রাস উৎসব পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার নবদ্বীপধামের একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব। সাধারণ রাসযাত্রা মূলত বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলাকে কেন্দ্র করে পালিত হলেও, নবদ্বীপের রাস মূলত শাক্তরাস হিসেবে বিশেষ পরিচিত।

নবদ্বীপের শাক্তরাসের ইতিহাস

নবদ্বীপ হল শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারার মিলনক্ষেত্র। ভারতের অন্য জায়গায় রাস মানেই রাধা-কৃষ্ণের উপাসনা। কিন্তু নবদ্বীপে কার্তিকী পূর্ণিমায় তন্ত্রমতে দেড়শো থেকে তিনশোটিরও বেশি মৃন্ময়ী শক্তিমূর্তি, যেমন বড়োশ্যামা, রণকালী, এলানিয়া কালী মাতা, ভদ্রকালী প্রভৃতির পুজো করা হয়। একই সঙ্গে বৈষ্ণবীয় কৃষ্ণের বিগ্রহও ওই দিন পূজিত হন।

– বিজ্ঞাপন –

নবদ্বীপ একদিকে বৈষ্ণব মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যের জন্মভূমি, অন্যদিকে তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জন্মস্থান। কৃষ্ণানন্দই স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে প্রথম দক্ষিণাকালীর রূপ কল্পনা করেন। দীপান্বিতার রাতে বাংলা এবং বাংলার বাইরে যে কালীমূর্তির পূজা করা হয়, তার রূপ কৃষ্ণানন্দের স্বপ্নাদিষ্ট রূপ। কৃষ্ণানন্দ ছিলেন উদারচেতা, ধর্মবিষয়ে তাঁর কোনো গোঁড়ামি ছিল না। আর শ্রীচৈতন্যের উদার চেতনা নিয়ে আমাদের তো কিছু বলারই নেই, যবন হরিদাসই তার প্রমাণ। এ হেন নবদ্বীপে রাস উৎসব যে অন্য মাত্রার উৎসব হবে, তা বলাই বাহুল্য।

প্রচলিত জনশ্রুতি, নবদ্বীপে চৈতন্যদেব রাধাকৃষ্ণের রাস উৎসবের সূচনা করেছিলেন। সেই হিসাবে ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভেই রাসের সূচনা হয়েছিল। তবে চৈতন্যদেবের সন্ন্যাস গ্রহণের পর নবদ্বীপের বৈষ্ণব আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে বৈষ্ণবীয় উৎসব অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নবদ্বীপে যে রাস উৎসবের সূচনা হয় তা অভিনব এবং বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসে তা অদ্বিতীয়। সেটিই হল শাক্তরাস – শাক্তদেবীদের বিশাল মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মাণ করে শক্তি আরাধনাই নবদ্বীপের রাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আঠারো শতকে নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে নবদ্বীপে শাক্তরাসের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু এই শাক্তরাসের জাঁকজমক বাড়ে কৃষ্ণচন্দ্রের উত্তরপুরুষ গিরীশচন্দ্রের উদ্যোগে। তাঁরই আমলে যে সব রাসপ্রতিমা পুজোর সূচনা ঘটেছিল নবদ্বীপে, তার মধ্যে অন্যতম হল— নন্দীপাড়ার মহিষাসুরমর্দিনী, পুরাণগঞ্জ ও বুড়োশিবতলার বিন্ধ্যবাসিনী, মহাপ্রভুপাড়ার গোঁসাইগঙ্গা, দণ্ডপাণিতলার মুক্তকেশী, আমপুলিয়াপাড়ার শবশিবা, রামসীতাপাড়ার কৃষ্ণমাতা ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে চারিচারাপাড়ায় ভদ্রকালী, তেঘরিপাড়ায় বড়োশ্যামা, এলানিয়া কালী। এলানিয়া কালীকেই নবদ্বীপে রাসপূর্ণিমায় প্রথম শাক্ত মূর্তি হিসাবে ধরা হয়।

রাসপূর্ণিমার পরের দিন প্রতিপদে আলোকসজ্জা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী ‘তাসা’ বাজনার মাধ্যমে বিশাল আকৃতির প্রতিমাগুলো ঘুরিয়ে ভাগীরথী নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। প্রতিমা নিরঞ্জনের এই উৎসবকে স্থানীয় ভাষায় ‘আড়ং’ বলা হয়।
রাসপূর্ণিমায় নবদ্বীপে মন্দিরের ভিতরে রাধাকৃষ্ণের চক্ররাস অনুষ্ঠিত হয়, তবে জাঁকজমকপূর্ণ শাক্তরাসের পাশে তা অনেকটাই ম্রিয়মান।

কী ভাবে যাবেন নবদ্বীপ ?

১. ট্রেনে গেলে:

বিজ্ঞাপন

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে: হাওড়া স্টেশন থেকে মেইন লাইনের ট্রেনে নবদ্বীপ ধাম যাওয়া যায় (সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা)। এছাড়া শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কৃষ্ণনগরগামী লোকাল ধরে কৃষ্ণনগর এসে, সেখান থেকে রোড বা ছোট ট্রেনে নবদ্বীপ পৌঁছানো যায়।
নবদ্বীপ ধাম বা বিষ্ণুপ্রিয়া স্টেশন থেকে টোটো বা অটো নিয়ে শহরের ভেতরে বা মায়াপুরের ঘাটে যাওয়া যায়।

২. বাসে গেলে:

কলকাতা বা আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ডিরেক্ট সরকারি ও বেসরকারি বাস চলাচল করে।
ধর্মতলা বা উত্তর কলকাতার বাস স্ট্যান্ড থেকে নবদ্বীপগামী বাস পেয়ে যাবেন।

৩. গাড়িতে বা সেল্ফ ড্রাইভে গেলে:

কলকাতা থেকে সড়ক পথে দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিমি।
ডানকুনি থেকে দিল্লি রোড হয়ে অথবা সিঙ্গুর হয়ে নবদ্বীপ যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন?

নবদ্বীপে থাকার জন্য একাধিক হোটেল-হোমস্টে আছে। যার একটু আরামদায়ক ভাবে থাকতে চান, তাঁরা থাকতে পারেন ‘রাধারাণী কুটির’-এ। রাজ্য সরকারের পর্যটক দফতর কর্তৃক অনুমোদিত গোল্ড ক্যাটাগরির হোমস্টে। নিরামিষ সুস্বাদু খাবার বাঙালি খাবার পাবেন। বিস্তারিত জানতে বা বুকিং করতে যোগাযোগ করুন: 81007 97037।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *