মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট: ১ (৯) (সাহাল আব্দুল সামাদ) জামশেদপুর এফসি: ১ (৮) (দেবেন্দ্র মুরগাঁওকর)
খবর অনলাইন ডেস্ক: জামশেদপুর এফসির পথচলা থেমে গেল ডুরান্ড কাপেই। টাটা গোষ্ঠী সম্প্রতি তাদের ফুটবল ক্লাবের ১০০ শতাংশ ইকুইটি স্টেক চার্চিল ব্রাদার্সের হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী জামশেদপুর এফসির পুরনো অধ্যায়ের শেষ প্রতিযোগিতা হিসেবে থেকে গেল এ বছরের ডুরান্ড কাপ। আর সেই শেষ ম্যাচে লড়াইটা সহজে ছেড়ে দিল না ইস্পাতনগরীর দল। শক্তিশালী মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ ড্র করার পর টাইব্রেকারেও সমানে সমানে লড়াই করল তারা। শেষ পর্যন্ত সাডেন ডেথে গিয়ে ম্যাচের নিষ্পত্তি হল। জামশেদপুরের নবম শট আটকে মোহনবাগানের নায়ক হয়ে উঠলেন গোলরক্ষক বিশাল কাইথ। এর পর অভিষেক টেকচাম সিংয়ের নিখুঁত শটে ৯-৮ গোলে জয় নিশ্চিত করে শেষ চারে পৌঁছে গেল সবুজ-মেরুন শিবির।
– বিজ্ঞাপন –
প্রথমার্ধে ১-১
বিদেশি ফুটবলার ছাড়াই এ দিন মাঠে নেমেছিল জামশেদপুর। বিপরীতে শক্তিশালী দল নিয়ে খেলতে নামা মোহনবাগান শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল। ম্যাচের শুরুতেই তার ফলও পাওয়া যায়। মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই এগিয়ে যায় সবুজ-মেরুন। সার্বিয়ান ফুটবলার দেজান দ্র্যাজিচের বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে এনে জামশেদপুর গোলরক্ষক আলবিনো গোমসকে পরাস্ত করেন সাহাল আব্দুল সামাদ। ম্যাচের শুরুতেই গোল পেয়ে যাওয়ায় মনে হয়েছিল, এর পর হয়তো সহজেই প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে জয় তুলে নেবে মোহনবাগান।
কিন্তু জামশেদপুরের ফুটবলাররা সেই সুযোগ দেননি। গোল হজম করার পর ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে তারা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মাঝমাঠে লড়াই বাড়ানোর পাশাপাশি মোহনবাগানের রক্ষণেও চাপ তৈরি করতে থাকে ইস্পাতনগরীর দল। একের পর এক আক্রমণের পর প্রথমার্ধের একেবারে শেষ লগ্নে সমতা ফেরানোর সুযোগ আসে। দূরপাল্লার শট রুখে দিয়েছিলেন বিশাল কাইথ। কিন্তু তাঁর হাত থেকে ফিরে আসা বল কাজে লাগাতে কোনও ভুল করেননি দেবেন্দ্র মুরগাঁওকর। ফিরতি বল জালে জড়িয়ে ১-১ করেন তিনি।

মোহনবাগানের হয়ে প্রথম গোল করেন সাহাল আব্দুল সামাদ।
ছন্দহীন মোহনবাগান, খেলা গেল টাইব্রেকারে
প্রথমার্ধ শেষ হয় সমতায়। দ্বিতীয়ার্ধে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার বদলে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে মোহনবাগান। জামশেদপুরের লড়াকু ফুটবলের সামনে বেশ কিছু সময় সবুজ-মেরুনকে ছন্দহীন দেখায়। অবশ্য সুযোগ একেবারেই তৈরি করতে পারেনি এমন নয়। একাধিকবার গোল করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগগুলির সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হন লিস্টন কোলাসো, মনবীর সিংরা।
বিজ্ঞাপন
পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামা জেমি ম্যাকলারেনও প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেননি। গোলের সুযোগ খুঁজতে গিয়ে কার্যত বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে মাঠে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। ফলে ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে স্কোরলাইন বদলায়নি। ১-১ ব্যবধানে ম্যাচ শেষ হওয়ায় ডুরান্ড কাপের নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি টাইব্রেকারে যেতে হয় দুই দলকে।

ম্যাচের একটি মুহূর্ত।
টাইব্রেকারের প্রথম পাঁচ শটে দুই দলই সফল
শুটআউটে শুরু থেকেই ছিল টানটান উত্তেজনা। ম্যাচের আগের দিনই ফুটবলারদের পেনাল্টি অনুশীলন করিয়েছিলেন মোহনবাগান কোচ প্যানাগিওটিস ডিম্পেরিস। মাঠে সেই প্রস্তুতিরই প্রমাণ পাওয়া গেল। টাইব্রেকারের প্রথম পাঁচটি শটে দুই দলের কোনও ফুটবলারই ব্যর্থ হননি। অর্থাৎ, পাঁচটি করে শটের পরও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়নি। দু’দলের প্রত্যেকেই নিশানায় বল পাঠিয়ে যাওয়ায় খেলা গড়ায় সাডেন-ডেথে।
সেখানেও চাপের মুখে নিজেদের ঠান্ডা মাথা ধরে রাখে মোহনবাগান। একের পর এক শটে গোল করে তারা। রাহুল ভেকে, সমীর জেলজকোভিচ, শুভাশিস বসু, জেমি ম্যাকলারেন, কিয়ান নাসিরি, অনিরুদ্ধ থাপা, আলবার্তো রড্রিগেজ এবং সুহেল ভাট—মোহনবাগানের হয়ে শুটআউটে প্রত্যেকেই গোল করেন। এর পর আসে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
শট বাঁচালেন বিশাল, জয়সূচক গোল অভিষেকের
সাডেন-ডেথে জামশেদপুরের হয়ে নবম শট নিতে আসেন লালসামজুয়ালা। তাঁর শটের দিক বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে বল আটকে দেন বিশাল কাইথ। সেই সেভেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। এর পর মোহনবাগানের হয়ে স্পট কিকে দাঁড়ান অভিষেক টেকচাম সিং। কোনও ভুল না করে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয়ে যায় মোহনবাগানের সেমিফাইনালের টিকিট। পেনাল্টি শুটআউটে ৯-৮ গোলে জয় পায় সবুজ-মেরুন।

জয়ের পরে মোহনবাগান।
জামশেদপুরের শেষ প্রতিযোগিতা
এই ম্যাচ দিয়েই কার্যত জামশেদপুর এফসির পুরনো অধ্যায়ের পর্দা নামল। ক্লাবের মালিকানার পরিবর্তনের আগে ডুরান্ড কাপই হয়ে রইল জামশেদপুরের শেষ প্রতিযোগিতা। সেই শেষ ম্যাচে নিখিল বার্লা, প্রণয় হালদারদের লড়াই অবশ্য মনে রাখার মতো হয়ে থাকল। বিদেশি ফুটবলার ছাড়াই শক্তিশালী মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করে টাইব্রেকার পর্যন্ত ম্যাচ টেনে নিয়ে যাওয়াই তাদের লড়াকু মানসিকতার প্রমাণ।
অন্যদিকে, ম্যাচে প্রত্যাশিত দাপট দেখাতে না পারলেও শেষ পর্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি সামলে শেষ চারে পৌঁছে গেল মোহনবাগান। এ বার সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হবে নর্থ-ইস্ট ইউনাইটেড ও শিলং লাজংয়ের মধ্যকার ম্যাচের জয়ী দল। শিলংয়ের মাটিতেই হবে সেই সেমিফাইনাল। ফলে ডুরান্ডের ট্রফি জয়ের লক্ষ্যে এ বার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল প্যানাগিওটিস ডিম্পেরিসের দল।
ছবি: সঞ্জয় হাজরা
