সুন্দর, উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর ত্বক পেতে শুধু দামি প্রসাধনী ব্যবহার করলেই হয় না। ত্বকের সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের ওপর। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, শরীরের ভেতরে সঠিক পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করা গেলে ত্বকও থাকে সতেজ, মসৃণ ও উজ্জ্বল। অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, অতিরিক্ত রোদে থাকা এবং বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে ত্বকে দ্রুত বার্ধক্যের ছাপ দেখা দিতে পারে।

কেন কমে যায় ত্বকের জেল্লা?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে কোলাজেন ও ইলাস্টিনের উৎপাদন কমতে শুরু করে। এর পাশাপাশি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং ত্বকের শুষ্কতা ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা নষ্ট করে দেয়।

– বিজ্ঞাপন –

অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষেত্রে শরীরে তৈরি হওয়া ফ্রি র‌্যাডিক্যাল ত্বকের কোষের ক্ষতি করে। অতিবেগুনি (UV) রশ্মি, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এই ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিক্যালের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত পরিশোধিত চিনি, উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI)-যুক্ত খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বেশি খেলে শরীরে প্রদাহ বাড়তে পারে। এর প্রভাব ত্বকেও পড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে ব্রণ, ত্বকের জ্বালাভাব এবং অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

এছাড়া ত্বকে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে ত্বক শুষ্ক হয়ে পড়ে। শুষ্ক ত্বকে বলিরেখা দ্রুত দৃশ্যমান হয় এবং ত্বকের প্রাকৃতিক জেল্লাও কমে যায়।

ত্বক ভালো রাখতে কী খাবেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ তৈলাক্ত মাছ রাখলে ত্বক ভেতর থেকে পুষ্টি পায়। এসব খাবারে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান কোষের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়ক।

ত্বকের জেল্লা বাড়াতে যেসব খাবার নিয়মিত খেতে পারেন

১. লেবুজাতীয় ফল

কমলা, পাতিলেবু, লেবু ও বাতাবিলেবু, মৌসম্বি লেবু ভিটামিন সি-এর উৎকৃষ্ট উৎস। এই ফলগুলো শরীরে কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বককে উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একটি কমলা বা এক গ্লাস টাটকা লেবুর শরবত খাদ্যতালিকায় রাখা উপকারী হতে পারে।

২. ক্যাপসিকাম

সবুজ, লাল, হলুদ বা কমলা—সব ধরনের ক্যাপসিকামেই প্রচুর ভিটামিন সি এবং বিটা-ক্যারোটিন থাকে। এগুলো ত্বকের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। সালাদ, স্যুপ বা হালকা ভাজি হিসেবে ক্যাপসিকাম খাওয়া যেতে পারে।

৩. ব্রকলি

ব্রকলিতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, ফাইবার এবং সালফোরাফেনের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব উপাদান ত্বকের প্রদাহ কমাতে এবং সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কোষকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে সহায়তা করতে পারে। ভাপে সেদ্ধ বা হালকা রোস্ট করে খেলে এর পুষ্টিগুণ বেশি বজায় থাকে।

৪. স্ট্রবেরি

স্ট্রবেরিতে প্রচুর ভিটামিন সি, অ্যান্থোসায়ানিন এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো ফ্রি র‌্যাডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। টাটকা ফল হিসেবে বা দই ও স্মুদির সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।

৫. কিউই

কিউই ভিটামিন সি-এর অন্যতম সমৃদ্ধ উৎস। পাশাপাশি এতে রয়েছে ভিটামিন ই, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। নিয়মিত কিউই খেলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। ফলের সালাদ বা সকালের নাশতায় এটি রাখা যেতে পারে।

৬. বাদাম

কাঠবাদাম, আখরোট, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন বাদামে রয়েছে ভিটামিন ই, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলো ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।

৭. তৈলাক্ত মাছ

স্যামন, সার্ডিন বা ম্যাকেরেলের মতো তৈলাক্ত মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের প্রদাহ কমাতে এবং ত্বককে কোমল রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে এসব মাছ খাওয়া ত্বকের জন্য উপকারী।

যেসব খাবার কম খাওয়াই ভালো

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, পরিশোধিত চিনি, সফট ড্রিঙ্কস, অতিরিক্ত ভাজাভুজি এবং উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার কম খাওয়ার। এসব খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে, যা ত্বকের স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনও খাবারই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়; মূল কথা হলো পরিমিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাস।

শেষ কথা

উজ্জ্বল ত্বকের জন্য শুধু প্রসাধনী নয়, প্রয়োজন ভেতর থেকে সঠিক পুষ্টি। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল, সবুজ শাকসবজি, বাদাম, ডাল এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার রাখুন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান করুন, নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন, পর্যাপ্ত ঘুমান এবং ধূমপান এড়িয়ে চলুন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই দীর্ঘদিন ত্বকের প্রাকৃতিক জেল্লা ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *