তপন মল্লিক চৌধুরী

এক রাতের উৎসব হলেও বাংলার বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি এবং বনেদি বাড়ির কালীপুজো কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। দুর্গাপুজোর মতোই তা মহাসমারোহ ও সাজো সাজো রবে সংস্কৃতি, আভিজাত্য ও রীতিনীতির এক অনন্য নিদর্শন হয়ে ওঠে দুর্গাপুজোর প্রায় এক মাস পর কার্তিক অমাবস্যায়। প্রাচীন এই সমস্ত ঐতিহ্যবাহী পরিবারে শক্তির আরাধনাকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুজোর মতোই এক পারিবারিক মেলবন্ধন ও উৎসবের মেজাজ তৈরি হয়। জাঁকজমক ও আচার-অনুষ্ঠান যেখানে দুর্গাপুজোর চেয়ে কোনও অংশে কম হয় না।

– বিজ্ঞাপন –

প্রথমেই বলতে হয় মধ্য কলকাতার ৩৬, সরকার লেনের প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো প্রামাণিক বাড়ির কালীপুজোর কথা। কংসবণিক সম্প্রদায়ের এই বাঙালি ব্যবসায়ী পরিবারে জগদ্ধাত্রী পুজোর চল আছে। তবে, এই পাড়ায় এককালে বারোয়ারি কালীপুজো ছিল। কোনও কারণে পুজো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে, এই ‘সাত ঘর প্রামাণিক’ পরিবার সানন্দে কালী মাতৃকার পুজোর ভার গ্রহণ করেন। সেই থেকেই এই প্রামাণিক বাড়ির কালীপুজো কলকাতার প্রাচীন ও বনেদি পরিবারের অন্যতম পুজো হয়ে ওঠে। জানা যায়, বর্ধমান থেকে কাজের সন্ধানে চন্দ্রশেখর প্রামাণিক কলকাতার কাঁসারি পাড়ায় আসেন। পরবর্তীতে তাঁর সাতটি পরিবার একসঙ্গে মিলে পরিচিত হলেন ‘সাধুকা প্রামাণিক’ নামে। তারপর শুরু হয় তাঁদের কুলদেবী কালীর আরাধনা।

কবিরাজ লেনে প্রায় ২৭৫ বছর আগে কালীপুজো শুরু করেছিলেন জমিদার লক্ষ্মীনারায়ণ হালদার। এই বাড়ির সিংহবাহিনী রূপের অষ্টধাতুর প্রতিমা বিশেষভাবে পূজিত হয়। এখানকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল—পুজোর সময় বিদ্যুতের আলো নিভিয়ে শুধু মোমবাতি ও মশালের আলোয় আরতি ও পুজো সম্পন্ন করা হয়। প্রায় ২৩২ বছরের প্রাচীন দর্জিপাড়া মিত্র বাড়ির কালীপুজোও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানকার কালীপ্রতিমা দক্ষিণাকালী রূপের এবং বাঁ পা এগিয়ে থাকে।

কলকাতার এই পুজোগুলির থেকেও প্রাচীন নদিয়ার শান্তিপুরের চাঁদুনি বাড়ির কালীপুজো। জানা যায়, এই পুজো শুরু করেছিলেন চৈতন্যদেবের গৃহশিক্ষক কাশীনাথ সার্বভৌম। এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক গভীর পারিবারিক আবেগ। বছর ঘুরে কার্তিক অমাবস্যা এলে এই পরিবারের সদস্যদের মনে আপনজনদের সঙ্গে মিলনের এক অন্যরকম টান জেগে ওঠে। শুধু পরিবারের মানুষই নয়—প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন মূর্তিশিল্পীরা, ঢাকিরা ও অন্যান্য সহযোগীরাও। পুজোর দেখার মতো বিষয় হল নৈবেদ্য সাজানো। চাঁদুনি মাকে দুর্গাদালান থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষীরের মিষ্টি খাওয়ানো হয়। মাথায় রুপোর ছাতা ধরে তাঁকে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসানো হয়। ভোগের ক্ষেত্রেও থাকে নানা ব্যঞ্জন। গজা আর পক্কান্ন হল পুজোর প্রধান প্রসাদ।

কৃষ্ণনগরে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমল থেকেই শাক্তধর্মের প্রসার ঘটে। রাজবাড়ির উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘রটন্তী কালীপুজো’ এবং দীপান্বিতা কালীপুজো আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। রাজবাড়ির বিভিন্ন পুজোয় প্রাচীন তন্ত্রসাধনা, হোমযজ্ঞ এবং ঐতিহ্যবাহী নিয়মনিষ্ঠা আজও বংশপরম্পরায় বজায় রাখা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন কোচবিহার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো অত্যন্ত বিখ্যাত হলেও, কালীপুজোর ক্ষেত্রে কোচবিহারের রাজপরিবারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল মদনমোহন মন্দিরের ‘বড় তারা’ কালীপুজো এবং ঐতিহ্যবাহী শ্মশানকালী পুজো। কোচবিহারের রাজআমল থেকে শুরু হওয়া শতাব্দীপ্রাচীন বড় তারা কালীপুজো আজও একই নিষ্ঠা, ধর্মীয় আচার ও ভক্তির সঙ্গে পালিত হয়। ঐতিহাসিক এই পুজোয় আজও প্রাচীন প্রথা মেনে মাগুর মাছের বলি এবং শোল মাছ ভাজার ভোগ নিবেদনের মতো বিশেষ রীতি প্রচলিত রয়েছে। রাজপরিবারের এই সমস্ত প্রাচীন পুজো বর্তমানে মূলত কোচবিহার দেবোত্তর ট্রাস্ট বোর্ডের তত্ত্বাবধানে ও পরম্পরা মেনে সম্পন্ন হয়।

কালীপুজোর চেয়েও দীপাবলি বা কালীপুজোর সময় ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি বা মল্লদেব রাজপরিবারের নিজস্ব কুলদেবী এবং নিকটবর্তী ঐতিহাসিক মন্দিরগুলির আরাধনা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে যেমন দুর্গাপুজোয় মূর্তি না হয়ে পটচিত্রে আরাধনা হয়, তেমনই কালীপুজো বা দীপাবলির রাতেও রাজপরিবারের তত্ত্বাবধানে ও ঐতিহ্য মেনে প্রাচীন রীতি পালিত হয়। ঝাড়গ্রামের অদূরে চিল্কিগড় রাজবাড়ির কনকদুর্গা মন্দিরে দেবীকে কালীরূপে পুজো করা হয়। মূল পুজোর আগে চিল্কিগড় রাজবাড়ির ৪০০ বছরের প্রাচীন পটচিত্রের কালীকে পুজো করেন প্রধান পুরোহিত। তারপর নিশিরাতে কনকদুর্গাকে কালীরূপে আরাধনা করা হয় এবং পাঁঠাবলি দেওয়া হয়।

ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও অনন্য রীতিনীতিতে সমৃদ্ধ বর্ধমান জেলার রাজা, জমিদার ও বনেদি বাড়িগুলির কালীপুজোগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাজা মহতাব চাঁদের আমলে প্রতিষ্ঠিত মিঠাপুকুরের সোনার কালীবাড়ির কালীপুজো। প্রসঙ্গত, পুজো শুরু হয়েছিল আনখোনা গ্রামে রাজপরিবারের পক্ষ থেকে কালীপ্রতিমা স্থাপন করে। পাশাপাশি, বর্ধমানের তুকিপুরে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল থেকে এক বিশেষ কালীপুজোর প্রচলন রয়েছে। অন্যদিকে, কালিকাপুর গ্রামে সারা বছর অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি ‘জয়দুর্গা’ কার্তিকী অমাবস্যায় দক্ষিণাকালী বা আদ্যাশক্তির রুদ্ররূপে পূজিত হন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *