বগুড়ার শেরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত ভাদরা গ্রাম থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে ভবানীপুর গ্রাম। রাত হলেই এ সড়ক হয়ে ওঠে ভয়ংকর। সন্ধ্যারাত থেকে ভোর অবধি এ পথে ছোটখাট যানবাহন নিয়ে কেউ চলাচল করেন না। কারণ সংঘবদ্ধ কয়েকটিচক্র দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মোটরসাইকেল ও সিএনজিযোগে এসে পথরোধ করে যাত্রীদের। এরপর যার কাছে যা পায়, তা ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। গত তিন মাসে অন্তত ১৫টি ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব ঘটনা ঘটলেও অনেকেই প্রাণনাশের ভয়ে থানা-পুলিশে অভিযোগ করার সাহস পাননি। গ্রাম পুলিশও লাঠিহাতে রাত্রিকালীন ডিউটি করতে নারাজ। এদিকে শেরপুর থানা-পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শেরপুর উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা ইউনিয়ন মির্জাপুর ও ভবানীপুর। মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রামের ভেতর দিয়ে খুব সহজে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ভবানীপুর ইউনিয়নে অবস্থিত মহাপীঠ শ্রীশ্রী মা ভবানী মন্দির। এই পথে ভাদরা গ্রাম থেকে এ মন্দিরের দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। এ পথে মির্জাপুর ইউনিয়নের ভাদরা, মাগুর গাড়ি, ভবানীপুর ইউনিয়নের আমিনপুর, শেখর, আম্বইল, ঢেপুয়া, বালেন্দা, মেন্দিপাড়া, বেলগাড়ি, কেশবপুর, ভবানীপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করেন। দিনের বেলা এখান দিয়ে মানুষ যাতায়াত করলেও সন্ধ্যা নামার পর আর শেরপুর শহরমুখী হতে চান না কেউ। হলেও দলবেঁধে বের হন তারা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, এই ৬ কিলোমিটার রাস্তার অন্তত ৮-১০টি স্থানে সড়কের পাশে ছোট ও মাঝারি আকারের গাছ কাটা। কে বা কারা এসব গাছ কেটেছে জানতে চাইলে আমিনপুর গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া বলেন, ‘রাতে সড়কে ছিনতাই-ডাকাতি হয়। তারা গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে ব্যারিকেড দেয়। তারপর যার কাছে যা পায় তাই ছিনিয়ে নেয়। যদি না দেয়, তাহলে তাকে মারধর করে হাত-পা বেঁধে রাস্তায় ফেলে রাখে।’
শেখর গ্রামের মোড়ে সড়কের পাশে জলাশয়ে মাছ ধরছিলেন কয়েকজন। তাদের কাছে গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে জানান, এই রাস্তায় গাছ কেটে নিয়মিত ডাকাতি-ছিনতাই হয়। অক্টোবর মাসে প্রথম সপ্তাহে রাত ১১টার দিকে জলাশয়ে মাছ ধরছিলেন তাদের পরিচিত দুজন। এ সময় সাত থেকে আটজনের একটি দল মোটরসাইলে ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে আসে তাদের কাছে। এসে তাদের কাছ থেকে একটি নতুন মোটরসাইকেল, ৪০ হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তাদের বাধল দিলে মারধর করে এবং থানা-পুলিশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তাই তারা আর থানা-পুলিশ করেননি।
স্থানীয়রা জানান, গত ২৪ অক্টোবর রাতে এ পথে দুটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ে ভবানীপুর ইউনিয়নের চারজন গ্রাম পুলিশসহ সাতজন বাড়ি ফিরছিলেন। ফেরারপথে মেন্দিপাড়া গ্রামের বেলগাড়ি নামক স্থানে পৌঁছালে ১০-১২ জন দুর্বৃত্তের একটি দল রাস্তায় কাঠের গুঁড়ি ফেলে তাদের গতিরোধ করে। দেশীয় অস্ত্রে তাদের জিম্মি করে সবকিছু কেড়ে নিয়ে রাস্তার পাশে ধানখেতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে যায়। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, নগদ ৫ হাজার টাকা ও দুটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ে যায়। পরে ভোরে স্থানীয়রা তাদের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পরের দিন থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
ভবানীপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান-১ নাজির উদ্দিন বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে এ সড়কে মানুষ বের হতে ভয় পায়। কারণ দুর্বৃত্তরা সশস্ত্র অবস্থায় থাকে। তাই গ্রাম পুলিশের পক্ষে লাঠি হাতে তাদের প্রতিরোধ করা কঠিন।’
শেরপুর থানার ওসি এসএম মঈনুদ্দিন বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা ছিনতাইকারী চক্রের একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। এমন ঘটনা ঘটলে যেন দ্রুত পুলিশকে জানানো হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে অবগত করেছি। পুলিশকে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।’ অতি দ্রুত সংঘবদ্ধ এই চক্রকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
