মোবাইলের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে যৌন সম্পর্কে ভাঁটা পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই যে যার মোবাইলে মুখে গুঁজে থাকে। ফলে পরস্পরের সঙ্গে সময় কাটানোর উৎসাহই নেই। যৌন সম্পর্কে ইতি। পরিসংখ্যানও বলছে তা-ই। জানা যাচ্ছে, যেখানে আইফোনের যত ব্যবহার ততই সেখানে জন্ম হার কম!
শুনতে আজগুবি লাগলেও পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৭ সালের পর থেকে দেখা গিয়েছে, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত প্রান্তেই জন্মহার একই গতিতে থিতিয়ে পড়ছে। আর দুটি চাঞ্চল্যকর গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই ঘটনার নেপথ্যে হাতের ওই আইফোন! গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন যেন অজান্তেই এক মস্ত বড় ‘বার্থ কন্ট্রোল ডিভাইস’ হয়ে উঠেছে। আমেরিকার ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনমিক রিসার্চ’-এর প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, ১৯৮০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় সাধারণ জন্মহার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। প্রতি ১,০০০ জন মহিলায় জন্ম হত ৬৫ থেকে ৭০টি শিশুর। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকেই এই হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৪-তোত তে! অর্থাৎ, মাত্র ১৭ বছরে জন্মহার কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। পাশাপাশি ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আমেরিকায় আইফোন একচেটিয়াভাবে কেবল মাত্র ‘AT&T’ মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই পাওয়া যেত। ফেল এটা স্পষ্ট আমেরিকার কোনও এলাকায় আইফোনের চল কতটা থাকবে, তা নির্ভর করত সেখানে AT&T-র ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কে উপর। পরিসংখ্যান বলছে যে কাউন্টিতে AT&T-র কোনও কভারেজ ছিল না, সেখানে কিশোরীদের মা হওয়ার হার কমেছে ১৩.৮ শতাংশ। যেখানে আংশিক কভারেজ ছিল, সেখানে কমেছে ১৮.৯ শতাংশ। আর যেখানে নেটওয়ার্ক ছিল সবচেয়ে জোরালো, সেখানে কিশোরীদের সন্তান প্রসবের হার এক ধাক্কায় ২৬ শতাংশ কমে গেছে!
আরও পড়ুন:
তাহলে আইফোনের দোষটা কোথায়! আসলে বিষয়টা মানসিক। আইফোন এবং অন্যান্য আধুনিক স্মার্টফোন যত জনপ্রিয় হয়েছে, মানুষ বাস্তব জগতে বন্ধুদের সঙ্গে সশরীরে সময় কাটানো তত কমিয়ে দিয়েছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শারীরিক বা যৌন মিলনের প্রবণতা অনেকটাই কমে গিয়েছে। বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বেশি উৎসাহ মানুষের। গবেষণায় পর্নোগ্রাফির অতিরিক্ত ব্যবহারকে যৌন মিলনের ‘বিকল্প’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেখা গেছে, এই গবেষণা চলাকালীন গুগলে ‘পর্ন’ লিখে সার্চের প্রবণতা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে’ অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সিদের মধ্যে গত এক বছরে নীল ছবি বা প্রাপ্তবয়স্ক সিনেমা দেখার হার প্রতিটা বয়সভিত্তিক গ্রুপেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইফোনের সৌজন্যে তরুণ প্রজন্মের কাছে গর্ভধারণ এড়ানোর নানা উপায়, যেমন গর্ভনিরোধক ওষুধ বা গর্ভপাত সংক্রান্ত তথ্য অনেক সহজে পৌঁছে গেছে। ফলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ রুখে দেওয়া সহজ হয়েছে।
একই লাইনে দাঁড়িয়ে ‘ইউনিভার্সিটি অফ সিনসিনাটি’-র অর্থনীতিবিদরা বিশ্বব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে বিশ্বের ১২৮টি দেশের স্মার্টফোন ব্যবহার এবং কিশোরীদের জন্মহারের ওপর একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। সেখানে দেখা গেছে, যেসব দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সরকারি কল্যাণমূলক নীতি, গর্ভপাত আইন, ধর্মীয় ঐতিহ্য, আর্থিক মন্দা বা জনসংখ্যার ট্রেন্ড সম্পূর্ণ আলাদা-তারাও ঠিক একই সময়ে এসে এই একই ধরনের জন্মহার হ্রাসের মুখোমুখি হয়েছে।
২০০৩ সালে মানুষ দিনে গড়ে যেখানে ৬৮ মিনিট বন্ধুদের সঙ্গে সামনাসামনি আড্ডা বা যোগাযোগে কাটাত, ২০১৯ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮ মিনিটে, অর্থাৎ বাস্তব সামাজিকতায় প্রায় ৪৪ শতাংশ পতন! উল্টোদিকে, কম্পিউটারের পর্দায় মানুষের কাটানো সময় দিনে ২২ মিনিট থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৬ মিনিট, যা প্রায় ৩৩৬ শতাংশের এক অবিশ্বাস্য লাফ! ফলে তার সম্পূর্ণ প্রভাব পড়ছে জন্মহারে! এবার কি রাতে AT&T-র কভারেজ বন্ধ রেখে জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে! দেবা ন জানন্তি।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
