ছবির উৎস, Getty Images
‘হালিয়ু’ – শুনেছেন কখনও? এটি একটি কোরিয়ান শব্দ, বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘কোরিয়ান ঢেউ’। এটিকেই ইংরেজিতে বলে ‘কোরিয়ান ওয়েভ’, সংক্ষেপে ‘কে-ওয়েভ’।
এই শব্দ দিয়ে মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়াকে বোঝানো হয়।
সাগর আর পাহাড় দিয়ে ঘেরা দেশটির সংগীত, নাটক, সিনেমা, পোশাক, প্রসাধনী, খাবার, জীবনযাত্রার ধরণ, এমনকি ভাষাও দিনকে দিন এর সীমানার বাইরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ‘হালিয়ু’ বা কোরিয়ান ওয়েভ বাংলাদেশের শহুরে সংস্কৃতিতেও লক্ষণীয় মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের নারীদের কাছে এককালে হিন্দি সিরিয়ালের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল, সন্ধ্যা নামলেই তারা তখন টেলিভিশনের পর্দায় বুঁদ হয়ে থাকতেন অনেকে।
কিন্তু এখন সময় পাল্টে গেছে। এখনকার জেনারেশন-জি ও জেনারেশন-আলফা যারা, তাদের মধ্যে টেলিভিশনের প্রতি আসক্তি নেই। বরং অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে নানা দেশের ড্রামা সিরিজ নিয়ে আলোচনা-আগ্রহ চোখে পড়ে।
এত সব বিদেশি কন্টেন্টের মধ্যেও ‘কোরিয়ান ড্রামা’, সংক্ষেপে যাকে ‘কে-ড্রামা’ও বলা হয়, এর প্রতি বিশেষ করে কিশোর-তরুণদের বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়। অ্যাকশন, থ্রিলার কিংবা ইতিহাসনির্ভর গল্প-কেন্দ্রিক কে-ড্রামায় তাদের বেশ আগ্রহ।
কিন্তু ঠিক কী কারণে ও কীভাবে কোরিয়ান সংস্কৃতি বাংলাদেশে এতটা জনপ্রিয় হলো?
ছবির উৎস, Getty Images
যেসব যুক্তিতে ‘কে-ড্রামায়’ বুঁদ
সদ্য একুশ বছরে পা দিয়েছেন নুসরাত জাহান স্বর্ণা। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় যখন বিশ্বের সব দেশের মতো বাংলাদেশেও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলো, তখন পড়াশোনার সুবিধার্থে তার হাতে এলো ট্যাবলেট কম্পিউটার, সংক্ষেপে ট্যাব।
এর কিছুদিন পরই তার মাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশ হলো এবং এরপর তিনি উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার জন্য ঢাকার একটি কলেজে ভর্তি হলেন। শুরুর দিকের তার ক্লাসগুলো অনলাইনে চলছিলো।
“অনলাইনেই আমার নতুন নতুন বন্ধু হলো। ওরা আমাদের গ্রুপে কে-ড্রামা নিয়ে আলোচনা করতো। আমার তখন পর্যন্ত এসব নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। কারণ ট্যাব হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত ইন্টারনেটে আমার সেভাবে কোনো অ্যাকসেস ছিল না। তো, এরপর আমি বন্ধুদের দ্বারা ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে, মানে এক ধরনের সোশ্যাল প্রেশারে পড়ে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কে-ড্রামা দেখা শুরু করলাম। সেই থেকে শুরু…এখনো চলছে,” বিবিসিকে বলছিলেন মিজ জাহান।
কে-ড্রামা কেন তার এত প্রিয়, ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই ভক্ত বলেন, “কে-ড্রামা চিরাচরিত হিন্দি সিরিয়ালের মতো ওভার-ড্রামাটিক না। আমি কে-ড্রামা’র সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারি। ওদের প্রোডাকশন খুব ক্লিন,” হেসে তিনি আরও বলেন, “আর, কে-ড্রামার নায়করা দেখতে খুবই সুন্দর”।
মিজ নুসরাতের মতো কে-ড্রামা ভক্ত আরো কয়েকজন জানিয়েছেন, বেশিরভাগ কে-ড্রামা’র কাহিনী তাদের কাছে বাস্তবের মতোই লাগে। অর্থাৎ, দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ান দেশ হওয়ার কারণে কে-ড্রামায় দেখানো কোরিয়ান সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের মিল খুঁজে পান তারা।
বিশের কোঠায় বয়স মায়মুনা চৌধুরী স্বচ্ছ’র। তিনি জানান, ২০১৪ সালে স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুর বড় বোনের উৎসাহে তার কে-ড্রামা দেখা শুরু।
তাকে মুঠোফোনে কল দিলে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “আমি এখন নেটফ্লিক্সে ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজেরিনস’ দেখছি। সেটিকে মাঝপথে থামিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলছি।”
এরপর তিনি ‘ডিসেন্ড্যান্টস অফ দ্য সান’, ‘ক্র্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ’ কিংবা ‘গবলিন’ এর মতো বেশ কিছু জনপ্রিয় কে-ড্রামা’র গল্প বললেন। তার মতে, “ওদের অভিনয়, স্টোরিলাইন খুব ভালো”।
ছবির উৎস, Getty Images
“সবচেয়ে বড় কথা, ওদের নায়কগুলো মেয়েদের ইমোশনকে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে, অন্ততপক্ষে পর্দায়। তারা মেয়েদের প্রতি অনেক বেশি যত্নশীল হয়,” মত তারও।
শুধু কিশোরী ও তরুণীরাই নয়, তরুণদের মধ্যেও কে-ড্রামা কেন জনপ্রিয়?
জানতে চাইলে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল নামির বলেন, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় থেকে নিয়মিত কে-ড্রামা দেখছেন।
“আমার মতো অ্যানিমে ফ্যানরাও কে-ড্রামা দেখে। কারণ কাহিনী খুবই কানেক্ট করার মতো। আর নায়ক-নায়িকারাও সুন্দর,” বলেন তিনি। তার মতে, কিছু কে-ড্রামা’য় প্রচলিত অনেক ধারণাকেই প্রশ্ন করা হয় যা তার ভালো লাগে।
এছাড়া, কে-ড্রামাগুলোতে যারা অভিনয় করেন, তারা “ফ্যান ও ইন্ডাস্ট্রির প্রতি অনেক বেশি ডেডিকেটেড” জানিয়ে এই তরুণ আরও বলেন, “ওদের অভিনয়ে বৈচিত্র্য আছে”।
মিলেনিয়াল, অর্থাৎ আশি ও নব্বইয়ের দশকে জন্ম যাদের, তাদের মধ্যেও কে-ড্রামা’র নিয়মিত দর্শক রয়েছে। তেমনই একজন হোমায়রা হক।
পেশায় সাংবাদিক মিজ হোমায়রা বলেন, “ওদের থ্রিলারগুলো সুপার-লেভেলের থ্রিলার। মেডিক্যাল ড্রামা দেখলে মনে হবে, এরা সত্যিই ডাক্তার। ক্রিমিনাল যারা, তারা সুপার লেভেলের ক্রিমিনাল। এদের প্রেজেন্টেশন সুন্দর।”
“…কে-ড্রামার সঙ্গে আমাদের কালচারও মেলে। যেমন, বাবা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে মেয়েকে দেখলে বিরক্ত হচ্ছে, বাবা বিয়ে দেওয়ার আগে দেখে ছেলেটা ভালো কি না, ঠিক আমাদের দেশের বাবারা যেমন করে। ওদের দেশেও এটা আছে…ওরা বিয়ের ক্ষেত্রে খুব কমিটেড দেখায়। প্রেমের ক্ষেত্রেও তাই।”
ছবির উৎস, Getty Images
কে-ড্রামার দুয়ার খুললো কীভাবে?
বাংলাদেশে কোরিয়ান সংস্কৃতির এতটা বিস্তারের পেছনে কে-পপের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক মাসউদ ইমরান।
কে-ড্রামার যে দর্শকদের সঙ্গে বিবিসি বাংলা’র আলাপ হয়েছে, তারাও বলেছেন, কে-ড্রামার আগে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কে-পপের। যদিও কে-পপই একমাত্র পথ নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসউদ ইমরান, যার গবেষণার অন্যতম বিষয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রথমে জাপানি অ্যানিমে ও মাঙ্গা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে কোরিয়ান কনটেন্টও তাদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এর একটি কারণ হিসেবে এসব কনটেন্টে উঠে আসা বিষয়গুলোর সঙ্গে শিশু-কিশোরদের সহজে সংযোগ তৈরি হওয়ার কথা বলেন তিনি।
“ওয়েস্টার্ন স্টোরিটেলিংয়ের প্রসেস ঠিক রেখে ওরা এশিয়ান মুড তৈরি করেছে। কে-পপসহ কোরিয়ার অন্যান্য সাংস্কৃতিক কনটেন্টেও একই কৌশল দেখা যায়।”
আবার কোরিয়ান ওয়েবটুন বা ডিজিটাল কমিকস থেকে অনেক জনপ্রিয় কে-ড্রামা তৈরি হয়েছে, যা তরুণ দর্শকের ওপর বড় প্রভাব তৈরি করেছে বলে মনে করেন তিনি।
কে-পপ বা কোরিয়ান পপ মিউজিক হলো দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় গান ও নাচের ধারা। এর মাঝে কোরিয়ান কথা, ইউরো পপ, আফ্রিকান-আমেরিকান হিপ হপ ও র্যাপ মিশে থাকে।
এই কে-পপ মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এরপর একবিংশ শতাব্দীর শুরুর এক দশকে ইন্টারনেট ও ইউটিউবের মাধ্যমে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে, ২০১২ সালে ‘সাই’-এর ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ ইউটিউব ভিউয়ের দিক থেকে সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে। বিশ্বজুড়ে পরিচিতি বাড়তে থাকে কে-পপের। পরবর্তীতে বিটিএস, ব্ল্যাকপিংক ইএক্সও-এর মতো ব্যান্ড গ্লোবাল মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেয়।
ছবির উৎস, Getty Images
হোমায়রা হক নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠলেও তিনি নিজে বরাবরই ব্রিটিশ ব্যান্ড কোল্ডপ্লে’র ফ্যান। কিন্তু কোভিড মহামারির পর কোল্ডপ্লে ও বিটিএস যখন কোলাবোরেশন করলো, তখন তিনি ভাবলেন, “বিটিএস ডেফিনিটলি কিছু। নইলে কোল্ডপ্লে কেন ওদের সাথে কোল্যাব করবে?”
“তারপর থেকে আমার বিটিএস-এর প্রতি আকর্ষণ কাজ করে এবং আমি প্রথমবার তাদের গান শুনি। তাদের অধিকাংশ গান-ই খুব ইন্সপায়ারিং। কিন্তু বিটিএস-এর বাইরেও খুব ভালো ভালো মিউজিশিয়ান, ব্যান্ড আছে ওদের।”
এদিকে, অধ্যাপক ইমরান এও মনে করেন, কে-পপ, অ্যানিমে কিংবা কে-ড্রামার এই বিস্তারের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরনও জড়িত। কারণ এখনকার কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীরা কোনো সিনেমা বা সিরিজ দেখার আগেই অনলাইনে সেটির রিভিউ দেখে নেয়। কিন্তু আগের প্রজন্ম কিছু না পড়েই তা দেখে নিতো।
এই অধ্যাপকের পর্যবেক্ষণ, নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের ওপর ভারতীয় সিনেমা, সিরিয়াল ও হিন্দি গানের যে প্রভাব ছিল, এখনকার শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে তা নেই।
ছবির উৎস, Getty Images
মেল বিউটির পুরোনো ধারণায় ধাক্কা
একসময় একটা জনপ্রিয় ধারণা ছিল, পুরুষ মানেই হবে পেশিবহুল, থাকবে দাড়ি-গোঁফসমেত বলিষ্ঠ চেহারা; কিন্তু এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে কোরিয়ান সংস্কৃতি, বলছেন অধ্যাপক মাসউদ ইমরান।
এক সময়ের হিন্দি সিনেমায় সালমান খানের মতো তারকাদের ‘মাচো’ শারীরিক গঠনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এর বিপরীতে কে-পপ ও কে-ড্রামার পুরুষ তারকাদের সাজপোশাক, আচার-আচরণ ও উপস্থাপনায় ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছে নতুন প্রজন্ম।
কে-ড্রামার পুরুষ চরিত্ররা যেমন আবেগ প্রকাশে স্বচ্ছন্দ, তেমনি নিজের ত্বক ও চুলের যত্ন নিতেও স্বাভাবিক। আর কে-পপ আইডলরা প্রকাশ্যেই সানস্ক্রিন, সিরাম বা স্কিনকেয়ার রুটিনের কথা বলেন, যা তরুণ ছেলেদের কাছে এসব অভ্যাসকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।
এর ফলে স্কিনকেয়ার বা গ্রুমিং আর “শুধু নারীদের বিষয়” হিসেবে দেখা হচ্ছে না এবং বিষয়টি “মেল বিউটির ধারণাকে পুরোপুরি পাল্টে দিচ্ছে” বলেও মত তার।
অধ্যাপক ইমরানের মতে, কে-পপ বা কে-ড্রামার অনেক পুরুষ তারকার উপস্থাপনায় একধরনের কোমলতা দেখা গেলেও একইসঙ্গে তারা পুরুষের প্রচলিত অনেক বৈশিষ্ট্যও ধারণ করেন।
কোরিয়ান জনপ্রিয় সংস্কৃতির এই পরিবর্তনের পেছনে দেশটির ইতিহাস ও সামাজিক অভিজ্ঞতারও প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত কোরিয়ান সাহিত্য ও গানে জাতীয়তাবাদী ভাবের প্রভাব ছিল। “এরপর দুই কোরিয়াতে ৫৩ বছর ধরে যুদ্ধ চললো। এই টেনশনে মানুষের মাঝে যে ভয়-হতাশা তৈরি হয়েছে, এটাকে ওরা খুব ভালোভাবে অ্যাড্রেস করেছে।”
এছাড়া, পুরুষকে সবসময় কঠোর, আবেগহীন বা কর্তৃত্বপরায়ণ হতে হবে, এমন প্রচলিত ধারণাও বদলাচ্ছে। বরং আবেগ প্রকাশ, কোমল আচরণ ও যত্নশীল হওয়াকেও পুরুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করছে নতুন প্রজন্ম।
ছবির উৎস, Getty Images
পোশাক থেকে খাবার, সবখানেই কোরিয়ান ঢেউ
কে-ড্রামা বা কে-পপের যারা ভক্ত, তারা কোরিয়ান মেকআপ, ফ্যাশন, খাবার, এমনকি স্কিনকেয়ার (ত্বকের যত্ন) প্রোডাক্ট বা পণ্যেরও ভক্ত। তাদের মতে, হালের যে হাই ওয়েস্ট প্যান্ট, ক্রপ টপ, ভারি ওভারকোট; এগুলো কে-ড্রামা থেকে এসেছে।
“দক্ষিণ কোরিয়ার ড্রামাগুলো দেখলে ওদের পোশাক, খাবার, জীবনযাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ওদের সাধারণ পরিবার ঘরের পোশাকআশাকে চাকচিক্য নাই। তাদের অন্য রকম এলিগেন্সি দেখায়। যারা গরীব, তাদের গরীবের মতোই দেখায়,” বলছিলনে মিজ হোমায়রা।
“ওদের ড্রামার বিশাল অংশ খাবার ফোকাস করা। তাতে গরীব পরিবারের খাবার দেখায়। ধনীদের খাবার দেখায়। রাস্তায় যারা থাকে, তাদের খাবারও দেখায়।”
এদিকে, ঢাকায়ও এখন এমন কিছু রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে, যেগুলোতে ঢুঁ মারলেই এখন কোরিয়ান খাবার কিমচি, বিবিম্বাপ বা রামেনের দেখা মেলে। বিভিন্ন ফুড ফেস্টিভ্যাল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ফুড ব্লগিং এসব জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
খাবারের ক্ষেত্রে কোরিয়ান স্বাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু মিলও দেখছেন অধ্যাপক ইমরান।
উদাহরণ হিসেবে কিমচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝালের কারণে কোরিয়ান খাবারের কিছু পদ বাংলাদেশের মানুষের কাছে তুলনামূলকভাবে পরিচিত স্বাদের মনে হতে পারে।
পাশাপাশি, কে-বিউটি প্রোডাক্ট, যেমন– নানা রকম মাস্ক, সিরাম তরুণীদের স্কিনকেয়ার রুটিনের অংশ হয়ে উঠেছে। অনলাইনেও এসব দেদারসে বিক্রি হচ্ছে।
আর, ঢিলেঢালা টি-শার্ট, বড় সাইজের জ্যাকেটের মতো কে-ড্রামায় দৃশ্যমান ফ্যাশনও এখন তরুণ সমাজের স্টাইলে জায়গা করে নিয়েছে।
কে-ড্রামা ও কে-পপের জনপ্রিয়তার সঙ্গে খাবার, ফ্যাশন ও স্কিনকেয়ারের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশে “বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে চলে আসছে” বলে মনে করেন হোমায়রা হক।
ছবির উৎস, Getty Images
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কোরিয়ান ঢেউ
অনলাইন স্ট্রিমিং ও সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা, কোরিয়ান কনটেন্টের গল্প বলার ধরন এবং তরুণদের বৈশ্বিক ট্রেন্ডের প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
অধ্যাপক মাসউদ ইমরানের মতে, দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কৃতিকে বিশ্বে নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। সরকার পরিবর্তন হলেও দেশটির সাংস্কৃতিক নীতির ধারাবাহিকতায় বড় পরিবর্তন আসে না।
“এটা প্ল্যানের অংশ। অর্গানাইজলি করেছে। যখন থেকে স্বাধীন হয়, তারপর থেকেই পলিসি তৈরি করেছে,” বলেন তিনি।
কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র উৎসব কিংবা গানের প্রতিযোগিতার মতো বিভিন্ন আয়োজনেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে।
তিনি মনে করেন, কোরিয়ান সংস্কৃতির বিস্তার কেবল সরাসরি প্রচারের মাধ্যমে হয়নি।
“ওরা তো বিজ্ঞাপন দেয়নি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলে আসছে। আমাদের ছেলেমেয়েদের জোর করছে না ওরা” উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোরিয়ান কনটেন্টের সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদ বা সাবটাইটেল থাকায় কোরিয়ার ভাষা না জানা দর্শকের পক্ষেও তা গ্রহণ করা সহজ হয়েছে।
অর্থাৎ, তারা নিজেদের ভাষায় কনটেন্ট তৈরি করেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছে।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও কোরিয়ান ভাষা শেখা এবং উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি আগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রে এগুলো ভূমিকা রাখতে বলে মত তার।
