নয়াদিল্লি: মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সাময়িক ভাবে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার আর্জি-সহ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার শুনানি সোমবার সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাগুলি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর আগে শীর্ষ আদালত জ্ঞানেশ কুমারের কাজের পদ্ধতি নিয়ে দায়ের হওয়া আবেদন শুনতে সম্মত হয়েছিল।

পটনার বাসিন্দা রাকেশ কুমার সিং এবং আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর দায়ের করা আবেদনে অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীর সম্মতি ছাড়াই একাধিক সিদ্ধান্ত, নির্দেশিকা এবং সফটওয়্যার-সংক্রান্ত পরিবর্তন কার্যকর করা হয়েছে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের মতো বহু-সদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কোনও এক জনের হাতে নয়; কমিশনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তা হওয়া উচিত।

– বিজ্ঞাপন –

রাকেশ কুমার সিংয়ের জনস্বার্থ মামলায় আদালতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, কমিশনের হাতে ন্যস্ত ক্ষমতা জ্ঞানেশ কুমার ব্যক্তিগত ভাবে প্রয়োগ করেছেন কি না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলিকে অনুমোদনহীন ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের আর্জিও জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমারকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার আবেদন করা হয়েছে। সেই সময় কমিশনের দুই অন্য সদস্য সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে কমিশনের কাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়ার আর্জিও রয়েছে।

এই মামলার নেপথ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সেখানে দাবি করা হয়, গত কয়েক মাসে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিশনের অন্য দুই সদস্য আপত্তি জানিয়েছিলেন। অভিযোগ, তাঁদের অজ্ঞাতেই কিছু নির্দেশ এবং সফটওয়্যার পরিবর্তন কার্যকর হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের পরেই কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক সামনে আসে।

যদিও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, কোনও প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে আলোচনা চলাকালীন সদস্যদের ভিন্ন মত বা পর্যবেক্ষণ থাকা স্বাভাবিক। কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি নির্ধারিত আইন ও বিধি মেনেই নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তী সময়ে কমিশন কয়েকটি নতুন সিদ্ধান্তও ঘোষণা করে, যার মধ্যে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের তোলা কিছু উদ্বেগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ফর্ম ৬ এবং পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত আপিলের মতো কয়েকটি বিষয় তখনও অমীমাংসিত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর আবেদনে বিশেষ ভাবে ২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners Act-এর ১৮ নম্বর ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর বক্তব্য, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে কোনও এক জনের একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই—এমনটাই মামলাকারীর দাবি।

ফর্ম ৬ নিয়েও প্রশ্ন

মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন ভোটার হিসাবে নাম নথিভুক্ত করার ফর্ম ৬। অভিযোগ, পূর্ববর্তী SIR-এর সঙ্গে সংযোগ এবং পূর্বপুরুষের তথ্য সংক্রান্ত কিছু বিষয় কমিশনের সফটওয়্যারে যুক্ত করা হয়েছিল, অথচ তার জন্য প্রয়োজনীয় বিধিবদ্ধ সংশোধন করা হয়নি। কমিশনের অন্য দুই সদস্যও এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে আবেদনকারীর দাবি। ফর্ম ৬ এবং পশ্চিমবঙ্গের আপিল সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি কমিশনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পরেও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা নিয়েও মামলায় গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ফিরেছিল, তাঁদের মধ্যে ১৬ লক্ষেরও বেশি ভোটারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নামে আপিল করা হয়। অথচ কমিশনের অন্য দুই সদস্য এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক সেই আপিল অনুমোদন করেননি বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখন আদালতের বিচারাধীন।

শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর মামলায় জ্ঞানেশ কুমার-সহ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং আইনি পদক্ষেপের আর্জিও জানানো হয়েছে। অন্য দিকে, রাকেশ কুমার সিংয়ের আবেদনে জ্ঞানেশ কুমারের একক সিদ্ধান্তে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা নির্দেশ, সিদ্ধান্ত এবং সফটওয়্যার পরিবর্তনগুলির বৈধতা খতিয়ে দেখার আবেদন করা হয়েছে।

ফলে সোমবারের শুনানিতে মূল প্রশ্ন হতে পারে—নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একক ভাবে কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন এবং কমিশনের অন্য দুই সদস্যের সম্মতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মত কতটা বাধ্যতামূলক।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *