২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তাবিথ আউয়াল। চার বছর মেয়াদের প্রথম বছর কাটানোর পর বাফুফে প্রধানকে দেশ রূপান্তর চেষ্টা করেছে আয়ানার সামনে দাঁড় করাতে। জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া প্রতিবেদক সুদীপ্ত আনন্দ’র মুখোমুখি হয়ে নিজের এক বছরের ময়নাতদন্ত করেছেন_
ফুটবল মোড়ল (বস) হিসেবে আপনাকে অভিনন্দন দেশের অস্থির সময়ে হাল ধরায় এবং একটি সক্রিয় বছর পার করায়। প্রথম বছর নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।
তাবিথ আউয়াল : প্রথমত আমি ফুটবল বস নই, ফুটবলের একজন কর্মী। দ্বিতীয়ত আপনাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা আমাদের ও জাতীয় দলগুলোকে সমর্থন দেওয়ায়। আমি বিশ্বাস করি, আমরা একটা সফল বছর কাটিয়েছি। ইতিবাচক বেশ কিছু পরিবর্তন আমরা আনতে পেরেছি দেশের ফুটবলে। বিশেষ করে আমরা বলতে চাই, আমাদের মহিলা দল উন্নতির পথে রয়েছে এবং ফুটবল প্রশাসন ছয় বছর পর ফিফার আর্থিক বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে এসেছে।
আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাফুফের সব কিছুতেই একটা শৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। বাফুফের চাকরিজীবীদের দম ফেলার সুযোগ নেই। বছর জুড়েই প্রতিটি বিভাগকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। শুরুতেই কি চেয়েছিলেন বাফুফেকে একটি সক্রিয় ফেডারেশন হিসেবে গড়ে তুলতে?
তাবিথ : ফুটবল প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনাকে যুগোপযোগী করার বিকল্প ছিল না। যদি ভিত্তি শক্ত না হয়, তাহলে যতই সাফল্য আসুক তা টেকসই হবে না। তাই প্রথম বছরে বাফুফের ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনয়ন ছিল অন্যতম কৌশল।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কৃতিত্ব আপনি দাবি করতেই পারেন। বিশেষ করে ফিফার নিষেধাজ্ঞা তোলার ক্ষেত্রে বড় ভ‚মিকা ছিল আপনার। এত বছরের বিধিনিষেধ থেকে ফুটবলকে কী করে মুক্ত করলেন?
তাবিথ : ফিফার আর্থিক বিধিনিষেধ তোলার কৃতিত্ব আমার একার নয়। এটা ছিল একটা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। আমরা শুধু আর্থিক প্রক্রিয়াকে সুসংগঠিত করেছি এবং প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা এনেছি। এই সমস্যাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়ে গত নভেম্বরে কাজ শুরু করি।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ একটা উন্নতির সোপান খুঁজে পেয়েছে। বিশেষ করে হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহামিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ, কিউবা মিচেলের মতো প্রবাসী ফুটবলাররা দেশের ফুটবলে যুক্ত হয়েছেন বলেই স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিপূর্ণ থাকছে। তারপরও কি এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়াটা হতাশার?
তাবিথ : আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ২৩ জন খেলোয়াড়ই স্টেডিয়াম এবং অনলাইনে অগুনতি ভক্তকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করতে সমান গুরুত্ব রেখেছে। তাদের খেলার ধরন এবং আক্রমণাত্মক মনোভাবই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। অবশ্যই আমি দুঃখিত যে আমরা (মূল পর্বের) যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। তবে আমি বাফুফের সবার প্রশংসা করতে চাই চেষ্টা ও ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য।
বাফুফের দায়িত্ব নেওয়ার তিন-চারদিন পরেই নারী ফুটবলাররা আপনাকে দারুণ এক সাফল্য উপহার দিয়েছিল। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর এই মেয়েদের সঠিক পথে রাখা, এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা। এর ধারাবাহিকতায় এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষদের হারিয়ে ইতিহাস গড়া, এ সব কিছুকেই নিশ্চয় নিজের সেরা প্রাপ্তির তালিকার ওপরের দিকে রাখবেন?
তাবিথ : আমাদের মেয়েরা পুরো জাতিকে গর্বিত করেছে। আমি সবসময় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে আমার সময়টা এমন এক সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে, যখন বাংলাদেশের মেয়েরা এক সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এতদিন আমরা দক্ষিণ এশিয়ার সাফল্যেই সন্তুষ্ট হতাম। তবে আমার বিশ্বাস ছিল তারা এশিয়া পর্যায়েও প্রমাণ দিতে পারবে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, চাইলে তারা সব করতে পারে।
এক বছরে পুরুষ ও নারী ফুটবলের সব পর্যায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। শুরুর পরিকল্পনা কি এমনটাই ছিল?
তাবিথ : আমার প্রতিশ্রুতি ছিল ফুটবলকে সক্রিয় রাখা ও সারা বছর খেলা মাঠে রাখা। আমি শুধু আমার প্রতিশ্রুতি পালন করছি।
৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের ক্রীড়া ক্লাবগুলো ভীষণ সমস্যাগ্রস্ত। তারপরও শীর্ষ ঘরোয়া মৌসুম শুরু করতে পারাটাও নিশ্চয় চ্যালেঞ্জিং ছিল?
তাবিথ : আমি সবসময় বলি স্বাধীনতার পর থেকেই ক্লাবগুলো দেশের ফুটবলের হৃদয়। যাই হোক না কেন, ক্লাব কখনো খেলা থামায়নি এবং কখনো ভক্তদের হতাশ করেনি। আমি সবসময় ফুবল ক্লাবগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। (খেলা চালিয়ে নেওয়ার) কৃতিত্ব তাদেরই, আমার নয়।
জেলায় জেলায় ফুটবল নিয়ে একটা নড়াচড়া শুরু হয়েছে। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে। বয়সভিত্তিক জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছে। এত কিছুর মধ্যেও সবকটি জেলা লিগ আয়োজন করতে পারেনি। এটা কি আপনাকে হতাশ করে?
তাবিথ : একেবারেই নয়। আমরা এমন পরিবেশে কাজ করছি যেখানে মাঠের ঘাটতি আছে। কোচ ও রেফারির সংকট আছে। তবুও আমরা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, মহিলা অনূর্ধ্ব-১৪ এবং পুরুষ অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্ট জেলা পর্যায়ে নিয়ে গেছি। সরকারের সহযোগিতাও এই সাফল্য অর্জনে আমাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আশা করছি লিগগুলো স্বাভাবিকভাবেই আয়োজিত হবে।
নারীরা এশিয়ান কাপের মূল পর্বের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তাদের সেরা প্রস্তুতির ব্যবস্থাই নিশ্চয় করবেন?
তাবিথ : আমি আমাদের নারী দলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখি এবং তাদের প্রস্তুতির জন্য সব উদ্যোগ নিচ্ছি। আমার বিশ্বাস তারা এশিয়ান কাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারে।
নারীরা পারলেও সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও পুরুষ দল মূল পর্বে যেতে পারল না। আবার চার বছরের অপেক্ষার শুরু। কোথায় ঘাটতি আছে? একটা শক্তিশালী পুরুষ দল গড়ে তুলতে আপনার পরিকল্পনা জানতে চাই।
তাবিথ : আমি মনে করি না আমরা (পুরুষ দল) ব্যর্থ হয়েছি। কারণ আমরা র্যাংকিংয়ের দিক থেকে গ্রুপে সবার নিচের দল। তারপরও আমাদের গ্রুপসেরা হওয়ার আশা ছিল। এটা কষ্টের যে আমরা মূল পর্বে যেতে পারিনি। এখন আমাদের লক্ষ্য অন্তত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা এবং পরবর্তী অলিম্পিক বাছাইয়ের জন্য দলকে প্রস্তুত করে তোলা।
তৃণমূলে ব্যাপক কাজের স্বীকৃতি ইতিমধ্যে পেয়েছেন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) কাছ থেকে। এই স্বীকৃতি নিশ্চয় দায়বদ্ধতাও অনেক বাড়িয়েছে?
তাবিথ : এই স্বীকৃতি বোঝায় যে আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করি, তবে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
সম্প্রতি ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেছেন, রাষ্ট্রের কাছে ফুটবল আছে অগ্রাধিকারের শীর্ষে। সরকারের কাছ থেকে বেশ কিছু স্টেডিয়াম বরাদ্দ পেয়েছেন, অর্থ বরাদ্দও পেয়েছে ফুটবল। তারুণ্যের উৎসবের মূল বাজেটের বড় অংশই ফুটবলকে বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটা জরুরি?
তাবিথ : দেশের সুনাম ও গৌরবের জন্য কাজ করা সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একজন ভীষণভাবে ক্রীড়াপ্রেমী ক্রীড়া উপদেষ্টা পেয়েছি, যার কাছ থেকে সেরা সমর্থনটাই পাচ্ছি। অন্য রাজনৈতিক দলসমূহ, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তৃণমূলের টুর্নামেন্ট ও খেলা চলাকালে অনেক সমর্থন দিয়েছে। তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাই সবার সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক রাখাটা জরুরি।

দ্বিতীয় বছরটি কেমন কাটবে আশা করছেন? নতুন কিছু কি দেখা যাবে?
তাবিথ : নতুন অনেক কিছু করার সুযোগ নেই। কারণ এখন আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা শুধু এই বছর যা করেছি, সেটি বড় আকারে এবং ভালোভাবে করতে চাই।
আপনি একই সঙ্গে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর আপনার রাজনৈতিক ব্যস্ততা অনেক বাড়বে। রাজনীতি, ব্যবসা ও ফুটবলকে সমন্বয় করা নিশ্চয় সহজ নয়?
তাবিথ : আমি মনে করি এই পরিচয়গুলো ফুটবলে মেলাতে না পারলে পূর্ণতা লাভ করবে না। আজ ফুটবল পুনরুজ্জীবিত হয়েছে সরকারের নীতি, ব্যবসায়ী সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংগঠনের কারণে। তাই বিশ্বাস করি, আমার এই তিনটি পরিচয়ই ফুটবলের জন্য ভবিষ্যতে পথচলা আরও মসৃণ করবে।
সব শেষ প্রশ্ন। ফুটবলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। সত্তর-আশির দশকের মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচে দর্শকের ঢল নামছে গ্যালারিতে। সে সময়ের সংগঠকরা মানুষের এই উন্মাদনা পুঁজি করে ফুটবলকে কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে নিতে পারেননি। আপনি পারবেন তো? ঘরোয়া ফুটবলে এখনো দর্শক সেভাবে হচ্ছে না। সেরা মানের একটা লিগ আয়োজন করে নিশ্চয় চাইবেন সেই আক্ষেপ ঘোচাতে?
তাবিথ : এই মুহূর্তে আমি কোনো সমালোচনামূলক মন্তব্য করতে চাই না। তবে বাস্তবতা হলো, ঘরোয়া লিগে উন্নতির জন্য আমাদের উন্নত খেলার মাঠ ও স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে হবে। আমি অবশ্যই ভক্তদের উন্মাদনা ও আগ্রহকে খেলার মানোন্নয়নে কাজে লাগাতে চাই। ইতিমধ্যে নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার অধিনায়করা বাংলাদেশের ফুটবল লিগে খেলছেন। তার মানে ভালো ফুটবলাররা আমাদের লিগে আকৃষ্ট হচ্ছেন। এখন সেরা ফুটবলারদের খেলার সেরা পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
