নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের ক্ষত এখনও শুকোয়নি। হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ভয়াবহ জলস্রোত ও ধ্বংসস্তূপে সেখানে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১,১০০ ছাড়িয়েছে। ২ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, নেপালে অন্তত ১,১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও প্রায় ৪,০০০ মানুষ নিখোঁজ।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত সিকিম। বুধবার সকালে পশ্চিম সিকিমের গ্যালশিং জেলার রিম্বি-ইউকসম সড়কের বিস্তীর্ণ অংশে ভূমিধস নামায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের উপর থেকে জলস্রোতের সঙ্গে কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
– বিজ্ঞাপন –
ধসে অবরুদ্ধ রিম্বি-ইউকসম সড়ক
টানা বৃষ্টির জেরে পশ্চিম সিকিমের রিম্বি-ইউকসম সড়কের একাধিক অংশে ধস নেমেছে। রাস্তার উপর মাটি ও পাথর জমে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট অংশে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটক ও স্থানীয়দের ওই পথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় লাগাতার বৃষ্টির ফলে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে প্রশাসন।
ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, বাড়ছে উদ্বেগ
সিকিম এবং সংলগ্ন উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকায় আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দার্জিলিং, কালিম্পং এবং সিকিমের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জেলাগুলিতেও ইতিমধ্যেই ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলার দক্ষিণবঙ্গেও নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টি চলছে। ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত এক বিস্তীর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নেপালের বিপর্যয় কি সিকিমের জন্য সতর্কবার্তা, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা জেনে নেওয়া যাক
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে হিমালয়ের হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদগুলির নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে কিছু হিমবাহ-হ্রদের জলস্তর বাড়তে পারে। কোনও প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে তৈরি হতে পারে Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF—যার ফলে আচমকা বিপুল জলরাশি নীচের দিকে নেমে আসতে পারে।
তবে নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় এবং সিকিমের প্রতিটি হিমবাহ-হ্রদকে সরাসরি একই ধরনের বিপদের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে হ্রদের আকার, জলস্তর, প্রাকৃতিক বাঁধের স্থিতিশীলতা, আশপাশের ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়ার মতো একাধিক বিষয়ের উপর।
সিকিমে হিমবাহ-হ্রদ নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা
সিকিম সরকার ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদগুলির উপর বৈজ্ঞানিক নজরদারি ও সমীক্ষা চালাচ্ছে। আগস্টে রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের নেতৃত্বে মাঙ্গান জেলার উচ্চ পার্বত্য এলাকায় একাধিক উচ্চ-ঝুঁকির হিমবাহ-হ্রদ নিয়ে বহুমাত্রিক সমীক্ষা চালানো হয়। সেখানে জলস্তর, ভূতাত্ত্বিক গঠন, জলবিদ্যা, ভূ-আকৃতি ও আবহাওয়াগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
নেপালের বিপর্যয়ের পর এই নজরদারির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ-হ্রদগুলির জলস্তর বা বাঁধের গঠনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত সতর্কতা জারি করার ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
হিমালয়ে বাড়ছে হিমবাহ-ঝুঁকি
সাম্প্রতিক নেপাল বিপর্যয়কে জাতিসংঘের এক আধিকারিকও হিমালয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা হিমবাহ-ঝুঁকির বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেছেন। উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে হিমবাহ-হ্রদের উপর চাপ বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
