চলতি বছর সারা বিশ্ব অশান্ত হয়ে আছে যুদ্ধের দামামায়। বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ যুদ্ধরত। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট নামের একটি সংস্থা বলছে, বিশ্বে প্রতিদিন এমন অনেক প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের জন্ম হয়েছে যুদ্ধের ময়দানে।

আচ্ছা, পৃথিবীতে সবচেয়ে যুদ্ধবাজ দেশ এই মুহূর্তে কোন দেশ, জানেন?

আজকের বিশ্বে যখনই কোনো যুদ্ধ এবং সামরিক হস্তক্ষেপের কথা আসে, তখনই একটি দেশের নাম সর্বদা শীর্ষে উঠে আসে। তা হলো- আমেরিকা। যে দেশটি তার ২৪৮ বছরের ইতিহাসে ২৩২ বছরই যুদ্ধে কাটিয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকানরা তাদের ইতিহাসের শতকরা মাত্র ৬ ভাগ সময় যুদ্ধ ছাড়া কাটিয়েছেন। সম্প্রতি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনালাপে বলেছেন, ‘আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে যুদ্ধপ্রেমী দেশ’। তবে আমেরিকার কাতারে যুদ্ধবাজ হিসেবে আরেক নাম ইসরায়েল।

কিন্তু ইসরায়েল আমেরিকা কেন এত যুদ্ধ করে?

অর্থনৈতিক গবেষণা যা বলছে, তা হলো, আমেরিকা ‘নিরাপত্তা’র জন্য নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং অস্ত্র বিক্রির লক্ষ্যে যুদ্ধ বিস্তারের চেষ্টা করে। আমেরিকার অর্থনীতির বড় শেল্টার তাদের অস্ত্র নির্মাণ শিল্প। কেবল ২০২৩ সালেই এই দেশটির অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বিশ্বে যত অস্ত্র বিক্রি হয়, তার ৫১ শতাংশই আমেরিকার কোম্পানিগুলো বিক্রি করে থাকে। সম্পদ, ভূ-রাজনৈতিক এলাকা এবং করিডোরের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার যুদ্ধের আরেকটি প্রেরণা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে দিয়ে ইরানে হামলার অন্যতম প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। এই সংঘাত পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং এতে ইরানের বিলিয়ন ডলার আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতি দাবি করা হয়েছে। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত করছে।

ইরানের পর তুরস্ক কি হতে যাচ্ছে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী নিশানা?

ফিলিস্তিনের গাজা, লেবানন, ইরান, ইয়েমেনে ধারাবাহিকভাবে হামলা এবং সম্প্রতি কাতারে ইসরাইলের বিমান হামলার পর তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় উদ্বেগ বাড়ছে। তেলআবিবের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এখন তুরস্কও রয়েছে সতর্ক অবস্থানে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মিত্র কাতারে বিমান হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইলি বিশ্লেষকদের দৃষ্টি ঘুরে যায় তুরস্কের দিকে। এ নিয়ে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল রুবিন এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, তুরস্ক হতে পারে দখলদার ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য, ন্যাটো সদস্যপদও তুরস্ককে রক্ষা করতে পারবে না।

সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ইরানের পর তুরস্ককে নতুন প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে ইসরায়েল, কারণ শত্রু ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারে না।’

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, বিশ্ব হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন নৌচলাচল চায়, এবং তুরস্কও শান্তিপূর্ণ উপায়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার পক্ষে, তবে এক্ষেত্রে সশস্ত্র আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে বলে মনে করছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা তুরস্কের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে, সে বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ইরান যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল সিরিয়ায় কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকছে, তবে শিগগিরই তারা বড় পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা এখন তুরস্কের। সুতরাং ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তির অধীনে একে অপরের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার জন্য এ বিষয়ে এখনই পদক্ষেপ নিতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফিদান।

এর জবাবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের একজন উপদেষ্টা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইসরাইল যদি তুরস্কের ওপর হামলার চিন্তা করে, তাহলে দেশটির জন্য ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করছে।

বিগত কয়েক মাস ধরেই ইসরাইলি মিডিয়াগুলো তুরস্ককে ‘ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করে আসছে। বিশেষ করে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের উপস্থিতি ও যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ায় দেশটির পুনর্গঠনে ভূমিকার বিষয়গুলোকে ইসরাইলি বিশ্লেষকরা ‘নতুন হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

এদিকে গাজায় চলমান হামলা এবং আঞ্চলিক আগ্রাসনের মধ্যেই তুরস্ক গত আগস্টে ইসরাইলের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে এরই মধ্যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের নন-রেসিডেন্ট ফেলো ওমর ওজকিজিলসিক কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইসরাইল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন রয়েছে। আঙ্কারায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইসরাইল আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে বদ্ধপরিকর। কাতারে হামলার পর তুরস্কের মধ্যে আরেকটি শঙ্কা জন্মেছে, তা হলো ন্যাটো জোটের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর? কারণ, কাতার ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ হলেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এ নিয়ে ওজকিজিলসিক আরও বলছেন, তুরস্ক বহু আগেই বুঝে গেছে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর ওপর নির্ভর করা যাবে না।

এদিকে গ্রেটার ইসরাইলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ইসরাইলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সম্প্রতি আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে মন্তব্য করেছেন তিনি।

গ্রেটার ইসরাইলের লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলের দেশগুলোকে দুর্বল, অকার্যকর এবং বিভক্ত করে রাখা—আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।

ইসরাইল শুধু গাজা বা পশ্চিম তীরেই নয়, সিরিয়া, ইয়েমেন, এমনকি তিউনিসিয়ায় গাজায় পাঠানো সাহায্য বহরে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের ওপর সামরিক হামলায় প্রবলভাবে অংশ নিয়েছে।

তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ‘গ্রেটার ইসরাইল’ ধারণা, কাতারে ইসরাইলি হামলা, সিরিয়ায় আঞ্চলিক কর্তৃত্বের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে আঙ্কারার চোখে এখন ইসরাইল একটি আগ্রাসী ও একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত শক্তি। অন্যদিকে তুরস্কও তার সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে এই আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *