২০১৮ সালে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক টালমাটাল হয়ে পড়ে। খাশোগি হত্যার ঘটনায় সন্দেহের আঙুল ছিল সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের দিকে। তবে ৭ বছর আগের সে ঘটনার রেশ যেমন কেটেছে, তেমনি পুরনো সেই তিক্ততা থেকে সরে এসে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নে নজর দিয়েছে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ। যার ফলে অর্ধ যুগেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সালমান। সফরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা জোরদারের চেষ্টা করবেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইবেন সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে এই মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন দুই নেতা।
তিন দিনব্যাপী এই সফর শুরু হবে আজ সোমবার থেকে। আগামীকাল মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে যুবরাজের। সৌদি শাসকদের সফর সাধারণত আগাম ঘোষণা করা হয় না। সফরকে ঘিরে ওয়াশিংটনে জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি বিনিয়োগ ফোরামও অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে সৌদি আরবের এখনই রাজি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র কাতারে ইসরায়েলি হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তারপর সৌদির প্রধান লক্ষ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের আজিজ আলগাশিয়ান লিখেছেন, এই সফরের লক্ষ্য তিনটি সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উন্নীত করা, সুসংহত ও সহজতর করা।
ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের সুসম্পর্ক বহু পুরনো। ২০১৭ সালে ট্রাম্পের রিয়াদ সফরে বিপুল বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ও রাজকীয় অভ্যর্থনায় তা আরও দৃঢ় হয়। সম্প্রতি মায়ামিতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হওয়া এক সভায় ট্রাম্প বলেন, আরও দেশ আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে এবং ‘খুব শিগগিরই’ সৌদি আরবও সেখানে যোগ দেবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে হামাসের ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে রিয়াদ এখন কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। সৌদির অবস্থান স্পষ্ট, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া আঞ্চলিক সংহতি সম্ভব নয়। বাহরাইনের মানামা ডায়ালগে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচক দলের প্রধান মানাল রাদওয়ান বলেন, এ বিষয়ে তাদের অবস্থান বহুবার জানানো হয়েছে, তবুও একই প্রশ্ন বারবার করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক ডেপুটি জোনাথন পানিকফ বলেছেন, এমবিএস নামে পরিচিত যুবরাজ ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা ছাড়া অদূর ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবেন না। বর্তমানে ওয়াশিংটনের চিন্তক প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলে থাকা পানিকফ বলেন, এমবিএস সম্ভবত ট্রাম্পের সঙ্গে তার প্রভাব ব্যবহার করে ‘সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আরও সুস্পষ্ট এবং জোরালো সমর্থন’ আদায় করতে চাইবেন।
সফরে যুবরাজ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবেন। কাতারের ক্ষেত্রে ট্রাম্প যে নির্বাহী আদেশে হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তা দিয়েছেন, উপসাগরের অন্যান্য দেশও এমন প্রতিশ্রুতি চাচ্ছে। উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াও সৌদি আরবের আগ্রহ রয়েছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতার চিপ সংগ্রহে। সৌদি আরব এখন তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন ও বিনোদন খাতে বড় প্রকল্প নিচ্ছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে তেহরানসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালু রেখেছে রিয়াদ। রাদওয়ান বলেন, ইরান ইস্যুতে সৌদি আরব তার ‘সদিচ্ছা কেন্দ্রিক ভূমিকা’ অব্যাহত রাখবে। কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, এই সফরের মূল প্রশ্ন হলো যুবরাজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কি না, যা ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং সৌদির ভিশন ২০৩০-কে সুদৃঢ় করবে। তার মতে, এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন সৌদির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সীমিত করা এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে তেল আবিরের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বাস্তবসম্মত অগ্রগতি চাইবে। ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম বিদেশ সফরে রিয়াদে গিয়ে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নজর কাড়ে। ট্রাম্প পরে জানান, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নিতে তাকে রাজি করিয়েছিলেন যুবরাজ সালমান। এর ৬ মাস পরে আল-শারাকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানানো হয় এবং সন্ত্রাসী তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়।
