রাজনীতিতে এমন উত্থান খুব কম নেতার ভাগ্যেই জোটে। আবার এমন নাটকীয় পতনও বিরল। এক সময় বিজেপির অন্যতম নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী কৌশলবিদ, নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রকের বিতর্কের ভার বইতে না পেরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন সেই চাপকে এমন জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে রাজনৈতিকভাবে তাঁর পদে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরএসএসের শাখা থেকে জাতীয় রাজনীতির মঞ্চ

ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ছাত্রজীবনে। ওড়িশার তালচের কলেজে পড়ার সময় তিনি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-তে যোগ দেন। পরে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে লড়লেও প্রথম নির্বাচনে পরাজিত হন। সেই ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং ধীরে ধীরে আরএসএস ও এবিভিপি-র সংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।

– বিজ্ঞাপন –

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর উত্থানের পিছনে শুধু পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং আরএসএসের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক এবং সংগঠক হিসেবে দক্ষতাই বড় ভূমিকা নিয়েছিল। পরবর্তীতে তাঁর বাবা দেবেন্দ্র প্রধানও বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।

সংগঠক হিসেবে সাফল্যই ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর প্রথম মন্ত্রিসভায় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান ধর্মেন্দ্র প্রধান। পরবর্তী সময়ে দক্ষতা উন্নয়ন, ইস্পাত এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্বও তাঁর হাতে আসে।

তবে মন্ত্রী হওয়ার থেকেও দলের কাছে তাঁর বড় পরিচয় ছিল নির্বাচনী কৌশলবিদ হিসেবে। উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা-সহ একাধিক রাজ্যে বিজেপির নির্বাচনী সাফল্যের নেপথ্যে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকার কথা দলীয় নেতারাও স্বীকার করেছেন। ওড়িশায় বিজেপির সংগঠন বিস্তারেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতির কৃতিত্বের বড় অংশ তাঁর ঝুলিতেই যায়।

মুখ্যমন্ত্রী হতে না পারার ধাক্কা

২০২৪ সালে ওড়িশায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের ধারণা ছিল, ধর্মেন্দ্র প্রধানই মুখ্যমন্ত্রী হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পান মোহন মাঝি। রাজনৈতিক মহলে মনে করা হয়, লোকসভায় বিজেপির কম আসন পাওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে দিল্লিতেই রাখতে চেয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় মোড়।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা মন্ত্রকই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক কৌশলী হিসেবে সফল হলেও শিক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এনসিইআরটি-র পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, ইউজিসি-র নতুন বিধি এবং বিশেষ করে সর্বভারতীয় পরীক্ষাগুলিকে ঘিরে প্রশ্ন ওঠায় বিরোধীদের নিশানায় চলে আসেন তিনি। সর্বশেষ নিট-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং তা ঘিরে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

আন্দোলনের চাপেই কি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ?

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা কমেনি। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রের বিতর্ক এবং লাগাতার ছাত্র আন্দোলন সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয়, যেখানে আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলির একটি হয়ে ওঠে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। শেষ পর্যন্ত সেই দাবিই মেনে নেওয়া হয়।

সামনে কী?

ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক অধ্যায় এখানেই শেষ— এমনটা বলার সুযোগ নেই। বিজেপির সংগঠনের ভিতরে তিনি এখনও অন্যতম অভিজ্ঞ কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচিত হন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ভবিষ্যতে তাঁকে আবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরিয়ে আনতে পারে।

তবে বর্তমান পর্বটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, আধুনিক ভারতীয় রাজনীতিতে সাংগঠনিক দক্ষতা বা নির্বাচনী সাফল্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, শিক্ষা ও যুবসমাজের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে জনরোষ তৈরি হলে তার রাজনৈতিক মূল্যও অত্যন্ত বড় হতে পারে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *