স্মিতা দাস

আধুনিক বাঙালি কথাটা ভাবতে গেলে ঠিক যতটা পেছনে যেতে হয় ঠিক সেই সময়টাতে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি সমাজের থেকে দুই শতক আগে ভেবেছিলেন, সমাজের অগ্রগতি কিসে হবে তিনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মানুষ বিদ্যাসাগর। ঈস্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি নিজের অপরিসীম শিক্ষা ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা প্রকাশের জন্য বিদ্যাসাগর যেমন হয়েছেন, তেমনই তাঁর মনে ছিল দয়ার অগাধ সাগর। তাই তিনি ‘দয়ারসাগর’ও হয়েছিলেন। এই দুইয়েই কিন্তু তাঁকে বাঁধা বা ব্যাখযা করা যায় না। তাঁকে বুঝতে হলে জানতে হয় তাঁর জীবনের ছোট্ট ছোট্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু কাহিনি, যেগুলো তাঁকে মেলে ধরে সমাজের সংস্কারক হিসেবেই।

– বিজ্ঞাপন –

বিদ্যাসাগর বাঙালির নীতিশিক্ষা ও সমাজ চেতনার ইতিহাসেও অবিস্মরণীয় একটি নাম। সেই শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় লেখার অক্ষরে আটকে নেই। তিনি তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর আশেপাশের মানুষদের মধ্যেও। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তাঁর জীবনের নানান কাহিনি বাঁক থেকে পাওয়া যায় তেমন অসংখ্য তথ্য। তার মধ্থেযেই একটি হল এই কাহিনিটি।

তখন তিনি কারমাটারে। কারমাটার রেল স্টেশনের ঘটনাটি আজও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঘটনাটি ঘটেছিল তদানীন্তন বিহারের বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের কারমাটার রেলওয়ে স্টেশনে।

সেদিন কারমাটার স্টেশনে তিনি উপস্থিত। স্টেশনে ট্রেন থামলে, ট্রেন থেকে নামলেন এক বাঙালি ডাক্তারবাবু। তাঁর হাতে ছিল সামান্য ছোট্ট একটি ব্যাগ। কিন্তু কালের প্রভাবে বাঙালি বাবু প্রকৃত অর্থেই তৎকালীন বাবু সংস্কৃতির দাহ্রক ও বাহক। অহংকার ও আভিজাত্যবোধের কারণে নিজের হাতে সেই ব্যাগ বহন করতে তাঁর সম্মানে বাঁঢছিল। তাই তিনি ট্রেন থেকে নেমেই ‘কুলি কুলি’ বলে চিৎকার করতে শুরু করেন।

কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই সময় স্টেশনে কোনো কুলি ছিল না। সাধারণ ধুতি ও চাদর পরিহিত বিদ্যাসাগর মহাশয় সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। তাই কুলির অভাব দেখে এবং অন্য দিকে আগত ডাক্তারবাবুর চিৎকার ও অসহায়তা দেখে বিদ্যাসাগর নিজেই এগিয়ে গেলেন, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করলেন না এবং নিজের পরিচয়ও প্রকাশ করলেন না। তিনি হাসিমুখে ডাক্তারবাবুর ব্যাগটি নিজের হাতে তুলে নিলেন এবং স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তারবাবুর পাল্কিতে পৌঁছে দিলেন।

বিজ্ঞাপন

এই অবস্থায় কুলি তাঁর কাজ সম্পন্ন করেছে ধরে নিয়ে, কারমাটরে নবাগত ওই চিকিৎসক যখন পারিশ্রমিক হিসেবে পয়সা দিতে যান, ঠিক তখন বিদ্যাসাগর বলেন—“পয়সা দিতে হবে না। আমি ঠিক কুলি নই। এত ছোট ব্যাগ নিয়ে আপনি বিপদে পড়েছিলেন দেখে আমি আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলাম। আমার নাম ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা।”

এই অবস্থায় পড়ে মাথা নত হয়ে গেল সেই চিকিৎসক বাবুর। নিজের সামনে বাংলার প্রবাদপ্রতিম প্রধান পণ্ডিত তথা মহান ব্যক্তিত্বকে দেখে তিনি চরম লজ্জায় মাথা নত করে নিলেন। এরপর নিজের অহংকারের জন্য তিনি বিদ্যাসাগরের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, এরপর থেকে তিনি নিজের কাজ নিজের হাতেই করবেন।

এই রকম একাধিক ঘটোনাই জানা যায় বিদ্যাসাগরের জীবনের ভবিভিন্ন পদক্ষেপে, যেখানে তিনি হাসির ছলে, সূক্ষ্ম মনন শীলতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে নিজের রসিক মনটি যেমন তুলে ধরেছেন, তেমন ওই ছোট্ট ছোট্ট মজার মাধ্যমে সমাজকে বড়ো বড়ো শীক্ষাও দিয়েছেন যা জনমানসে আদর্শ চরিতে গঠনের ক্ষেত্রে পাথেয় হতে পারে। ২০৬তম জন্ম জয়ন্তীতে খবর অনলাইনের বিশেষ শ্রদ্ধা।




Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *