একটি স্বপ্ন আর একটি আশ্বাস ছিল ঘর পাবেন গৃহহীনরা। বদলে যাবে জীবনের স্বপ্ন। গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার থেকে মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাস্তবায়িত হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। এরই অংশ হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভূমিহীনদের দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৫০০ ঘর।
এর মধ্যে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালীতে নির্মিত হয় ৬০টি ও মিনাবাজারে দেওয়া হয় ৭২টি সেমিপাকা ঘর। উদ্দেশ্য ছিল গৃহহীনদের পুনর্বাসন করা। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বসবাস করার কথা ছিল নিরাপদে, সেখানে এখন রাজত্ব চলছে মাদকসেবী ও স্থানীয় অপরাধীদের। তাদের ভয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের কেউ ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, আবার কেউ বিক্রি করে দিচ্ছেন পানির দামে। এরই মধ্যে শতাধিক ঘর বিক্রি হয়ে গেছে। তবে বিক্রি করার কোনো নিয়ম না থাকলেও অল্প দামে মৌখিক বা স্ট্যাম্পভিত্তিক চুক্তিতে বিক্রি হচ্ছে ঘর। এ সুযোগে ঘরগুলো কিনে নিচ্ছেন মাদক করবারিসহ অপরাধীরা। যেন আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এখন মাদক কারবারি ও বিভিন্ন অপরাধীর আস্তানায় পরিণত হচ্ছে।
খারাংখালি আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। উপকারভোগী অনেকেই ঘর তালাবদ্ধ করে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন নিরাপত্তার অভাবে। যে ঘরগুলোতে এখনো মানুষ থাকে, সেখানকার বাসিন্দারা রাত হলেই থাকেন আতঙ্কে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী উপকারভোগী জানান, রাতে অপরিচিত লোকজন ঘোরাঘুরি করে। যুবতী মেয়েদের ঘরে বেশিরভাগ হয়রানি করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় সন্ধ্যার পরপরই মাদকসেবীদের জমায়েত শুরু হয়। কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা বা প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় এলাকাটি মাদক কারবারি ও অপহরণকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। আশপাশে গভীর পাহাড়, নির্জন এলাকা সব মিলিয়ে এ জায়গাটি অপরাধীদের জন্য আদর্শ বেইজ ক্যাম্প হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, পেছনের রাস্তা দিয়ে মাদক লেনদেন চলে নিয়মিত। পুলিশ আসে না। ভয়ে কেউ মুখও খুলে না। একটা বিশাল এলাকার কোথাও আলোর ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো গার্ড, পুলিশি টহল। এ জন্যই এটা নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধীরা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আলম বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত রয়েছি। আগেও প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে অপারেশন চালানো হয়, কিন্তু অপরাধ কমেনি। প্রকল্প এলাকায় লাইটের সংযোগ থাকলে অপরাধ হয়তো অনেকটা কমে আসত।’
এদিকে মিনাবাজার আশ্রয় প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও ঘর বিক্রি করে চলে যাচ্ছেন উপকারভোগীরা। ইতিমধ্যে অর্ধশত ঘর বিক্রি হয়ে গেছে। যারা ঘরগুলো কিনে নিয়েছে তারাও মাদক কারবারি ও অপহরণকারীদের সহযোগী বলে জানা গেছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাত হলেই আশ্রয়কেন্দ্র্রের বাসিন্দাদের ভয় দেখানোর জন্য ডাকাতির নাটক সাজিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। এমনি একজন মাদক কারবারির নাম হেলাল উদ্দীন। সে মিনাবাজার আশ্রয়কেন্দ্রে দুটি ঘর কিনে নিয়েছে। রাত হলেই ডাকাত আসছে বলে চিৎকার করে। টিনের চালে ঢিল মেরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সারা রাত ভয়ে মানুষ আর ঘুমাতে পারে না। এভাবেই আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে আশ্রয়কেন্দ্রের উপকারভোগী বাসিন্দারা।
মিনাবাজার আশ্রয়কেন্দ্রর বাসিন্দা নুর আলী বলেন, ‘এখানে যারা টাকার বিনিময়ে ঘর কিনে নিয়েছেন তাদের অনেকেই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। যতদিন এসব অবৈধ বাসিন্দাকে বের করা না হবে ততদিন উপভোগীরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না। আমরা এখন খুব আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। এ ব্যাপারে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’
স্থানীয় হোয়াইক্যং ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনের উচিত ওইসব এলাকা থেকে অবৈধ বাসিন্দাদের বের করে দেওয়া। এলাকায় পর্যাপ্ত লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা। একইসঙ্গে দ্রুত ওই এলাকার অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবেই আশ্রয়কেন্দ্রের অসহায় বাসিন্দারা শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘এসব ঘর বিক্রির কোনো নিয়ম নেই। কেউ এ ধরনের কাজ করে থাকলে তার বরাদ্দ বাতিল হবে। একইসঙ্গে যারা এটি কিনে নেবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
