ছবির উৎস, DDN
বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামে চাঁদার টাকা না দেওয়ায় দিনেদুপুরে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও জড়িতদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
ফলে গত সোমবার দুপুরের ওই হামলার ঘটনার পর থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে নগরীর ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের মধ্যে। হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
“চাঁদার টাকা না দেওয়ার কারণে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে-দিবালোকে যেভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে, সেটা খুবই উদ্বেগের। এ ঘটনার পর আমাদের কর্মীদের মধ্যে অনেকে অফিসে আসতে ভয় পাচ্ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার রুবেন্স।
“এ অবস্থায় অপরাধীদের ধরা না হলে এবং প্রশাসন আমাদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবা চালু রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না,” বলেন মি. রুবেন্স।
গত কয়েক মাসে চট্টগ্রামে একাধিক ব্যবসায়ীর কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। প্রাণনাশের হুমকি থাকায় তাদের একজনের বাসায় পাহারাও বসিয়েছিল পুলিশ।
কিন্তু সেই পাহারার মধ্যেই গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ভোরে মোস্তাফিজুর রহমান নামের ওই ব্যবসায়ীর বাসা লক্ষ্য করে সাব মেশিনগান, চায়নিজ রাইফেল, শর্টগান এবং পিস্তল দিয়ে এক ডজনেরও বেশি গুলি ছোঁড়া হয়।
“ওই ঘটনার পর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে আমাদের অফিসে হয়তো হামলার ঘটনা ঘটতো না,” বলছিলেন সোমবার দুপুরে হামলার শিকার ইন্টারনেটসেবা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) অন্যতম পরিচালক রিদোয়ানুল কবির।
পুলিশ অবশ্য বলছে যে, তারা হামলাকারীদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করেছে।
“সিসিটিভির ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের বেশ কয়েক জনের পরিচয় আমরা ইতোমধ্যেই পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। অভিযান শুরু হয়েছে। আশাকরি, শিগগিরই সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে,” বলেন চট্টগ্রামে মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাবিবুর রহমান।
কিন্তু একের পর এক এসব চাঁদাবাজির ঘটনার নেপথ্যে আসলে কারা? পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারছে না কেন?
ছবির উৎস, CMP
কী ঘটেছিল সোমবার?
চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৩ই জুলাই দুপুরে ডিজিটাল ডট নেট নামে যে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে, সেটির কার্যালয় নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কের পাশে একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত।
প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ক্যামেরা হামলার পুরো ঘটনাটি ধরা পড়েছে।
সেখানে দেখা যাচ্ছে, সোমবার বেলা ১২টা ২০ মিনিটের দিকে ২০ থেকে ৩০ জনের একদল ব্যক্তি দেশিয় অস্ত্র, লোহার রড ও লাঠিসোটা হাতে ডিডিএনের কার্যালয়ের সিড়ি বেয়ে দোতলায় ওঠে।
তাদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ, মুখে ছিল মাস্ক পরা। প্রতিষ্ঠানটিতে ঢুকেই প্রথমে কার্যালয়ের কাঁচের দরজা, তারপর কর্মীদের কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ অন্যান্য আসবাসপত্র ভাঙচুর করতে থাকে।
আকস্মিত এই হামলার ঘটনায় ভীত-সন্ত্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে যান। তারা বের হয়ে যাবার পরও হামলাকারীরা অফিসে ভাঙচুর ও লুটপাট অব্যাহত রাখে।
প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে চলা ওই হামলার সময় ডিডিএনের অন্যতম পরিচালক রিদোয়ানুল কবির অফিসের বাইরে ছিলেন। কর্মীদের কাছ থেকে হামলার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তিনি।
“আমি এসে দেখি, তারা পুরো অফিস তছনছ করে ফেলেছে। মোবাইল, ল্যাপটপসহ বেশকিছু মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। সেইসঙ্গে, নগদ ত্রিশ লাখও নিয়ে গেছে, যা মূলত কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য তুলে রেখেছিলাম,” বলেন মি. কবির।
সোমবারের ওই ঘটনায় সবমিলিয়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির এই পরিচালক।
ছবির উৎস, DDN
‘ওয়েট অ্যান্ড সি’
হামলার দু’দিন আগে ডিডিএনের আরেক পরিচালক আদিল বিন মামুনের কাছে বিদেশি একটি নাম্বার থেকে ফোন করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়।
“ফোন যিনি দিয়েছিলেন, তিনি নিজেকে ডেভিড ইমন নামে পরিচয় দেন। বলেন, ব্যবসা করতে হলে এককালীন দুই কোটি, এরপর প্রতিমাসে ১০ লাখ করে টাকা চাঁদা দিতে হবে,” বলছিলেন মি. কবির।
টেলিফোনে তাদের কথোপকথনের একটি অডিও ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
সেখানে চাঁদা দাবি করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আমাদের সম্পর্কে না জানলে বেশিদূর যাইতে হবে না, আপনি পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস করলেই হবে। দুই কোটি টাকা রেডি রাখিবেন, আর প্রতিমাসে দল লাখ করে দিবেন। তাহলে আপনি ব্যবসা কইরেন, না হলে কইরেন না।”
চাঁদার টাকা দেওয়ার জন্য দুইদিন সময়ও বেঁধে দেন তিনি। এর মধ্যে টাকা না দিলে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসার মতো তাদের ওপরেও হামলা করা হবে বলে হুমকি দেন মি. ইমন।
এ ঘটনার পরদিন বাংলাদেশি একটি নম্বর থেকে আরেক ব্যক্তি ফোন করে চাঁদার টাকা চান। সেসময় চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রোববার মধ্যরাতে আগের বিদেশি নম্বরটি থেকে একটি বার্তা পাঠানো হয়।
সেখানে লেখা ছিল- “ওয়েট অ্যান্ড সি” (অপেক্ষা করুন, দেখবেন)।
শুরুতে এই হুমকির প্রতি গুরুত্ব দেয়নি মালিকপক্ষ।
“এরকম হুমকি-ধামকি তো আমরা মাঝেমধ্যেই পাই। কিন্তু সেগুলোকে আগে পাত্তা দিই নাই। কিন্তু এবার যা ঘটলো, সেটা চিন্তাও করিনি,” বলেন ডিডিএনের পরিচালক।
ঘটনার পরদিন কর্মীদের কেউ কেউ অফিসটিতে আসলেও পুরোদমে কার্যক্রম শুরু হয়নি।
“আসলে সবার ভেতরে ভয় ঢুকে গেছে। এজন্য আমরা পুলিশের কাছে লোক চেয়েছি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু এখনও কাউকে পাহারায় পাঠানো হয়নি,” মঙ্গলবার দুপুরে বলেন মি. কবির।
ছবির উৎস, DDN
হামলার পেছনে কারা?
হামলার ঘটনার পর ডিডিএনের মালিকপক্ষ চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। সেখানে ডেভিড ইমন ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েক ডজন ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ ইতোমধ্যেই হামলার ঘটনার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ভিডিও দেখে বেশ কয়েক জনকে শনাক্ত করা হয়েছে জানিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তাদেরকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
“বিষয়টি নিয়ে ডিবিসহ পুলিশের মোট তিনটি টিম কাজ করছে। হামলাকারীদের ধরার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি,” বলেন চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূর হোসেন মামুন।
‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে যে ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেছেন, তার পুরো নাম ‘মোবারক হোসেন ইমন’ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা মি. ইমন পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক রয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
পুলিশের ভাষ্যমতে, মি. ইমন মূলত চট্টগ্রামের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান, যিনি ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত, তার হয়ে কাজ করেন।
“ছোট সাজ্জাদ জেলে যাওয়ার পর এই ইমন এবং রায়হান নামের আরেক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের পক্ষে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের নেতৃত্ব দিচ্ছে,” বলছিলেন সিএমপি’র এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
চট্টগ্রামে ‘ছোট সাজ্জাদ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত আসামির পুরো নাম সাজ্জাদ হোসেন।
একাধিক হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলায় অভিযুক্ত এই সন্ত্রাসীকে ২০২৫ সালের মার্চে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
কিন্তু ইমন ও রায়হানকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তারা দু’জন দেশে আছে কি-না, সেটাও নিশ্চিত নয় পুলিশ।
তবে ডিডিএনের পরিচালকের কাছে চাঁদা চাওয়ার জন্য সম্প্রতি মি. ইমন যে নাম্বার থেকে ফোন করেন, সেটি দুবাইয়ের বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
ছবির উৎস, DDN
‘বড় সাজ্জাদ’ কোথায়?
পুলিশ বলছে, চট্টগ্রামের এখন যত চাঁদাবাজি, খুন ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর বেশিরভাগের পেছনেই রয়েছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান বা ‘বড় সাজ্জাদ’।
নগরের চালিতাতলী এলাকার বাসিন্দা মি. খান দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পালিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হয়।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে অপরাধ জগতে নাম লেখানো এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে।
২০০০ সালের অক্টোবরে একে-৪৭ রাইফেলসহ তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে জামিনে বেরিয়ে ২০০৪ সালে দেশ ত্যাগ করেন।
এরপর থেকে বিদেশের মাটিতে বসেই চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের বড় একটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির তালিকাতেও মি. খানের নাম রয়েছে।
গত বছরের নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগে গুলির যে ঘটনা ঘটেছিল, সেটির পেছনেও মি. খান ছিলেন বলে তদন্তে জানতে পেরেছে পুলিশ।
গুলির ওই ঘটনায় সরোয়ার হোসেন নামে যে ব্যক্তি নিহত যান, তিনিও অতীতে মি. খান তথা বড় সাজ্জাদের পক্ষে কাজ করতেন বলে জানা যায়।
গত দুই দশকে তার নির্দেশে বাংলাদেশে খুন, চাঁদাবাজিসহ নানান অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ থাকলেও বড় সাজ্জাদ ঠিক কোন দেশে পালিয়ে আছেন, সেটি এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
তবে তার ও তার দলের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিএমপি’র কর্মকর্তারা।
“গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় হামলার ঘটনায় আমরা ইতোমধ্যেই বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছি। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। চলমান অভিযানের মাধ্যমে অন্য অপরাধীদেরও আইনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন চট্টগ্রামে মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাবিবুর রহমান।
