তপন মল্লিক চৌধুরী

তখন চিৎপুর এলাকায় বটতলার বই ছাপা হত। তারপর সেই বই ফেরিয়ালা মারফত পৌঁছে যেত ক্রেতা বা পাঠকের কাছে। সেই সময় বিদ্যাসাগর ভাবলেন, নিজেদের বই নিজেদের মতো করে ছাপতে হবে। সঙ্গী হলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার। কিন্তু ছাপাখানা খুলতে দরকার প্রায় ছশো টাকা। অত টাকা কোথায় পাবেন, কে দেবেন। শেষমেশ ধার করলেন বন্ধু নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। আর সেই টাকায় অবশেষে একটা ছাপাখানা হল। নাম দিলেন ‘সংস্কৃত যন্ত্র’। গৌতম বসুমল্লিকের (৯ই জুন, ২০১১) তথ্য অনুযায়ী, এই ছাপাখানাটির সেই সময়কার ঠিকানা হল ৬৩, আমহার্স্ট স্ট্রিট। তিনি এ-ও জানিয়েছেন যে, এই বাড়িটিতে বিদ্যাসাগর নিজেও বেশ কিছুদিন ছিলেন।
ছাপাখানা তো হল, কিন্তু মাথায় ঋণের বোঝা, অতএব ধার করা টাকা শোধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বিদ্যাসাগর। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি হাজির হলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের মার্শাল সাহেবের কাছে। তাঁকে গিয়ে বললেন, একটি ছাপাখানা খুলেছি, আপনার যদি কিছু ছাপানোর দরকার হয়, আমাদের বলবেন। মার্শাল সাহেব বিদ্যাসাগরকে ছাপার কাজ দিয়েছিলেন। ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ তখন ছাপাই ছিল, কিন্তু ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পড়ুয়াদের ‘অন্নদামঙ্গল’ যে বইটি পড়ানো হত, তার কাগজের মান যেমন খারাপ, তেমনি খারাপ ছাপা ও বাঁধাই। এ ছাড়া ভুলভ্রান্তিও ছিল প্রচুর। বিদ্যাসাগর ‘অন্নদামঙ্গল’ ছাপতে রাজি হওয়ায় মার্শাল সাহেব কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি থেকে আদি ‘অন্নদামঙ্গল’-এর পুঁথি আনিয়ে বিদ্যাসাগরকে দিলেন। বিদ্যাসাগর আর মদনমোহন সেটি ছাপলেন।
তাঁরা অন্নদামঙ্গলের প্রতি কপির দাম রাখলেন ছ’টাকা। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ একশো কপি বই কিনে নেয়। মার্শাল সাহেব বিদ্যাসাগরের হাতে ছ’শো টাকা তুলে দেন। ওই টাকায় নীলমাধবের ধার শোধ হয়ে গেল। ‘অন্নদামঙ্গল’-এর বাকি কপি বিক্রির টাকা রাখা হল প্রেসের উন্নতির জন্য। এরপর সাহিত্য, ন্যায়, দর্শনের নানা বই ছাপতে লাগলেন বিদ্যাসাগর। আর ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ সেই বই কিনতে লাগল। ক্রমে বিদ্যাসাগর আর মদনমোহনের ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ ফুলে-ফেঁপে উঠল।
সংস্কৃত প্রেস থেকে সিলেবাসের বইই বেশি ছাপতেন বিদ্যাসাগর। সেই সব বইয়ের বেশির ভাগই বিক্রি হত কলেজ স্ট্রিটে। কিন্তু কলেজ স্ট্রিট তখন মোটেই বইপাড়া নয়, তখন সেখানে কোনও বইয়ের দোকানও ছিল না। সংস্কৃত যন্ত্র বা প্রেসের যেহেতু প্রকাশনার কাজও ছিল, তাই মুদ্রণযন্ত্র বা মেশিনঘরের পাশের ঘরে একটি বই রাখার বা ডিপজিটরি খোলার পর ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থার নামকরণ হয় সংস্কৃত প্রেস অ্যান্ড ডিপজিটরি। পরবর্তী কালে ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থাটি বিপণিকেন্দ্রে পরিণত হয়। কারণ, সংস্কৃত যন্ত্র ছাড়াও অন্য সংস্থা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত বই, বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তক, এই ডিপজিটরিতে রাখা হত। হিসাব অনুযায়ী, ১৮৫৫ সাল নাগাদ সংস্কৃত যন্ত্রের বইয়ের ব্যবসা থেকে মাসে অন্তত হাজার তিনেক টাকা আয় হত বিদ্যাসাগরের। ১৮৫৭-৫৮ সালে কলকাতার ছেচল্লিশটি প্রেস থেকে যে ৫৭১৬৭০ কপি বাংলা বই ছেপে বেরিয়েছিল, তার মধ্যে সংস্কৃত প্রেস থেকে ছাপা বই ছিল ৮৪২২০টি। ওই সময়ে এক বছরে বিদ্যাসাগরের বইয়ের ২৭টি সংস্করণ বেরিয়েছিল।
তবে বইয়ের ব্যবসা শুরু করেও বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ ও নানা রকম সমাজ সংস্কারের কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকতেন। পাশাপাশি বই লিখতেন, মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন ও অন্যান্য বিদ্যালয়ের দায়িত্ব সামলাতেন। কাজেই প্রেস ও ডিপজিটরির কাজ নিজে দেখার সময় পেতেন খুব কম। সেই সুযোগ যে কর্মচারীরা পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। ফলে বিশৃঙ্খলা ধীরে ধীরে চরম আকার ধারণ করে। এদিকে বিধবাবিবাহ দিতে গিয়ে তিনি ঋণের ভারে জর্জরিত। ঋণের আর একটি কারণ হল, ১৮৬৬-৬৭ সালের দুর্ভিক্ষে বীরসিংহ ও বর্ধমানে বিদ্যাসাগর নিজের খরচে অন্নসত্র খুলেছিলেন। তাই ১৮৬৯ সালে মাত্র আট হাজার টাকায় প্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ বিক্রি করে দিতে বাধ্য হলেন। আর বুক ডিপজিটরি দশ হাজার টাকার বিনিময়ে দান করে দিলেন কৃষ্ণনগরের ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়কে। আরও অনেক বেশি টাকায় সেই ডিপজিটরি কিনে নেওয়ার লোক তখনও অনেক ছিল। তা করলে বিদ্যাসাগরের বিপুল ঋণের বোঝা বেশ কিছুটা লাঘব হতে পারত। কিন্তু তা তিনি করলেন না। তখন তাঁর মন যে অত্যন্ত বিষণ্ণ।
অথচ বইয়ের ব্যবসা থেকে তখনই তাঁর প্রতি মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা আয় হচ্ছিল। এই সাফল্যে অনেকেই অভিযোগ তুলে বলেন, বিদ্যাসাগর শিক্ষাব্যবস্থায় উঁচু পদে থাকার ফায়দা তুলেছেন! এক দিকে তিনি বাংলা শিক্ষা প্রসারের জন্য কী ধরনের বই পাঠ্য হবে, তার পরামর্শদাতা, আবার তিনি নিজেই পাঠ্যবইয়ের প্রকাশক ও লেখক। তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পঁয়ত্রিশ বছরে বর্ণপরিচয়ের ১৫১টি সংস্করণ হয়েছিল! শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর গর্ডন ইয়ং ছোটলাটের কাছে নালিশ করেন, বিদ্যাসাগর সরকারি খামে নিজের লেখা বই অন্যত্র পাঠিয়েছেন। এ নিয়ে ইয়ং-এর সঙ্গে বিদ্যাসাগরের মতবিরোধ হয়েছে। বিদ্যাসাগরের প্রকাশনার বইগুলির দাম ছিল চড়া, তা সত্ত্বেও সেই দাম বাড়ানো হয়েছিল।
ইয়ং-এর বক্তব্য, শিক্ষা বিস্তারের জন্য কম দামে বই দিতে গেলে মুনাফা-লোভী সংগঠনের বদলে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’-র কম দামি বই নিতে হবে। বিদ্যাসাগর তা মানেননি। বিদ্যাসাগর গ্রামের বাড়িতে ইনকাম ট্যাক্স অফিসারকে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছিলেন, এমন অভিযোগও উঠেছিল। এমনকি তাঁর ছাপাখানা ব্যবসার সঙ্গী ও বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের মৃত্যুর পর তাঁর জামাই যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ বিদ্যাসাগরকে উকিলের চিঠি পাঠান। তাঁর অভিযোগ, বিদ্যাসাগর ‘শিশুশিক্ষা’-র কপিরাইটের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগ খণ্ডন করতে বিদ্যাসাগর ‘নিষ্কৃতিলাভপ্রয়াস’ নামে একটি পুস্তিকা লিখেছিলেন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *