শূন্যে ছোড়া হল বন্দুকের এক গুলি। আর সেই আওয়াজ কানে আসতেই শুরু হয়ে গেল মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো। কোনও ঘোষণা নয়, মাইকের শব্দও নয়—বন্দুকের গর্জনই এখানে সন্ধিপুজো শুরুর সংকেত। বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের কুন্ডলা গ্রামের জমিদারবাড়ির প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো দুর্গাপুজোয় আজও বেঁচে রয়েছে এই অভিনব ঐতিহ্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় তিন শতক আগে জমিদার পরিবারের পূর্বপুরুষ হাঁটুরাম প্রভুরাম কুন্ডলা গ্রামে শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তারপর থেকে বংশপরম্পরায় চলে আসছে সেই পুজো। সময়ের সঙ্গে জমিদারবাড়ির বহু পুরনো স্থাপত্য হারিয়ে গেলেও দুর্গামন্দিরটি এখনও পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। একচালা কাঠামোয় সাবেকি প্রতিমায় একই চালচিত্রের মধ্যে রয়েছেন দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ।

– বিজ্ঞাপন –

পুজোর রীতিতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় চার দিন পরিবারের সদস্যরা নিরামিষ আহার করেন। মূল দুর্গাপুজোয় কোনও পশুবলি হয় না। তবে নবমীর দিন সর্বমঙ্গলা মন্দিরে পৃথক বলির রীতি রয়েছে।

তবে কুন্ডলার এই পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মহাষ্টমীর সন্ধিপুজো। পুজো শুরুর ঠিক আগে জমিদারবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শূন্যে ছোড়া হয় বন্দুকের গুলি। সেই শব্দ পৌঁছে যায় আশপাশের ৮ থেকে ১০টি গ্রামের পুজোমণ্ডপেও। বহু জায়গায় সেই আওয়াজ শোনার পরই সন্ধিপুজো শুরু করার রীতি রয়েছে।

একসময় এই রীতি ছিল আরও জাঁকজমকপূর্ণ। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে সন্ধিপুজোর আগে ১০০ থেকে ১৫০ রাউন্ড পর্যন্ত গুলি ছোড়া হত। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা কমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র একটিতে। তবে গুলির সংখ্যা কমলেও ঐতিহ্যের গুরুত্ব কমেনি।

দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পরিবারের এই রীতি পালন করে আসছেন উত্তরসূরি গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, প্রতি বছর বন্দুকের গুলি চালালেও তাঁর কাছে এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মুহূর্ত।

বিজ্ঞাপন

কুন্ডলা গ্রামে ছোটমা, মেজোমা ও বড়মা—এই তিনটি দুর্গাপুজো রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বন্দুকের গুলির রীতি পালন করা হয় বড়মার মন্দির প্রাঙ্গণেই। পুজো উদ্যোক্তা তথা জমিদার পরিবারের বংশধর গৌতম মুখোপাধ্যায়ের কথায়, প্রায় ৩০০ বছর আগে শুরু হওয়া এই পুজোর নিয়ম আজও যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।

সময় বদলেছে, হারিয়েছে বহু পুরনো রীতি। কিন্তু কুন্ডলায় মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় আজও একটি বন্দুকের গর্জন যেন জানিয়ে দেয়— ঐতিহ্য বদলায়নি, শুরু হল সন্ধিপুজো। সেই এক গুলির শব্দেই প্রতিবছর একসূত্রে বাঁধা পড়ে কুন্ডলা ও আশপাশের গ্রামের শারদোৎসব।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *