আলিপুরদুয়ারের জয়গাঁর তোর্ষায় প্রস্তাবিত স্থলবন্দর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে জমি অধিগ্রহণ ও উচ্ছেদ বিতর্কে নতুন মোড়। একদিকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় আইন মেনে চলার নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট, অন্যদিকে জমি দখলের প্রতিবাদে গ্রেফতার হওয়া ১১ জন আন্দোলনকারীকে জামিন দিল আলিপুরদুয়ার আদালত। শুক্রবার এই দুই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এল তোর্ষার জমি আন্দোলন।
চা বাগানের জমিতে স্থলবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা চলছে আলিপুরদুয়ারের জয়গাঁর তোর্ষা এলাকায়। ওই প্রকল্পের জন্য স্থানীয় চা শ্রমিক ও বাসিন্দাদের বসবাসের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গ চা মজদুর সমিতি। সংগঠনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করা শ্রমিক পরিবারগুলিকে উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে। এই পরিস্থিতিতে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় সংগঠনটি।
– বিজ্ঞাপন –
শুক্রবার বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কেউ বেআইনি ভাবে জমি দখল করে থাকলেও তাঁকে ইচ্ছামতো উচ্ছেদ করা যায় না। উচ্ছেদের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে আইন মেনেই পদক্ষেপ করতে হবে। জনস্বার্থে কোনও সরকারি প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও দেশের প্রচলিত আইন অমান্য করা যাবে না বলে মন্তব্য করে আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, ছোট ঝুপড়িতে বসবাসকারী মানুষ হোন বা বড় প্রাসাদে থাকা ব্যক্তি—প্রত্যেকেরই সমান আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বরং আর্থিক ও সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিচারপতির মন্তব্য, যাঁরা ঝুপড়িতে বসবাস করেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো লোক অনেক সময় পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে আদালতই তাঁদের ভরসার জায়গা।
রাজ্যের তরফে আদালতে জানানো হয়, স্থায়ী ভাবে বসবাসকারী কাউকে উচ্ছেদ করার প্রশ্ন নেই। বরং কয়েকজন বাসিন্দা ধর্নায় বসে প্রকল্পের নির্মাণকাজ আটকে দিচ্ছেন এবং অশান্তি সৃষ্টি করছেন। এর আগে আদালতের নির্দেশে এফআইআর দায়ের হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে বলে জানায় রাজ্য।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জানায়, কেউ ধর্নায় বসে থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে আইন মেনেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলনকারীদের সরাতে বুলডোজ়ার নিয়ে যাওয়া যায় না। আদালতের বক্তব্য, নিজেদের মাথার ছাদ রক্ষা করার চেষ্টা করাটা কী ভাবে অন্যায় হতে পারে, সেই প্রশ্নও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
ডিভিশন বেঞ্চ অবশ্য স্থলবন্দর প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়নি। আদালত জানিয়েছে, আইন মেনে রাজ্য প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। তবে কোনও বাড়ি বা কাঠামো ভাঙা কিংবা কাউকে বসবাসের জায়গা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
জামিন পেলেন গ্রেফতার ১১ আন্দোলনকারী
এ দিকে পশ্চিমবঙ্গ চা মজদুর সমিতির প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২ নভেম্বর তোর্ষায় জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে গ্রেফতার হওয়া ১১ জন আন্দোলনকারী শুক্রবার আলিপুরদুয়ার আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। সংগঠনের দাবি, বিতর্কিত জমি দখলের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করার সময় তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরের দিন প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তাঁদের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
গ্রেফতারের পরেই আন্দোলনকারীদের সংগঠন ফের কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের দাবি, ভ্যাকেশন বেঞ্চে জরুরি শুনানির আবেদন জানানো হয়েছিল। তার পরেই আদালত উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্ট করে।
সংগঠনের বক্তব্য, আদালতের পর্যবেক্ষণ নির্বিচারে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা। কোনও পরিবারকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া বাড়ি বা জমি থেকে সরানো যায় না। উচ্ছেদের আগে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিকে নোটিস দেওয়া, তাঁদের বক্তব্য ও জমির উপর অধিকার সংক্রান্ত নথি পেশের সুযোগ দেওয়া এবং শুনানির মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
উন্নয়নের বিরোধিতা নয়, পুনর্বাসন ও অধিকারের দাবি
পশ্চিমবঙ্গ চা মজদুর সমিতি জানিয়েছে, তারা স্থলবন্দর প্রকল্প বা উন্নয়নের বিরোধী নয়। তবে উন্নয়নের নামে মানুষের বসতবাড়ি, জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করা যাবে না। জমি অধিগ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের অধিকার ও পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন থমকে থাকার পরে গত জুলাই মাসে তোর্ষায় স্থলবন্দর প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ ফের শুরু হয়। পুনর্বাসন প্যাকেজে পাকা বাড়ির জন্য ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা এবং অস্থায়ী বাড়ির জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কৃষিজমি ও গাছপালার মূল্য নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের শিক্ষিত সদস্যদের স্থলবন্দরে কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকারের কথাও জানানো হয়।
তবে সরকারি জমিতে বসবাসকারী চা শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টি স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁদের দাবি, পূর্বপুরুষরা চা বাগানে কাজের সূত্রে ওই এলাকায় এসেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও তাঁরা জমির পাট্টা পাননি।
হাই কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এবং ১১ জন আন্দোলনকারীর জামিনের ঘটনায় তোর্ষার জমি আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হল। এখন নজর, আদালতের নির্দেশ মেনে প্রশাসন কী ভাবে স্থলবন্দর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পুনর্বাসন ও অধিকার সংক্রান্ত দাবির কী নিষ্পত্তি হয়।
