২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান বাংলাদেশি জনগণের সামনে নানাবিধ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে বিশাল চ্যালেঞ্জের পাহাড়। এর আগে যেসব মধ্যবর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তাদের এখনকার মতো কিছু বিষয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তো বলতে গেলে ভিসা প্রদান বন্ধই রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভারতে ও থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিতে এবং ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন। সেই সুযোগ এখন কমে গেছে। আরও একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই তাহলো এই সরকারের কাছে সব পেশা, শ্রেণি ও ধর্মের মানুষের নানাবিধ চাওয়া। কখনো কখনো এই চাওয়া রীতিমতো হুমকিতে পরিণত হয়েছে। দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান যা কিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় দুটি সূচক, তা যেন প্রায় থমকে গেছে। এক হিসেবে দেখানো হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত অন্তত প্রায় ২০ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। ফলে বেকার ও দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নানা কর্মযজ্ঞ চলে। মানুষজন নিজের প্রয়োজনে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হন, আর তাতেই দেশ এগিয়ে যায়। শুধু দরকার হয় ভালো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর কিছুটা উদার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এ দুটো অনুমিত শর্ত এখন যেন শতভাগ কাজ করছে না। বর্তমানে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজারের মতো। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে যারা সরকার গঠন করবেন, তাদের অনেক বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। নানাভাবে বিভক্ত এই জাতির জন্য যে ‘মিটমাট’ বা সমঝোতা দরকার, তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে উদ্ভূত পরিস্থিতি আমাদের জানাচ্ছে। কিছু সময়ের জন্য ইউরোপের ইতিহাসে ফিরে যাই। 

আজ থেকে আড়াইশ বছরেরও বেশি আগে (১৭৬২), বেশ কয়েকজন ফরাসি দার্শনিক একটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, যা ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরি’ বা ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ হিসেবে বেশি পরিচিত। এর মূল কথা হলো সার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মাণে জনগণ রাষ্ট্রকে সব ক্ষমতা অর্পণ করে এবং তার বিনিময়ে তারা কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা করে। ফরাসি দার্শনিক  জ্যাঁ জ্যাক রুশো এর মূল প্রবক্তা হলেও আরও কয়েকজন দার্শনিক এই তত্ত্বের খুব কাছাকাছি কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও এর মূল বিষয়গুলো এখনো প্রযোজ্য। যেমন : সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী, জনগণের প্রত্যাশা হলো : নিরাপত্তা ও শান্তি : টমাস হবস-এর মতে, প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষের জীবন ছিল ‘একাকী, দরিদ্র, পাশবিক, হিংস্র ও সংক্ষিপ্ত’। রাষ্ট্র গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দেওয়া। জনগণ আশা করে রাষ্ট্র তাদের পারস্পরিক সংঘাত, হিংসা ও অরাজকতা থেকে রক্ষা করবে। আড়াইশ বছর পরও এই চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারিনি আমরা। রুশোর অন্যান্য আকাক্সক্ষা হলো, জনমানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করা। রুশো বলেছেন, মানুষ রাষ্ট্রের কাছে সার্বভৌমত্ব অর্পণ করে সম্মিলিত ইচ্ছার মাধ্যমে, কিন্তু এর বিনিময়ে তারা নাগরিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার চায়। প্রাকৃতিক অবস্থায় সবাই নিজের হাতে বিচার করত, যার ফলে অরাজকতার সৃষ্টি হতো। রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা অর্পণের বিনিময়ে জনগণ চায়, নির্দলীয় ও ন্যায়সঙ্গত আইন ব্যবস্থা। রুশোর মতে, সাধারণ ইচ্ছা সমাজের সব সদস্যের কল্যাণ নিশ্চিত করবে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ নয়। রাষ্ট্র শুধু নিরাপত্তাই দেবে না, বরং সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি নৈতিক সমাজ গড়ে তুলবে, যেখানে সব নাগরিক অংশীদার হবে। ফরাসি এই দার্শনিকের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র হলো একটি নৈতিক সত্তা, যা জনগণের সম্মিলিত সার্বভৌমত্ব প্রকাশ করে এবং ‘সাধারণ ইচ্ছা’ অনুসারে পরিচালিত হয়। এই সামাজিক চুক্তির মধ্যেই অন্তর্নিহিত রয়েছে জনমানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি।

স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দুঃশাসনে আমরা দেখেছি, তারা শুধু জনগণের অধিকার হরণ করেছে। জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে ক্ষান্ত হয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। ওই ১৫ বছরে চলেছিল নিরন্তর গুম, খুন, অত্যাচার এবং লাগামহীন দুর্নীতি। এর ফলে, এই নেপোটিজম আর তোষণবাদের কারণে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত জীবনযাপন করেছে, নানা প্রকল্পের গুণগতমান কমে গেছে। কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্য মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, ব্যাংক লুটের কারণে চতুর্মুখী সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আগামী সরকারকে বহু ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে। যেহেতু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে পারছে না, তাই দক্ষিণপন্থি একটি দলের সঙ্গে ভিন্ন দলের লড়াই হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। মানুষজন চায়ের আড্ডা, ঘরোয়া আলোচনায় তাদের নানাবিধ সংশয় প্রকাশ করে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে নিম্নমুখী, সেই বিষয়টি মিডিয়াতে একাধিকবার উঠে এসেছে। একটি কম-বলা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। সেটি হলো আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া। এ রকম পরিস্থিতিতে চোরাগুপ্তা হামলা, রাহাজানি কোন দিক থেকে আসবে তা বলা বেশ মুশকিল। আমাদের মনে আছে, আওয়ামী লীগ সরকার যখন জামায়াতে ইসলামীর মতো সুসংহত একটি দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পরিকল্পনা করছিল, তার অব্যবহিত পরেই ছাত্রশিবিরের নেতারা ছাত্রলীগে ‘অনুপ্রবেশ’ শুরু করে। অনেকে বলেন, এটি ঘটেছিল তৎকালীন হাই কমান্ডের ইশারায়। অনেকের মনে থাকতে পারে, আওয়ামী শাসন উৎপাটনের আগ দিয়ে বহু দাগী আসামিকে কৌশলে জেল থেকে বের করে দেওয়া হয়। কেউ কেউ মনে করেন, তাদের একটি শর্ত দিয়েই কাজটি করা হয়েছে। আর সেটি হলো, দেশে কোনো কারণে আওয়ামী লীগের সরকার না থাকলে এখানে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা। সেটিই এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া খুন একটি প্যাটার্ন ধরে করা হচ্ছে। এগুলো পিস্তল/রিভলবার দিয়ে করা হচ্ছে। গুলি করা হচ্ছে, পয়েন্ট ব্লাঙ্ক অবস্থান থেকে। যাদের টার্গেট করা হচ্ছে, তাদের ফেসভ্যালু আছে। অর্থাৎ তারা আমজনতা নন। তাদের হত্যা করলে, সমাজে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি উত্থাপিত হবে। তাই মানুষের চাওয়া আগামী সরকারের কাছে অনেক বেশি। তারা চাইবে, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা, আর্থিক নিশ্চয়তা, বেকার সমস্যার সমাধান, মব জাস্টিসের পরিবর্তে প্রকৃত জাস্টিস, কথা বলা ও চলাফেরার স্বাধীনতা, চাঁদাবাজির অবসান, স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার ক্ষমতা ইত্যাদি। আওয়ামী লীগের ম্যান্ডেটবিহীন শাসনের সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও যূথবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলোর বিনির্মাণ সময়সাপেক্ষ এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয়। যারা কর দেয়নি, অথচ রাষ্ট্রীয় নানা সুবিধা লজ্জাহীনভাবে ভোগ করেছে, তাদের কাছ থেকে কর আদায় কি সহজ বিষয় হবে? আমরা এখনো দেখতে ও শুনতে পাচ্ছি চাঁদাবাজ বন্ধ হয়নি, ব্যবসা করতে গেলে নানামুখী সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ব্যবসা বিকশিত হবে কীভাবে? অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার গুরুত্ব অনেক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাদের ৩১ দফা মেনিফেস্টোতে অনেক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়, স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞার কথা বলেছে। একটি আধুনিক, সম্মুখমুখী রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছানোর বিকল্প নেই। এই বিষয়টি নতুন সরকারে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। 

বিএনপির ৩১ দফার কয়েকটি চুম্বক অংশ : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বলছে, আওয়ামী লীগের স্বৈরশাসনের সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছে। তারা সেই জায়গায় কাজ করতে চায়। দুই নম্বর দফায় তারা বলছে : বিএনপি একটি রংধনু বা রেইনবো (বৈচিত্র্যময়) রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়। “প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক ‘Rainbow Nation’ প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এজন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে (Social Contract) পৌঁছাইতে হইবে। এজন্য একটি ‘National Reconciliation Commission’ গঠন করা হইবে।” যে বিষয় নিয়ে বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় চিন্তিত, তাদের নিরাপত্তা ও জমি-জিরাতের অধিকার সে বিষয়ে ১৬ নম্বর দফায় বলা হচ্ছে : ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এই মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করিবেন। দল-মত ও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ি ও সমতলের ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব জাতিগোষ্ঠীর সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্ম-কর্মের অধিকার, নাগরিক অধিকার এবং জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং তাদের সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ না দিয়েই হাজার হাজার কোটি টাকার নানারকম চার্জ-ফি ইত্যাদির মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়েছে। এটি করা হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের যোগসাজশে। এ বিষয়ে ১৮ নম্বর দফায় বলা হয়েছে :  ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল করা হইবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ রোধ করিবার লক্ষ্যে জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি হইতে বিদ্যুৎ ক্রয়ে চলমান সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করা হইবে। আমদানি নির্ভরতা পরিহার করিয়া নবায়নযোগ্য ও মিশ্র এনার্জি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং উপেক্ষিত গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও আহরণে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। শিল্প খাতের বিকাশে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করিয়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হইবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে উৎসাহ, সুযোগ ও প্রণোদনা দেওয়া হইবে। পরিকল্পিতভাবে দেশব্যাপী সমন্বিত শিল্প অবকাঠামো গড়িয়া তোলা হইবে।’ পরিশেষে বলা যেতে পারে, দেশে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দেশের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যা দুর্বল করা হয়েছে, সেগুলোকে শক্তিশালী করলেই বাংলাদেশ নতুন প্রাণ ফিরে পাবে। আমরা আশা করি এটি সম্ভব।

লেখকঃ ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

[email protected] 





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *