বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে ভারতীয় সিনেমার সম্পর্ক প্রায় এক শতাব্দীর। তাঁর লেখা থেকে প্রথম দিকের নির্বাক ছবি তৈরি হয়েছে বিশের দশকেই। তারপর বাংলা ছাড়িয়ে হিন্দি, তেলুগু, তামিল, অসমিয়া, উর্দু-সহ নানা ভাষার সিনেমায় বারবার ফিরে এসেছে তাঁর চরিত্র ও কাহিনি। উপলব্ধ ফিল্মোগ্রাফি অনুযায়ী, শরৎচন্দ্রের রচনার ওপর ভিত্তি করে ৪০টিরও বেশি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে; শুধু ‘দেবদাস’-এরই দুই ডজনের কাছাকাছি চলচ্চিত্র ও অন্যান্য পর্দার রূপান্তরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে ‘দেবদাস’ই তাঁর একমাত্র চলচ্চিত্রায়িত সৃষ্টি নয়। ‘দেনাপাওনা’, ‘চরিত্রহীন’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘গৃহদাহ’, ‘বড়দিদি’, ‘রামের সুমতি’, ‘দত্তা’, ‘পরিণীতা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘মেজদিদি’, ‘নিষ্কৃতি’, ‘পথের দাবী’, ‘স্বামী’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘পণ্ডিতমশাই’, ‘কমললতা’-সহ বহু রচনা নানা সময়ে পর্দায় এসেছে।
– বিজ্ঞাপন –
নির্বাক যুগেই শুরু—‘আঁধারে আলো’ থেকে ‘দেবদাস’
শরৎচন্দ্রের সাহিত্য চলচ্চিত্রে আসার ইতিহাসের গোড়ার দিকেই রয়েছে ‘আঁধারে আলো’। ১৯২২ সালের এই নির্বাক ছবির পর ১৯২৫ সালে তাঁর রচনা অবলম্বনে ‘কমললতা’ তৈরি হয়। এরপর ১৯২৮ সালে আসে প্রথম দিকের ‘দেবদাস’।
অর্থাৎ, শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাস নিয়ে সিনেমার যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর মৃত্যুরও অনেক আগে।
‘দেবদাস’—সবচেয়ে বেশি বার ফিরে আসা শরৎ-রচনা
শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘দেবদাস’ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রায়িত। ১৯২৮ সালের নির্বাক ছবি থেকে শুরু করে বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া, তেলুগু, তামিল, উর্দু, মালয়ালম, ওড়িয়া এবং ভোজপুরি ভাষায় এই কাহিনির বিভিন্ন রূপ দেখা গেছে।
১৯২৮ সালে নরেশ মিত্রের পরিচালনায় প্রথম দিকের বাংলা নির্বাক ‘দেবদাস’ তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত বাংলা ‘দেবদাস’-এ বড়ুয়া নিজেই দেবদাস, যমুনা বড়ুয়া পার্বতী এবং চন্দ্রাবতী দেবী চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় অভিনয় করেন।
১৯৩৬ সালে একই কাহিনির হিন্দি সংস্করণে কে এল সায়গল দেবদাস, যমুনা বড়ুয়া পার্বতী এবং রাজকুমারী চন্দ্রমুখী হন।
১৯৩৭ সালে অসমিয়া ভাষাতেও ‘দেবদাস’ তৈরি হয়।
এরপর ১৯৫৩ সালের তেলুগু-তামিল দ্বিভাষিক ‘Devadasu’-তে আক্কিনেনি নাগেশ্বর রাও, সাবিত্রী ও ললিতা অভিনয় করেন।
১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের হিন্দি ‘Devdas’-এ দিলীপ কুমার, সুচিত্রা সেন ও বৈজয়ন্তীমালা ছিলেন যথাক্রমে দেবদাস, পার্বতী ও চন্দ্রমুখী।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তানে উর্দু ‘Devdas’ তৈরি হয়।
১৯৭৪ সালে আবার তেলুগু ভাষায় ‘Devadasu’ আসে।
১৯৭৯ সালের বাংলা ‘দেবদাস’-এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় দেবদাস, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় পার্বতী এবং সুপ্রিয়া চৌধুরী চন্দ্রমুখীর চরিত্রে অভিনয় করেন। উত্তমকুমার ছিলেন চুনীলালের ভূমিকায়।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশে চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’-এ বুলবুল আহমেদ, কবরী ও আনোয়ারা অভিনয় করেন।
এরপর আসে ১৯৮৯ সালের মালয়ালম সংস্করণ।
২০০২ সালে একই বছরে বাংলা ও হিন্দি—দুটি উল্লেখযোগ্য ‘দেবদাস’ তৈরি হয়। শক্তি সামন্তের বাংলা ছবিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অর্পিতা পাল ও ইন্দ্রাণী হালদার ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। আর সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর হিন্দি ছবিতে শাহরুখ খান, ঐশ্বর্যা রাই বচ্চন ও মাধুরী দীক্ষিত।
২০০৯ সালের ‘Dev.D’ সরাসরি পুরনো যুগের পুনর্নির্মাণ নয়; অনুরাগ কাশ্যপের আধুনিক সময়ের পুনর্ব্যাখ্যা। মুখ্য ভূমিকায় অভয় দেওল, মাহি গিল ও কল্কি কোয়েচলিন।
এরপর ২০১১ সালের ভোজপুরি ‘Hamar Devdas’, ২০১৩ সালের বাংলাদেশি ‘Devdas’, এবং ২০১৮ সালের ‘Daas Dev’-এর মতো আধুনিক রূপান্তরও দেখা যায়। ফলে ‘দেবদাস’ শুধু একটি উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সিনেমায় একটি দীর্ঘ অভিযোজন-পরম্পরা।
‘পরিণীতা’—বাংলা, হিন্দি, তামিল, আবার নতুন প্রজন্ম
শরৎচন্দ্রের ‘পরিণীতা’-ও একাধিক ভাষায় বারবার পর্দায় এসেছে।
১৯৪২ সালে পশুপতি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় প্রথম দিকের বাংলা সংস্করণ তৈরি হয়।
১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের হিন্দি ‘Parineeta’-য় মীনা কুমারী ও অশোক কুমার ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়।
১৯৫৮ সালের তামিল ‘Manamalai’-তে জেমিনি গণেশন ও সাবিত্রী অভিনয় করেন।
১৯৬৯ সালে অজয় করের বাংলা ‘পরিণীতা’-য় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়কে দেখা যায়। Bengal Film Archive-ও ছবিটির পরিচালক অজয় কর এবং শরৎচন্দ্রকে কাহিনির উৎস হিসেবে নথিভুক্ত করেছে।
১৯৭৬ সালের হিন্দি ‘Sankoch’-এ কাহিনিটি নতুন রূপ পায়।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশে আবার ‘পরিণীতা’ তৈরি হয়।
আর ২০০৫ সালে প্রদীপ সরকারের হিন্দি ‘Parineeta’-য় বিদ্যা বালান, সইফ আলি খান ও সঞ্জয় দত্ত অভিনয় করেন।
‘শ্রীকান্ত’—একটি উপন্যাস, একাধিক চলচ্চিত্র
শরৎচন্দ্রের দীর্ঘ উপন্যাস ‘শ্রীকান্ত’ থেকেও তৈরি হয়েছে একাধিক ছবি।
১৯৫৮ সালের ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ পরিচালনা করেন হরিদাস ভট্টাচার্য। মুখ্য ভূমিকায় উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন। Bengal Film Archive-এ ছবিটির কাহিনির উৎস হিসেবে শরৎচন্দ্রের নামও রয়েছে।
১৯৫৯ সালে ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি’ তৈরি হয়।
১৯৬৫ সালে ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’-এ হরিদাস ভট্টাচার্যের পরিচালনায় মালা সিনহা ও বসন্ত চৌধুরী অভিনয় করেন।
১৯৬৯ সালের ‘কমললতা’-য় উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনকে দেখা যায়। ছবিটি পরিচালনা করেন হরিসাধন দাশগুপ্ত।
পরে ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশি ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ২০০৪ সালের ‘Iti Srikanta’ এবং ২০১৯ সালের ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-এর মতো রূপান্তরও তৈরি হয়।
‘দত্তা’—সুচিত্রা সেন থেকে ঋতুপর্ণা
‘দত্তা’ অবলম্বনে প্রথম বাংলা ছবি তৈরি হয় ১৯৫১ সালে। পরিচালক সৌম্যেন মুখোপাধ্যায়। বিজয়ার ভূমিকায় সুনন্দা বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেনের ভূমিকায় পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং রাসবিহারীর ভূমিকায় অহীন্দ্র চৌধুরী অভিনয় করেন।
১৯৭৬ সালে অজয় করের ‘দত্তা’-য় সুচিত্রা সেন ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন।
এরপর ২০২৩ সালে আবার ‘দত্তা’ বড় পর্দায় ফিরে আসে; ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত অভিনয় করেন বিজয়ার চরিত্রে।
এছাড়া ১৯৬১ সালের তেলুগু ‘Vagdanam’-কে ‘দত্তা’র কাহিনি থেকে ঢিলেঢালা অনুপ্রাণিত ছবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়—সরাসরি পুনর্নির্মাণ হিসেবে নয়।
‘গৃহদাহ’—একই বছরে বাংলা ও হিন্দি
১৯৩৬ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালনায় বাংলা ‘গৃহদাহ’ তৈরি হয়। বড়ুয়া ও যমুনা বড়ুয়া ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। Bengal Film Archive-এর নথিতেও শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’কে ছবিটির গল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই বছরে এই কাহিনির হিন্দি রূপ ‘Manzil’ তৈরি হয়। পরিচালনায় ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া।
এর বহু পরে ১৯৬৭ সালে আবার বাংলা ‘গৃহদাহ’ তৈরি হয়।
‘বড়দিদি’ থেকে ‘Batasari’ ও ‘Kaanal Neer’
১৯৫৭ সালে অজয় করের ‘Bardidi’-তে উত্তমকুমার ও সন্ধ্যারানি ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। Bengal Film Archive-এ ছবিটির কাহিনির উৎস হিসেবে শরৎচন্দ্রের নাম নথিভুক্ত রয়েছে।
এই একই কাহিনি পরে দক্ষিণ ভারতীয় ভাষাতেও যায়।
১৯৬১ সালে তেলুগু ‘Batasari’ এবং তামিল ‘Kaanal Neer’ তৈরি হয়। অর্থাৎ, একটি বাংলা সাহিত্যকর্ম এক দশকের মধ্যে বাংলা থেকে তেলুগু ও তামিল পর্দায় পৌঁছে যায়।
‘বিরাজ বৌ’—তিন সময়ের তিন পর্দার রূপ
১৯৪৬ সালে অমর মল্লিকের বাংলা ‘বিরাজ বৌ’ মুক্তি পায়। চিত্রনাট্যের উৎস হিসেবে শরৎচন্দ্রের নাম Bengal Film Archive-এ রয়েছে; অভিনয়ে ছিলেন ছবি বিশ্বাস-সহ একাধিক শিল্পী।
১৯৫৪ সালে বিমল রায়ের হিন্দি ‘Biraj Bahu’-তে কামিনী কৌশল ও অভি ভট্টাচার্য মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন।
এরপর ১৯৭২ সালে মনু সেনের বাংলা ‘বিরাজ বৌ’-তে উত্তমকুমার ও মাধবী মুখোপাধ্যায় অভিনয় করেন।
‘মেজদিদি’—কানন দেবী থেকে মীনা কুমারী
শরৎচন্দ্রের ‘মেজদিদি’ও একাধিকবার পর্দায় এসেছে।
১৯৫০ সালের বাংলা ‘মেজদিদি’-তে কানন দেবী-সহ তৎকালীন একঝাঁক জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন।
১৯৬৭ সালে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘Majhli Didi’-তে মীনা কুমারী ও ধর্মেন্দ্র অভিনয় করেন।
পরে ২০০৩ সালে বাংলা ‘মেজদিদি’ আবার তৈরি হয়।
‘রামের সুমতি’—একই গল্পে বাংলা ও হিন্দি
১৯৪৭ সালে কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের বাংলা ‘রামের সুমতি’ মুক্তি পায়। Bengal Film Archive-এর নথিতে শরৎচন্দ্রের গল্প, কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনা এবং জহর গাঙ্গুলি, মলিনা দেবী প্রমুখের অভিনয়ের তথ্য রয়েছে।
এরপর হিন্দিতে ‘Chhota Bhai’ নামে কাহিনিটি রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৬ সালের ‘Chhota Bhai’-কেও ‘রামের সুমতি’র চলচ্চিত্ররূপ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরে ১৯৮২ সালের ‘Anokha Bandhan’-এর সঙ্গেও এই কাহিনির সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে শাহিদুল আমিনের ‘রামের সুমতি’ তৈরি হয়। জয় ও ববিতা ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়; ছবিটি বাংলাদেশে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিল।
‘দেনাপাওনা’—বাংলা সবাক ছবির শুরুর সময়ের শরৎচন্দ্র
১৯৩১ সালে প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর পরিচালনায় ‘দেনাপাওনা’ তৈরি হয়। বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের শুরুর যুগের গুরুত্বপূর্ণ এই ছবির কাহিনি শরৎচন্দ্রের একই নামের উপন্যাস থেকে।
পরে ‘Pujarin’ (১৯৩৬) নামে হিন্দি রূপও তৈরি হয়।
‘চরিত্রহীন’—নির্বাক বাংলা থেকে হিন্দি
শরৎচন্দ্রের বিতর্কিত উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’-এরও চলচ্চিত্রায়ন হয়েছে।
১৯৩১ সালে বাংলা ‘চরিত্রহীন’ তৈরি হয়।
পরে ১৯৭৪ সালে শক্তি সামন্তের হিন্দি ‘Charitraheen’-এ সঞ্জীব কুমার, শর্মিলা ঠাকুর ও যোগিতা বালি অভিনয় করেন।
বাংলাদেশেও ১৯৭৫ সালে একই নামে বাংলা ছবি তৈরি হয়।
‘পল্লীসমাজ’—১৯৩২-এর পর আবার ১৯৫২
১৯৩২ সালে শিশির ভাদুড়ীর পরিচালনায় ‘পল্লীসমাজ’ তৈরি হয়। ছবিতে শিশির ভাদুড়ী ও বিশ্বনাথ ভাদুড়ী ছিলেন। Bengal Film Archive-এর নথিতে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসটিকেই ছবিটির গল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৫২ সালে নীরেন লাহিড়ী আবার ‘পল্লীসমাজ’ নির্মাণ করেন।
‘কমললতা’—নির্বাক যুগ থেকে উত্তম-সুচিত্রা
১৯২৫ সালে ‘কমললতা’ অবলম্বনে নির্বাক ছবি তৈরি হয়।
এর বহু বছর পরে ১৯৬৯ সালে হরিসাধন দাশগুপ্তের ‘কমললতা’-য় উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনয় করেন। ছবিটির কাহিনির উৎস শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’-এর কমললতা পর্ব।
‘পথের দাবী’ থেকে ‘সব্যসাচী’
শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’-ও সিনেমায় এসেছে একাধিকবার।
১৯৪৭ সালে ‘পথের দাবী’ নামে বাংলা ছবি তৈরি হয়।
১৯৪৮ সালে ‘Sabyasachi’ নামে হিন্দি সংস্করণ আসে।
এরপর ১৯৭৭ সালে পীযূষ বসুর বাংলা ‘সব্যসাচী’-তে উত্তমকুমার নামভূমিকায় অভিনয় করেন। সঙ্গে ছিলেন সুপ্রিয়া দেবী, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায় প্রমুখ।
‘নিষ্কৃতি’ থেকে ‘Apne Paraye’
শরৎচন্দ্রের ‘নিষ্কৃতি’ অবলম্বনে ১৯৮০ সালে বসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘Apne Paraye’ তৈরি হয়। অমোল পালেকর, শাবানা আজমি ও গিরিশ কারনাড ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়।
এর আগে ১৯৫৭ সালের তেলুগু ‘Thodi Kodallu’-কেও ‘নিষ্কৃতি’র কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত বলে উল্লেখ করা হয়।
‘বিন্দুর ছেলে’ থেকে ‘Chhoti Bahu’
১৯৭১ সালে কে বি তিলকের হিন্দি ‘Chhoti Bahu’ শরৎচন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’ অবলম্বনে তৈরি হয়। ছবিতে শর্মিলা ঠাকুর ও রাজেশ খান্না ছিলেন প্রধান আকর্ষণ।
‘পণ্ডিতমশাই’ থেকে ‘Khushboo’
শরৎচন্দ্রের ‘পণ্ডিতমশাই’-এর কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭৫ সালে গুলজারের ‘Khushboo’ তৈরি হয়। মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন জিতেন্দ্র ও হেমা মালিনী। এটি সরাসরি একই নামের চলচ্চিত্রায়ন নয়, বরং মূল কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত রূপান্তর—এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।
‘স্বামী’—মরণোত্তর ফিল্মফেয়ার পাওয়া সেই ছবি
১৯৭৭ সালে বসু চট্টোপাধ্যায়ের ‘Swami’ শরৎচন্দ্রের ‘স্বামী’ অবলম্বনে তৈরি হয়। শাবানা আজমি, গিরিশ কারনাড ও বিক্রম ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়।
এই ছবির কাহিনির জন্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে মরণোত্তর ১৯৭৮ সালের Filmfare Award for Best Story দেওয়া হয়। তাই ছবিটি জাতীয় পুরস্কারে শরৎচন্দ্রকে পুরস্কৃত করেছিল—এমন তথ্য ঠিক নয়।
‘চন্দ্রনাথ’—উত্তম-সুচিত্রার জুটি
১৯৫৭ সালে কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের ‘চন্দ্রনাথ’ মুক্তি পায়। উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। Bengal Film Archive ছবিটির গল্প হিসেবে সরাসরি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম দিয়েছে।
পরে এই উপন্যাস দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রেও প্রভাব ফেলেছে; ১৯৬০-এর দশকের কন্নড় চলচ্চিত্রের সঙ্গেও ‘চন্দ্রনাথ’-এর সম্পর্কের উল্লেখ পাওয়া যায়।
‘সুভদা’, ‘অনুরাধা’, ‘বামুনের মেয়ে’, ‘কাশীনাথ’—ভুলে যাওয়া ছবিরাও তালিকায়
শরৎচন্দ্রের চলচ্চিত্রায়নের ইতিহাসে এমন বেশ কিছু পুরনো ছবি রয়েছে, যেগুলির কথা আজকের আলোচনায় খুব বেশি আসে না।
১৯৫২ সালের ‘সুভদা’ পরিচালনা করেন নীরেন লাহিড়ী; সুনন্দা দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মঞ্জু দে, ছবি বিশ্বাস প্রমুখ অভিনয় করেন।
১৯৪৯ সালের ‘অনুরাধা’ পরিচালনা করেন প্রণব রায়। অভিনয়ে ছিলেন জহর গাঙ্গুলি ও কানন দেবী।
১৯৪৯ সালের ‘বামুনের মেয়ে’ পরিচালনা করেন সব্যসাচী; অভিনয়ে ছিলেন অনুবা গুপ্ত, প্রভা দেবী, পাহাড়ি সান্যাল, তুলসী লাহিড়ী প্রমুখ।
আর ১৯৪৩ সালের ‘কাশীনাথ’ পরিচালনা করেন নীতিন বসু। অসিতবরণ, সাবিত্রী দেবী, ভারতী দেবী-সহ একাধিক শিল্পী অভিনয় করেন।
‘আলো ও ছায়া’—সাম্প্রতিক প্রজন্মেও শরৎচন্দ্র
শরৎচন্দ্রের ছোটগল্প ‘আলো ও ছায়া’ অবলম্বনে অনসূয়া সামন্তের পরিচালনায় ‘Aalo Chhaya’ তৈরি হয়। ছবিটির মুক্তির তথ্য বিভিন্ন উৎসে ২০১১ ও ২০১৪—দুইভাবে পাওয়া যায়; নির্মাণ-পর্বের সমসাময়িক প্রতিবেদনে ২০১১ সালের মুক্তির পরিকল্পনার উল্লেখ থাকলেও বর্তমান চলচ্চিত্র-ডেটাবেসে ২০১৪ সালের মুক্তির তথ্যও রয়েছে। ছবিতে অনসূয়া সামন্ত, রামপ্রসাদ বণিক, বিভু ভট্টাচার্য প্রমুখ অভিনয় করেন।
এই ছবির ক্ষেত্রে তাই প্রকাশের সময় ২০১৪ ব্যবহার করাই নিরাপদ, তবে পুরনো প্রচারসামগ্রীতে ২০১১-এর উল্লেখ থাকার বিষয়টি আলাদা করে জানা দরকার।
‘মহেশ’—শরৎচন্দ্র আবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পথে
শরৎচন্দ্রের শক্তিশালী ছোটগল্প ‘মহেশ’ নিয়েও নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ হয়েছে। ‘Riding on the Moon Boat’ নামে ত্রিপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্রটি ‘মহেশ’-এর আধুনিক রূপান্তর; ২০২১ সালে Busan Asian Project Market-এ প্রকল্পটি নির্বাচিত হয়েছিল এবং আদিল হুসেন এতে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ, শরৎচন্দ্রের সাহিত্য শুধু পুরনো ছবির আর্কাইভেই আটকে নেই—নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রকাররাও তাঁর গল্পে ফিরে আসছেন।
এক নজরে শরৎচন্দ্রের চলচ্চিত্রায়নের দীর্ঘ তালিকা
‘দেবদাস’ — ১৯২৮, ১৯৩৫, ১৯৩৬, ১৯৩৭, ১৯৫৩, ১৯৫৫, ১৯৬৫, ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮২, ১৯৮৯, ২০০২, ২০০৯, ২০১১, ২০১৩, ২০১৮-সহ বহু ভাষার সংস্করণ।
‘পরিণীতা’ — ১৯৪২, ১৯৫৩, ১৯৫৮, ১৯৬৯, ১৯৭৬, ১৯৮৬, ২০০৫।
‘শ্রীকান্ত’ — ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬৫, ১৯৬৯, ১৯৮৭, ২০০৪, ২০১৯-সহ একাধিক রূপ।
‘দত্তা’ — ১৯৫১, ১৯৭৬, ২০২৩; পাশাপাশি ‘Vagdanam’-এর মতো অনুপ্রাণিত রূপ।
‘গৃহদাহ’ — ১৯৩৬ বাংলা, একই সময়ের হিন্দি ‘Manzil’, পরে ১৯৬৭ বাংলা।
‘বড়দিদি’ — ১৯৫৭ বাংলা, ১৯৬১ তেলুগু ‘Batasari’, তামিল ‘Kaanal Neer’।
‘বিরাজ বৌ’ — ১৯৪৬, ১৯৫৪ হিন্দি ‘Biraj Bahu’, ১৯৭২ বাংলা।
‘মেজদিদি’ — ১৯৫০, ১৯৬৭ ‘Majhli Didi’, ২০০৩ বাংলা।
‘রামের সুমতি’ — ১৯৪৭, হিন্দি ‘Chhota Bhai’, ১৯৬৬ ‘Chhota Bhai’, ১৯৭৭ বাংলা, ১৯৮২ ‘Anokha Bandhan’, ১৯৮৫ বাংলাদেশি সংস্করণ।
‘পল্লীসমাজ’ — ১৯৩২, ১৯৫২।
‘চরিত্রহীন’ — ১৯৩১, ১৯৭৪, ১৯৭৫; পরে টেলিভিশন/ওয়েব অভিযোজনও হয়েছে।
‘দেনাপাওনা’ — ১৯৩১; হিন্দি ‘Pujarin’ (১৯৩৬)।
‘পথের দাবী’ — ১৯৪৭; ‘Sabyasachi’ (১৯৪৮); বাংলা ‘Sabyasachi’ (১৯৭৭)।
‘কমললতা’ — ১৯২৫; ১৯৬৯।
‘নিষ্কৃতি’ — ১৯৫৭-এর ‘Thodi Kodallu’-এর সঙ্গে কাহিনিগত সম্পর্ক এবং ১৯৮০-এর ‘Apne Paraye’।
‘বিন্দুর ছেলে’ — ১৯৭১-এর ‘Chhoti Bahu’।
‘পণ্ডিতমশাই’ — ১৯৭৫-এর ‘Khushboo’-র প্রধান অনুপ্রেরণা।
‘স্বামী’ — ১৯৭৭-এর ‘Swami’।
‘চন্দ্রনাথ’ — ১৯৫৭; পরবর্তী দক্ষিণ ভারতীয় অভিযোজনের উল্লেখ রয়েছে।
‘আঁধারে আলো’ — ১৯২২-এর নির্বাক চলচ্চিত্র।
‘কাশীনাথ’ — ১৯৪৩।
‘বামুনের মেয়ে’ — ১৯৪৯।
‘অনুরাধা’ — ১৯৪৯।
‘সুভদা’ — ১৯৫২।
‘আলো ও ছায়া’ — ‘Aalo Chhaya’।
‘মহেশ’ — ‘Riding on the Moon Boat’-এর মতো নতুন চলচ্চিত্র প্রকল্পে পুনরায় ফিরে এসেছে।
একশো বছর পরেও কেন শরৎচন্দ্র?
শরৎচন্দ্রের গল্পে ছিল এমন কিছু সামাজিক ও মানবিক সংঘাত, যা কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে নেই। প্রেমের সঙ্গে সামাজিক বাধা, নারীর অবস্থান, পরিবার, দারিদ্র্য, জাতপাত, আত্মসম্মান, গ্রামীণ সমাজ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন—তাঁর চরিত্রগুলির জীবনে যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে, তা সময় বদলালেও চলচ্চিত্রকারদের কাছে প্রাসঙ্গিক থেকেছে।
তাই ১৯২০-এর দশকের নির্বাক ছবি থেকে আজকের আধুনিক সিনেমা—শরৎচন্দ্রের গল্প বারবার নতুন ভাষা, নতুন অভিনেতা এবং নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
আর সেই দীর্ঘ ইতিহাসে ‘দেবদাস’ সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলেও, শরৎচন্দ্রের চলচ্চিত্র-ভুবন আসলে অনেক বড়—‘দত্তা’, ‘পরিণীতা’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘গৃহদাহ’, ‘বড়দিদি’, ‘মেজদিদি’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘রামের সুমতি’, ‘পথের দাবী’, ‘চরিত্রহীন’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘দেনাপাওনা’ থেকে ‘মহেশ’—অসংখ্য চরিত্র ও কাহিনি এখনও পর্দায় ফিরে আসছে।
