শ্রয়ণ সেন

দু’দিন হল থেমে গিয়েছে কণ্ঠ। কিন্তু থেকে গিয়েছে গান। থেকে গিয়েছে তাঁর স্নেহের কয়েকটি কথা, কোনও অনুষ্ঠানের শেষে এক সাধারণ শিক্ষার্থীকে ডেকে বলা—‘খুব ভাল গেয়েছ’। থেকে গিয়েছে বিস্ময়ও—জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও কী ভাবে প্রতিটি শব্দ এমন স্পষ্ট, এমন যত্নে গানের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতেন তিনি!

– বিজ্ঞাপন –

গত ৬ অক্টোবর প্রয়াত হয়েছেন বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত। বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বেশ কিছু দিন ধরেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর প্রয়াণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি দীর্ঘ সাধনাপর্বের অবসান ঘটল।

ত্রিপুরা থেকে কলকাতা, তার পর দীর্ঘ সঙ্গীতযাপন

ত্রিপুরায় জন্ম বিভা সেনগুপ্তের। ১৯৫৯ সালে কলকাতায় আসেন তিনি। সঙ্গীতের প্রাথমিক তালিম নিয়েছিলেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মায়া সেনের কাছে। তাঁর সূত্রেই পরবর্তী সময়ে পৌঁছোন দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের সেই বিশিষ্ট ধারার সান্নিধ্য তাঁর নিজের সঙ্গীতজীবনেও গভীর ছাপ রেখে যায়।

যে সময়ে বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগৎ আলোকিত করে রয়েছেন একের পর এক কিংবদন্তি শিল্পী, সেই সময়েরই মানুষ বিভা সেনগুপ্ত। অথচ প্রচারের আলোয় থাকার চেয়ে নিভৃতে সঙ্গীতচর্চাতেই যেন বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি।

শুধু নিজে গান গাওয়া নয়, পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সেই শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়াও ছিল তাঁর সঙ্গীতযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাগর সেন প্রতিষ্ঠিত ‘রবিরশ্মি’-তে দীর্ঘ সময় গান শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে তৈরি হয়েছেন বহু শিক্ষার্থী।

বিজ্ঞাপন

গুরু দেবব্রত বিশ্বাসের প্রতিও ছিল গভীর শ্রদ্ধা। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর জন্মদিন পালন করতেন বিভা সেনগুপ্ত।

‘উনি আমার কাছে দূরতম এক নক্ষত্রের মতো’

তবে একজন শিল্পীর পরিচয় কি শুধুই তাঁর গানের রেকর্ড, অনুষ্ঠান কিংবা সঙ্গীতশিক্ষার ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকে?

বিভা সেনগুপ্তকে স্মরণ করতে গিয়ে গীতবিতানের প্রাক্তনী প্রদীপ চক্রবর্তীর কথায় উঠে এল অন্য এক বিভাদি—যাঁর সামান্য কয়েকটি কথা একজন সাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে উঠেছিল আজীবনের প্রেরণা।

প্রদীপ চক্রবর্তীর কখনও বিভা সেনগুপ্তের কাছে সরাসরি গান শেখার সৌভাগ্য হয়নি। তাঁর কথায়, “উনি ছিলেন আমার চোখে দূরতম এক নক্ষত্রের মতো। রবীন্দ্রসঙ্গীতের দিকপাল গুণী শিক্ষাগুরুদের মতো। আমিও কোনো অর্থে শিল্পী নই। একজন অতি সাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার্থী।”

এক বন্ধুর আমন্ত্রণে বিভা সেনগুপ্তের গোষ্ঠীর একটি রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়েছিলেন প্রদীপ। সেখানে শ্রোতাদের মধ্যে যে বিভা সেনগুপ্তও রয়েছেন, তা তাঁর জানা ছিল না।

গান শেষ হল। মঞ্চ থেকে নামলেন। নিজের গানের ভুলত্রুটি নিয়ে তখনও মনে সংশয়। বিভা সেনগুপ্তের আসনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ে ভয়ে আড়চোখে তাকিয়েছিলেন তাঁর দিকে।

তার পরেই এল সেই ডাক। সেই মুহূর্ত আজও ভুলতে পারেননি প্রদীপ। তাঁর কথায়, “আমি যেমন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম, তেমনই এক নিঃসীম সুগভীর প্রেরণা আমার মনকে আপ্লুত করে দিয়েছিল চিরজীবনের মতো। আমি তাঁর পায়ের ধূলি মাথায় নিয়ে চলে এলাম।”

এক বার নয়, বারবার মনে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরও দু’-তিনটি পৃথক রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সময় শ্রোতা হিসেবে বিভা সেনগুপ্তকে পেয়েছিলেন প্রদীপ। প্রতিবারই গান শেষে সেই একই স্নেহমাখা স্বীকৃতি—“খুব ভাল হয়েছে।”

প্রদীপকে আরও বেশি বিস্মিত করেছিল, এত মানুষের মধ্যে বিভাদি তাঁকে মনে রেখেছিলেন।

আজ তাই বিভা সেনগুপ্তের মৃত্যু তাঁর কাছে শুধুমাত্র একজন বরেণ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর চলে যাওয়া নয়। কোথাও যেন হারিয়ে গেলেন এক অভিভাবকও।

প্রদীপের কথায়, “আজ তিনি আমাদের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে স্থান নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু কোথাকার কে এক আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার্থী, একান্তে সবার চোখের আড়ালে এক অতি আপনজনের দুঃসহ বিয়োগব্যথায়, এক পরম অভিভাবকের নিষ্ঠুর শূন্যতা বুকে নিয়ে মূক হয়ে আছি।”

‘ওই বয়সেও প্রতিটি শব্দ এত সুন্দর করে উচ্চারণ করতেন’

বিভা সেনগুপ্তের আর একটি দিক উঠে এল গীতবিতানের আর এক প্রাক্তনী শর্মিষ্ঠা সেনের স্মৃতিচারণে।

তাঁর মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল শিল্পীর শেষ বয়সের গায়কি। ৯০ পেরিয়েও কণ্ঠে শব্দের স্পষ্টতা এবং গানের কথার প্রতি যত্ন দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন তাঁরা।

শর্মিষ্ঠার স্মৃতিতে, “ওই বয়সে তাঁর কণ্ঠে শব্দগুলি এত সুন্দর এবং স্পষ্ট ভাবে উঠে আসত যে, সেটা দেখে আমরা সত্যিই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।”

বয়স শরীরের উপরে ছাপ ফেলেছে, কিন্তু গানকে প্রকাশ করার নিজস্ব বোধ যেন শেষ পর্যন্ত অমলিন ছিল।

শর্মিষ্ঠা বলেন, “প্রতিটি গান তিনি এত সুন্দর করে গাইতেন যে, এইটুকু বলার মধ্যে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো সম্ভব নয়।”

তাঁর অনুভব, বিভা সেনগুপ্তের সঙ্গীতসাধনাকে কয়েকটি বাক্যে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করলে বরং অনেকটাই না-বলা থেকে যাবে।

শেষ প্রান্তেও সঙ্গে ছিল গান

জীবনের শেষ পর্বেও গান থেকে দূরে সরে যাননি বিভা সেনগুপ্ত। বরং শেষ দশ-বারো বছরে নতুন করে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছেও তাঁর পরিচিতি বাড়ছিল।

মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগেও তাঁকে ঘিরে ছিল সঙ্গীতের আবহ। ২৯ সেপ্টেম্বর ‘লোকভারতী’র পক্ষ থেকে তাঁর ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সঙ্গীতশিল্পী অলক রায়চৌধুরীর স্মৃতিতে সেই সংবর্ধনা। তখনও কথা বলেছেন, স্মৃতিচারণ করেছেন।

এমনকি তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে প্রকাশিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর্যালোচনাতেও উঠে এসেছিল তাঁর গানের প্রসঙ্গ। বয়স ৯৪ ছুঁলেও তাঁর স্বরক্ষেপণ, শব্দের স্পষ্টতা এবং সংযত গায়কি মুগ্ধ করেছিল শ্রোতাদের।

তার কয়েক দিনের মধ্যেই এল বিদায়।

মানুষটিও থেকে গেলেন গানের সঙ্গে

বিভা সেনগুপ্ত হয়তো নিজেকে কখনও প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে চাননি। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাস কেবল বহুল প্রচারিত কয়েকটি নামের ইতিহাস নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন অনেক নিভৃত সাধকের জীবন, যাঁরা দশকের পর দশক গান শিখেছেন, গান শিখিয়েছেন এবং একটি সাঙ্গীতিক উত্তরাধিকারকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

বিভা সেনগুপ্ত সেই পরম্পরারই এক প্রতিনিধি। তাই তাঁর প্রয়াণের দু’দিন পরে ফিরে তাকালে শুধু একজন ৯৪ বছরের শিল্পীর দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনই চোখে পড়ে না।

এক দিকে দেখা যায় দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গীত-পরম্পরাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া এক নিষ্ঠাবান সাধককে। অন্য দিকে দেখা যায় এক স্নেহময়ী মানুষকে, যিনি কোনও অনুষ্ঠানে এক সাধারণ শিক্ষার্থীর গান শুনে তাঁকে ডেকে বলতে পারেন—“খুব ভালো গেয়েছো।”

আর সেই কয়েকটি শব্দই হয়তো কোনও শিক্ষার্থীর সারাজীবনের প্রেরণা হয়ে থেকে যায়।

বিভা সেনগুপ্ত চলে গিয়েছেন। কিন্তু প্রদীপ চক্রবর্তীর স্মৃতির সেই ‘দূরতম নক্ষত্র’ কিংবা শর্মিষ্ঠা সেনের বিস্ময়ে ধরা পড়া শেষ বয়সের সেই স্পষ্ট কণ্ঠ—দুইয়ের মধ্যেই রয়ে গেলেন তিনি।

গানে, স্মৃতিতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যাওয়া এক দীর্ঘ উত্তরাধিকারে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *