ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
ঢাকার আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আলী হোসেন চাকরি করতেন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। করোনা মহামারিতে চাকরি হারানোর পর উপায়ান্ত না পেয়ে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং শুরু করেন। সেখান থেকে প্রতিদিন যা আয় হয়, সেটি দিয়েই চলে স্ত্রী-সন্তানসহ তাদের চারজনের সংসার।
“কিন্তু এইখানেও অবস্থা ভালো না। একদিকে যাত্রীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। আবার তেলের দাম বাড়তির কারণে আমাদেরও খরচে পোষাইতেছে না। এখন কীভাবে চলমু, সেইটা নিয়াই টেনশনে আছি,” বলছিলেন মি. হোসেন।
গত কয়েক মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে সাধারণ মানুষকে এখন রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই সোমবার থেকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। এর ফলে কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্নক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
“জ্বালানি তেল এমন একটি জিনিস, যেটার দাম বেড়ে গেলে চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে সেটার প্রভাব কৃষি, শিল্প, পরিবহনসহ সবখাতেই পড়ে। উৎপাদন পর্যায়ে খরচ বাড়লে বাজারে পণ্য ও সেবার দামও বেড়ে যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হার টানা উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করায় বাজারে জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠছে। এর মধ্যে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়লে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিবেন, সেটি নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন অনেকে।
“সরকার তো খালি জিনিসের দামই বাড়ায়; আমরা কীভাবে বাঁচবো, সে কথা সরকার ভাবে? সরকারি চাকরিজীবীদের না হয় বেতন বাড়ছে, আমাদের বেতন কে বাঁড়াবে?,” ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম।
সরকার বলছে, বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের হাতে কোনো বিকল্প ছিল না। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেন অস্বাভাবিকহারে না বাড়ে, সেজন্য নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দিচ্ছেন তারা।
“বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আমরা জোরদার করবো, যাতে করে জ্বালানি তেলের এই মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র ফায়দা লুটতে না পারে,” সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে ক্ষোভ
গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর তৃতীয় বারের মতো জ্বালানি তেলের দাম বাড়াল বিএনপি সরকার। এর মধ্যে প্রথম দফায় দাম বাড়ানো হয়েছিল গত ১৮ই এপ্রিল।
তখন ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া পেট্রলের দাম লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন তেলের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।
মাসখানেক পর জুনে পেট্রল, অকটেন এবং কেরোসিনের দাম আরও পাঁচ টাকা করে বাড়ানো হয়।
এরপর গত রোববার ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। এতে দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সোমবার থেকে লিটার প্রতি ডিজেল কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৩৫ টাকা করে। এছাড়া পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এমন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গাড়ির মালিক ও চালকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।
“দুইদিন পরপরই তেলের দাম বাড়ায়, গ্যাসের দাম বাড়ে। তো সব টাকা যদি তেল-গ্যাসের পিছেই চলে যায়, তাহলে আমরা কি না খাইয়া থাকুম?,” ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন ট্রাকচালক হাবিবুর রহমান।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
কোথায় কী প্রভাব পড়বে?
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদের কৃষিতে সেচ এবং শিল্প কারখানার উৎপাদন এখনও অনেকাংশে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষি ও শিল্পখাতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
“এতে চাল, ডাল থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক শিল্প- সবখানের পণ্যের বাড়বে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের ওপর যেমন চাপ আরও বাড়বে, তেমনি রপ্তানিক্ষেত্রে পোশাক শিল্পখাতের ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন,” বলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।
এছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাস, লঞ্চসহ বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনেরও ভাড়া বেড়ে যেতে পারে। এতে মানুষের যাতায়াত খরচও বেড়ে যাবে।
এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা বলা হলেও সেটি মনিটরিং কতটা করা যাবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
“জিনিসপত্রের দামের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। ফলে সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, সেটিও বেড়ে যেতে পারে,” বলেন মিজ খাতুন।
এর আগে, ২০২২ সালের অগাস্টে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম একলাফে অনেক বাড়িয়েছিল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার।
তখন ডিজেলের লিটার ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। অকটেন ও পেট্রলের দামও প্রথমবারের মতো ১০০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
একইভাবে, পেট্রলের দাম প্রতিলিটার ৮৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেনের দাম ৮৯ থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছিল।
এর ফলে একমাসের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দুই শতাংশ বেড়ে সাড়ে সাত শতাংশ থেকে সাড়ে নয় শতাংশ ছুঁয়েছিল।
“এবার হয়তো তেমনটাই ঘটবে এবং মানুষের টিকে থাকা চরম কঠিন হয়ে পড়বে,” ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।
ছবির উৎস, Getty Images
কী বলছে সরকার?
বাংলাদেশের সরকার বলছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। ফলে তারা জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
“এবারের মধ্যপ্রাচ্য সংকট জ্বালানির ক্ষেত্রে যে সমস্যা তৈরি করেছে, সেটার সাথে কোভিড মহামারি কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটও তুলনা করা যায় না,” সোমবার সাংবাদিকদের বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এক বিবৃতিতে জ্বালানি বিভাগ বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরেও গত পাঁচ মাস দেশে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
এর ফলে গত মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
বিবৃতিতে এটাও বলা হয়েছে যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান হচ্ছে প্রায় ৮৯ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা।
এখন জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে কলকাতায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা দরে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছে সরকার।
“সবদিক বিবেচনায় নিয়েই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে,” বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মি. অমিত।
নতুন দাম কার্যকরের কারণে গণপরিবহন ও বাজারের নিত্যপণ্যের দাম যেন অযৌক্তিকহারে না বাড়ানো হয়, সেজন্য নজরদারি জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
গত কয়েক বছর প্রতিমাসে যেভাবে বিশ্ববাজারের সঙ্গে মিল রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করা হতো, এবার সেটি করা হয়নি।
“এবার সেটা হয়নি, কারণ ওইটা পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করা হলে ডিজেলের দাম দুইশ’ টাকা ছাড়িয়ে যেত,” বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী মি. অমিত।
