiti via Getty Images
ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তনও কোনো ভবনকে হেলিয়ে দিতে পারে।
আবার কখনও কখনও, ইচ্ছাকৃতভাবেও কোনো ভবন হেলানো আকারেই তৈরি করা হয়।
“আমস্টারডামের অনেক বাড়ি সামনের দিকে হেলানো অবস্থায় তৈরি করা হয়েছিল। অতীতে বাণিজ্যিক উদ্দেশে তৈরি অনেক ভবনই এভাবে নির্মাণ করা হতো,” তিনি বলেন।
“এগুলো সাধারণত খালের ধারে গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং পণ্য সহজে ভেতরে তুলতে এগুলোকে সামনের দিকে হেলানো আকারে বানানো হতো। তাই সামনে হেলে থাকলে সেটি সমস্যার ইঙ্গিত নয়। কিন্তু পাশের দিকে হেলে থাকলে বোঝা যায়, সেটি পরিকল্পিত ছিল না।”
হেলন ঠিক করা
তাহলে এত সব হেলে থাকা ভবন সত্ত্বেও আমরা কেন উদ্বিগ্ন নই?
কর্ফের মতে, একটি ভবন হেলে থাকা মানেই যে সেটি কাঠামোগতভাবে দুর্বল- তা নয়।
“কাঠামোগতভাবে অস্থিতিশীল হতে হলে এটিকে অনেক বেশি হেলতে হয়,” তিনি বলেন।
তবে কখনও কখনও হেলে থাকা অবস্থা ঠিকঠাক করে নিতে হয়, যেমন পিসার হেলানো টাওয়ারের ক্ষেত্রে।
টাওয়ারটি নির্মাণের শুরু থেকেই হেলে থাকলেও, ২০শ শতকে এর হেলে যাওয়া ক্রমশ বাড়তে থাকে।
“পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল,” বলেন স্কুয়েগলিয়া।
ছবির উৎস, PhotoFires via Getty Images
১৯৮৯ সালে ইতালির পাভিয়া শহরের সিভিক টাওয়ার ভেঙে পড়ে।
স্কুয়েগলিয়ার মতে, আগে থেকে সৃষ্টি হতে থাকা ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এটি ঘটেছিল।
এর পরের বছরই পিসার টাওয়ার বন্ধ করে দেওয়া হয়। টাওয়ারটিকে নিরাপদ করতে সামান্য সোজা করার জন্য একাধিক ধারণা নিয়ে কাজ করা হয়।
“নির্বাচিত কৌশল ছিল মাটি অপসারণ,” বলেন স্কুয়েগলিয়া।
“টাওয়ারকে স্পর্শ না করেই ভিত্তির উত্তর দিক থেকে ৩৭ ঘনমিটার মাটি অপসারণ করা হয়।”
১১ বছর পর টাওয়ারটি আবার খুলে দেওয়া হয়।
একটি ‘বিশেষ’ ঘটনা
কর্ফের মতে, এই ধরনের পদ্ধতিতে ভবন সোজা করা সাধারণ কাজ নয়।
“এটি পিসার জন্য বিশেষ ঘটনা ছিল। সাধারণ পরিস্থিতিতে এভাবে করা হতো না,” তিনি বলেন।
যদি কোনো হেলে থাকা ভবনের ভিত্তি কাঠের খুঁটির হয়, যেমন আমস্টারডামের বাড়িগুলো, তাহলে ভিত্তি পরিবর্তন করলে হেলে যাওয়ার বাড়তে থাকা প্রবণতা বন্ধ করা যায়।
তবে এটি “অন্তর্ভুক্তিমূলক” বা জটিল প্রক্রিয়া, কারণ এতে নিচতলা সরাতে হয়।
ছবির উৎস, Antonello NUSCA/Gamma-Rapho via Getty Images
কর্ফ বলেন, কখনও কখনও গাড়ি তোলার মতো করে বাড়ি তুলেও হেলে যাওয়ার অবস্থা ঠিক করা যায়, তবে এতে বেশি ক্ষতিও হতে পারে।
“বাড়ি যদি খুব বেশি হেলে থাকে, তাহলে সোজা করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সেটি ইতোমধ্যে হেলে থাকার অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে,” তিনি বলেন।
“সতর্ক থাকতে হয়, যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ না হয়।”
যদিও কিছু ভবন স্থিতিশীল করা সম্ভব, তবুও এর নেতিবাচক দিক রয়েছে।
“ভবনের ক্ষেত্রে অনেক কিছুই করা সম্ভব,” বলেন কর্ফ। “কিন্তু এর খরচ অনেক বেশি এবং এটি জটিল।”
ছবির উৎস, Bloomberg / Contributor via Getty Images
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
কর্ফের গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল নেদারল্যান্ডসেই প্রায় ৭৫ হাজারের মতো বাড়ি কাঠের খুঁটির ওপর নির্মিত এবং ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া অগভীর ভিত্তির কারণে প্রায় তিনগুণ বেশি বাড়ি ঝুঁকিতে আছে।
আর এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
“জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তনের কারণে কখনও কখনও আমরা দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পাই,” বলেন কর্ফ।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে কাঠের খুঁটি বাতাসের সংস্পর্শে আসে, যা ক্ষয় প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে।
এছাড়াও, পানির পরিবর্তন মাটির স্তরে প্রভাব ফেলে, যা বিভিন্ন ধরনের ভিত্তির ওপর নির্মিত বাড়িগুলোর জন্য অতিরিক্ত প্রভাব সৃষ্টি করে।
তবে তিনি যোগ করেন, এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া।
আর পিসার হেলানো টাওয়ারের ক্ষেত্রে, ১১ বছরের কাজ শেষে ২০০১ সালে এর হেলে থাকা ৪০ সেন্টিমিটারেরও বেশি কমানো হয়।
প্রকৌশলীরা মনে করেন, অন্তত আগামী ২০০ বছর এটি নিরাপদ থাকবে।
