জনগণনা ২০২৭-এ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে চলেছে। এবার আর ‘ভিখারি ও ভবঘুরে’ হিসেবে আলাদা কোনও শ্রেণিতে তথ্য নথিভুক্ত করা হবে না। একই সঙ্গে অভিবাসনের কারণের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’। নতুন জনগণনা-প্রশ্নমালা ঘিরে এই তথ্য উঠে এসেছে। বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
২০১১ সালের জনগণনা এবং তার আগের জনগণনায় ‘নন-ইকনমিক অ্যাক্টিভিটি’-র আওতায় ‘বেগার্স অ্যান্ড ভ্যাগ্রান্টস’ বা ভিখারি ও ভবঘুরেদের জন্য আলাদা শ্রেণি ছিল। ছাত্রছাত্রী, গৃহস্থালির কাজে যুক্ত ব্যক্তি, নির্ভরশীল, পেনশনভোগী, ভাড়ার আয়ে থাকা ব্যক্তি-সহ অন্যান্য শ্রেণির পাশাপাশি তাঁদেরও আলাদা ভাবে গণনা করা হত। কিন্তু ২০২৭-এর জনগণনায় এই পৃথক শ্রেণি বাদ পড়ছে। তাঁরা এখন ‘অন্যান্য’ শ্রেণির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন। ফলে দেশের মোট ভিখারির সংখ্যা কিংবা বয়স, ধর্ম, রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তাঁদের বিভাজনের তথ্য জনগণনার আলাদা সারণিতে আর পাওয়া যাবে না।
– বিজ্ঞাপন –
এর অন্যতম কারণ হিসেবে আগের জনগণনায় এই শ্রেণিতে খুব কম সংখ্যক মানুষের তথ্য নথিভুক্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০১১ সালের জনগণনায় প্রায় ৩.৮ লক্ষ নন-ওয়ার্কার ও মার্জিনাল ওয়ার্কার নিজেদের ‘ভিখারি ও ভবঘুরে’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ২০০১ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৬.৩ লক্ষ এবং ১৯৯১ সালে প্রায় ৫.৪ লক্ষ। তবে এই পরিসংখ্যানকে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয়নি। সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেকেই নিজেদের এই পরিচয়ে চিহ্নিত করতে অনিচ্ছুক ছিলেন বলে সূত্রের দাবি। জনগণনার নিয়ম অনুযায়ী, গণনাকারীকে উত্তরদাতা যে পেশা বা নন-ইকনমিক অ্যাক্টিভিটি উল্লেখ করেন, সেটিই নথিভুক্ত করতে হয়।
অন্যদিকে, জনগণনা ২০২৭-এ অভিবাসনের কারণের তালিকাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কাজ, ব্যবসা, শিক্ষা, বিয়ে, জন্মের পর স্থান পরিবর্তন, পরিবারের সঙ্গে স্থানান্তর এবং ‘অন্যান্য’-র পাশাপাশি এবার ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’কেও অভিবাসনের একটি পৃথক কারণ হিসেবে ধরা হবে। ফলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষের স্থানান্তরের প্রবণতা সম্পর্কে আলাদা তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এবারের জনগণনা-ফর্মে বাবা ও মায়ের সম্পর্কেও অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হচ্ছে। তাঁদের জন্মের তারিখ, জন্মস্থান এবং ধর্মের তথ্য নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সূত্রের দাবি, বাবা-মা একই পরিবারের সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত না থাকলে অথবা তাঁরা আর জীবিত না থাকলে এই তথ্য পূরণ করতে হবে। কারণ একই পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে তাঁদের ধর্ম এবং জন্মতারিখ ও জন্মস্থান সংক্রান্ত তথ্য ইতিমধ্যেই নথিভুক্ত করা হচ্ছে।
বাবা ও মায়ের ধর্মের তথ্য সংগ্রহের ফলে ভবিষ্যতে আন্তঃধর্মীয় বিবাহের প্রজন্মভিত্তিক প্রবণতা এবং ধর্মান্তরের ইতিহাস সম্পর্কেও কিছু সামগ্রিক তথ্য উঠে আসতে পারে বলে সূত্রের দাবি। পাশাপাশি বাবা-মায়ের জন্মতারিখ ও জন্মস্থান সংক্রান্ত তথ্য থেকে নাগরিকত্ব আইনের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণকারী ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সম্পর্কেও সামগ্রিক পরিসংখ্যান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এবারের প্রশ্নমালায় মোবাইল নম্বর, আধার, ভোটার আইডি এবং ভারতীয় পাসপোর্ট নম্বরের জন্যও ঘর রাখা হয়েছে, যেখানে সেগুলি ‘উপলব্ধ’ থাকবে। তবে সূত্রের দাবি, গণনাকারীদের এই তথ্য দিতে কাউকে বাধ্য না করে উৎসাহিত করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা হবে—এই আশ্বাস দেওয়ার পরও কোনও উত্তরদাতা নম্বর দিতে না চাইলে সংশ্লিষ্ট ঘর ফাঁকা রাখা হবে।
এই ফাঁকা ঘরগুলিও ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছে জনগণনা কর্তৃপক্ষ। কোন নথির নম্বর মানুষ তুলনামূলক ভাবে বেশি দিতে অনিচ্ছুক—আধার, ভোটার আইডি না পাসপোর্ট—সেই প্রবণতাও সামগ্রিক ভাবে বোঝা সম্ভব হবে বলে এক আধিকারিককে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া।
ফলে জনগণনা ২০২৭ শুধু জনসংখ্যা গণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ‘ভিখারি ও ভবঘুরে’ শ্রেণি বাদ দেওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অভিবাসনের কারণ হিসেবে যুক্ত করা, বাবা-মায়ের অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ এবং পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্যের নতুন ঘর—সব মিলিয়ে এবারের জনগণনায় তথ্য সংগ্রহের ধরনেও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
