তপন মল্লিক চৌধুরী

সম্প্রতি দেশের খুচরা বাজারে পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের শাকসবজির দামে সাধারণ মানুষ ছ্যাঁকা খাচ্ছে। বিজেপি জমানায় এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রধান দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। বিজেপি সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং নীতির কারণে সাধারণ মানুষের গৃহস্থালি বাজেট বিপর্যস্ত। উৎসবের মরশুমে পেঁয়াজের দাম বাফার স্টক খালি থাকার কারণে রেকর্ড বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চাল, ডাল, রান্নার গ্যাস ও ভোজ্যতেলের আকাশছোঁয়া দাম মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলিকে চরম সংকটে ফেলেছে। সরকারি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি আংশিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামা এবং স্থানীয়ভাবে মজুতদার ও কালোবাজারিদের কারসাজির ফল।

– বিজ্ঞাপন –

Sticky Prices বা একমুখী প্রবণতা

উল্লেখ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম একবার বাড়লে তা আর সহজে কমে না। বরং এর বাস্তবতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সংসার খরচে বিরাট প্রভাব ফেলে। প্রশ্ন, কেন দাম কমা নিয়ে এই সমস্যা তৈরি হয়?

বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দাম নির্ধারিত হয় একটি প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম চড়া রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বা পরিবহণ খরচ বাড়ার অজুহাতে দাম বাড়ানো হলেও, খরচ কমলে তার সুফল ক্রেতারা পান না। প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতির কারণে ব্যবসায়ীরা পুরনো চড়া দামেই পণ্য বিক্রি করেন।

অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা সরবরাহ কমিয়ে দাম ধরে রাখা হয়। চাল, ডাল, আটা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলির দাম স্থিতিশীল রাখতে কঠোর প্রশাসনিক তদারকি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি

চাল, ডাল বা তেলের মতো খাদ্যদ্রব্যগুলি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। দাম বাড়লেও মানুষ খাওয়া কমাতে পারে না। চাহিদা সবসময় একই রকম থাকায় ব্যবসায়ীরা দাম কমানোর কোনও তাগিদ অনুভব করেন না।

বিজ্ঞাপন

মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাবে কারখানা থেকে পণ্য সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছতে অনেক হাতবদল হয়। মাঝখানে থাকা দালাল, ফড়েরা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলি নিজেদের মুনাফা ঠিক রাখতে দাম কমায় না। বরং তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম উঁচুতে ধরে রাখে।

আইন প্রয়োগের দুর্বলতা

কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার, বীজ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি দিন দিন বাড়ছে। লরি বা ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য পরিবহণের খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়ে। এসব খরচ একবার বাড়লে তা আর কমে না। তাই পণ্যের দামেও তার প্রভাব থেকে যায়।

আমাদের দেশে ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম বাড়ানো হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আমদানিকারকরা পুরনো বেশি দামের অজুহাত দেখিয়ে বা ডলারের দামের তারতম্যের কথা বলে দেশের বাজারে দাম কমাতে চান না।

প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মজুতযোগ্য পণ্যের দাম বাড়লে কমে না

চাল, ডাল, আটা, চিনি এবং ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মজুতযোগ্য পণ্য হওয়ায় দাম একবার বাড়লে তা সাধারণত আর কমে না। অন্যদিকে আলু ও পেঁয়াজ পচনশীল এবং মৌসুমি ফসল হওয়ায় নতুন ফলন বাজারে আসার পর এর দাম কমে যায়।

চাল, ডাল, আটা, চিনি ও তেল সহজে নষ্ট হয় না। ব্যবসায়ীরা এগুলি দীর্ঘদিন গুদামজাত বা মজুত করে রাখতে পারেন। বড় বড় মিল মালিক এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি এই বাজারের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম চড়া রাখে।

একবার জ্বালানি তেল, সার বা প্যাকেজিংয়ের খরচ বাড়লে উৎপাদকরা সেই অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। খরচ পরে কিছুটা কমলেও পণ্যের দাম আর কমানো হয় না।

প্রতিশ্রুতির পাহাড়, বাস্তবে দুর্ভোগের সাগর

অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর চরম আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য দায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের অভাব।

বিজেপি সরকার যে সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থ, তার প্রমাণ তারা নিজেরাই। মানুষের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কেড়ে নিয়ে এই সরকার দেশবাসীকে প্রতিদিন সংকটের গভীরতর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।

বিজেপি শাসনের নির্মম চিত্র হল—প্রতিশ্রুতির পাহাড়, বাস্তবে দুর্ভোগের সাগর।

মানুষের প্রশ্নের জবাব নেই, সমস্যার সমাধান নেই; আছে শুধু প্রচার, বিভাজন আর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার রাজনীতি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *