নেদারল্যান্ডস সফরে গিয়ে দেশের ঐতিহাসিক আফসলাউইটডাইক (Afsluitdijk) বাঁধ পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন। এই সফর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ জল ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু মোকাবিলার পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের এই বিশাল বাঁধ দীর্ঘদিন ধরে বন্যা প্রতিরোধ, মিষ্টি জলের সংরক্ষণ, জলপথ পরিচালনা এবং নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, গুজরাটের বহুদিনের প্রস্তাবিত ‘কালপসার প্রকল্প’-এর সঙ্গে এই ডাচ প্রকল্পের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
মোদী বলেন,
“জল ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডস পথপ্রদর্শক কাজ করেছে। গোটা বিশ্ব এখান থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তিকে ভারতে আনার বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা সেচ, বন্যা প্রতিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ জলপথ উন্নয়নে সাহায্য করবে।”
কী এই Afsluitdijk বাঁধ?
প্রায় ৮০ বছর আগে তৈরি হওয়া ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধ উত্তর সাগর থেকে নেদারল্যান্ডসের বিস্তীর্ণ নিচুভূমিকে রক্ষা করে। এটি উত্তর সাগর এবং IJsselmeer হ্রদকে আলাদা করেছে। বর্তমানে ‘Afsluitdijk 2.0’ নামে এই বাঁধকে আরও আধুনিক করা হচ্ছে, যাতে ১০ হাজার বছরে একবার আসা ভয়াবহ ঝড়ও মোকাবিলা করা যায়।
নতুন পরিকল্পনায় রয়েছে উন্নত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা, শক্তিশালী লক গেট, মাছ চলাচলের বিশেষ করিডর, সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার এবং জোয়ারভাটার শক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি। এই আধুনিকীকরণে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ইউরো খরচ হতে পারে বলে অনুমান।
কেন আগ্রহী ভারত?
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভারতে একদিকে যেমন জলসংকট বাড়ছে, অন্যদিকে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগও বাড়ছে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী ও খরাপ্রবণ রাজ্যগুলিতে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে গুজরাটের কালপসার প্রকল্পকে বহু সমস্যার একসঙ্গে সমাধানের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কালপসার প্রকল্পে গুজরাটের খাম্ভাত উপসাগরের উপর প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করে বিশাল মিষ্টি জলের ভাণ্ডার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নর্মদা, মাহি, সাবরমতী ও ধাধর নদীর জল সেখানে সংরক্ষণ করা হবে। সেই জল সেচ, পানীয় জল এবং শিল্পে ব্যবহার করা হবে।
এই প্রকল্পে বাঁধের উপর ১০ লেনের রাস্তা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যার ফলে সৌরাষ্ট্র ও দক্ষিণ গুজরাটের মধ্যে যাতায়াতের দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারের বেশি কমে যেতে পারে।
বহুদিনের স্বপ্ন ‘কালপসার’
১৯৭০-এর দশক থেকেই গুজরাটে কালপসার প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমানে প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ ধরা হচ্ছে প্রায় ৮৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্ত ছাড়পত্র মিললে শুধু নির্মাণ কাজ শেষ করতেই ১২ থেকে ১৫ বছর সময় লাগতে পারে।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে পরিবেশগত ও সামুদ্রিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। মাছের বাস্তুতন্ত্র, পলি জমা, নৌপথ এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে এখনও একাধিক সমীক্ষা চলছে। এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত পরিবেশ ছাড়পত্রও মেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা ভারতকে ভবিষ্যতের জলবায়ু মোকাবিলা ও জল নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখাতে পারে।
