কলকাতা হাইকোর্টImage Credit: Bhaswaran BhattacharyaUniversal Images Group via Getty Images

কলকাতা: ধরনায় বসা মানেই তাঁরা দখলদার হয়ে যায় না। তাঁরা সরকারি জমিতে বেআইনিভাবে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ উঠলেও, প্রশাসন ইচ্ছেমতো তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিতে বা জোর করে সরিয়ে দিতে পারে না। বুলডোজার আনা যায় না।জমি থেকে কাউকে উচ্ছেদ করতে হলে অবশ্যই আইনি পদ্ধতি মেনে চলতে হবে। ভুটান-জয়গাঁ সীমান্তে একটি স্থলবন্দর নির্মাণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চের।

অভিযোগ, প্রস্তাবিত স্থলবন্দর নির্মাণের জন্য চলছিল বস্তি উচ্ছেদ। চা মজদুর সংগঠনের দাবি, পুজোর মধ্যে সেখানে চলে বুলডোজার। এরপর মামলার জলগড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। সংগঠনের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য।

শুনানিতে রাজ্য সরকারের তরফে উচ্ছেদের পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করা হয়। সরকারের দাবি, প্রকল্পের কাজে বাধা দিচ্ছেন জমিতে থাকা লোকজন। তাঁরা বিক্ষোভ দেখিয়ে কাজ বন্ধ করে রাখছেন। কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ধীরজ ত্রিবেদী জানান, স্থলবন্দর কৃর্তৃপক্ষ প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ করে এই প্রকল্পের কাজ করছেন। রাজ্যের সরকার জমি দিয়েছে। সেই জমি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ওইখানে চা বাগান ছিল। শ্রমিকরা কাজ করতেন। সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাউকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে না। বরং কাজে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে শ্রমিকদের তরফে। এই ঘটনায় পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এফআইআর দায়ের করেছে। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, রাজ্যের জমা দেওয়া রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে যে ওই ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট জমিতে বসবাস করছেন। তাঁরা যদি বেআইনিভাবেও জমি দখল করে থাকেন, তাহলেও আইন মেনে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। প্রশাসন চাইলেই তাঁদের সরিয়ে দিতে পারে না।

শুনানির সময় বিক্ষোভস্থলে বুলডোজার ব্যবহারের প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতির প্রশ্ন, “ধরনায় বসা মানুষদের সরানোর জন্য বুলডোজার নিয়ে যাওয়া যায় কি?” রাজ্যের তরফে আদালতের এই মন্তব্যকে ‘আকর্ষণীয় শব্দের ব্যবহার’ বলে ব্যাখ্যা হয়। বিচারপতি পাল্টা জানান, “আকর্ষণীয় ছবিও রয়েছে।”

আদালত আরও স্পষ্ট করে দেয়, সরকারি প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রশাসন আইনকে উপেক্ষা করতে পারে। বিচারপতির মন্তব্য, “আমরা এই প্রোজেক্ট বন্ধ করছি না, তবে জনসাধারণের জন্য এই প্রোজেক্ট হলেও আইন মেনেই চলতে হবে।”

আদালতের কথায়, যাঁরা প্রাসাদে থাকেন এবং যাঁরা ঝুপড়িতে বসবাস করেন, আইনের চোখে সকলেই সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। বরং আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের ক্ষেত্রে আদালতের সুরক্ষার প্রয়োজন আরও বেশি। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, সমাজের সব মানুষ সমান জীবনাযাপনের সুযোগ পাননি। কেউ জন্ম থেকেই সুযোগ-সুবিধা পান, আবার কাউকে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেও লড়াই করতে হয়। যারা মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছেন,আর যাঁদের জীবনের নূন্যতম প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে, তাঁদের পথচলা একই জায়গা থেকে শুরু হয়েছে বলে ধরা যায় না। সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করা আদালতের দায়িত্ব।

আদালত জানিয়েছে, আইন মেনে প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যেতে পারবে প্রশাসন। কিন্তু সেই কাজের জন্য কোনও বাড়ি বা কাঠামো ভাঙতে হলে কিংবা কাউকে জমি থেকে সরাতে হলে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি, এই মামলার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুলিশের দায়ের করা এফআইআরের কোনও সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করেছে আদালত। ওই মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিজস্ব পথে চলবে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *