ছবির উৎস, Fotograzia via Getty Images
-
- Author, লেবো ডিসেকো
- Role, গ্লোবাল রিলিজিয়ন করেসপন্ডেন্ট, বিবিসি নিউজ ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
-
Published
-
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
“এআই শেষযুগে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে।”
এটা মানবজাতির সামনে আসন্ন হুমকি নিয়ে সতর্ক করা প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ আরেকজন বড় ব্যক্তির কথা নয়। এই মন্তব্য করেছিলেন আটলান্টাভিত্তিক অত্যন্ত প্রভাবশালী পাদরি ফিলিপ অ্যান্থনি মিশেল।
“শেষযুগ” বলতে তিনি পৃথিবীর শেষকে বোঝাচ্ছেন।
আর এখন, মিশেলের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর এক বছরেরও বেশি সময় পরে টিকটক, পডকাস্ট থেকে শুরু করে প্রকাশনা জগৎ পর্যন্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আরও অনেক প্রভাবশালী খ্রিস্টানও আলোচনা করছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবী ধ্বংসের অনুঘটক হতে পারে কি না।
“এআই কি শেষযুগের ঘটনার অংশ হতে পারে?” প্রশ্ন করেন মেগাচার্চের পাদরি গ্রেগ লৌরি।
“এটা খুবই সম্ভব।”
এদিকে পাদরি মাইক সাইনোরেল্লি একটি পডকাস্টের শ্রোতাদের সতর্ক করে বলেন, “খ্রিস্টবিরোধিতাকে প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এটি।”
এই সব পাদরিই স্বীকার করেন যে এআই ভালো কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তারা একইসঙ্গে সতর্ক করেন, খ্রিস্টবিরোধী, অর্থাৎ শয়তানের প্রতিনিধি, এটিকে ব্যবহার করে মানুষকে ঈশ্বরের পরিবর্তে তার উপাসনায় প্ররোচিত করতে পারে।
খ্রিস্টধর্মে “শেষযুগ” বলতে পৃথিবীর শেষ দিনগুলো সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে বোঝানো হয়।খ্রিস্টবিরোধীকে ঈশ্বরের শত্রু হিসেবে দেখা হয়, যে ক্ষমতা দখল করে এবং পরে যিশুখ্রিস্টের হাতে যুদ্ধে পরাজিত হয়।
এই ধারণাগুলোর অনেকটাই এসেছে বাইবেলের শেষ গ্রন্থ, ‘বুক অফ রেভেলেইশান’ থেকে।
এটিতে প্রাণবন্ত ও ভীতিকর চিত্রকল্প রয়েছে, যার মধ্যে আছে “সমুদ্র থেকে উঠে আসা জন্তু”, যার সাতটি মাথা ও ১০টি শিং রয়েছে, যা খ্রিস্টবিরোধীর প্রতীক বলে মনে করা হয়।
অনেক খ্রিস্টান রেভেলেইশান-কে রূপক হিসেবে দেখেন।
কেউ কেউ বলেন এটি প্রাথমিক চার্চের ওপর রোমান সাম্রাজ্যের নিপীড়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে অন্যরা এটিকে ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বিবেচনা করেন।
আর তাদের কেউ কেউ বলেন, এআই হচ্ছে এই গ্রন্থের “দ্বিতীয় জন্তু”, একটি “মিথ্যা নবী”, যা মানবজাতিকে খ্রিস্টবিরোধিতার বন্দনায় প্ররোচিত করে, কিংবা এটি নিজেই খ্রিস্টবিরোধী।
ছবির উৎস, DeAgostini/Getty Images
নিঃসন্দেহে এআই বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে, আর এর ক্ষমতা ও সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা সংস্থা অ্যানথ্রোপিক-এর সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সটনের “অদূর ভবিষ্যতেই আমরা সবাই মারা যেতে পারি” মন্তব্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের উন্নয়নের গতি কমানো না হলে ঝুঁকির সতর্কবার্তা পর্যন্ত এই উদ্বেগের বিস্তার দেখা যায়।
সেইন্ট জন’স স্কুল অফ থিয়োলজি অ্যান্ড সেমিনারি-এর অধ্যাপক নোরিন হার্জফেল্ড, যিনি এআই ও প্রযুক্তি নৈতিকতা নিয়ে কাজ করেন, তিনি বলেন, “বড় ধরনের পরিবর্তনের সময়ে শেষযুগ-সংক্রান্ত আলোচনা বিকশিত হয়।”
“এটি মানুষকে সামাজিক চাপ বুঝতে সাহায্য করে, অনুভব করতে সাহায্য করে যে সবকিছু এলোমেলো নয়, বরং ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ।”
হার্জফেল্ড-এর মতে, চাকরিক্ষেত্রে এআই-এর প্রভাব অনেকটা শিল্পবিপ্লবের মতো, যা ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, “আমরা দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে বাস করছি।”
“এবং আমরা দেখছি কম্পিউটার প্রযুক্তি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।
“আমাদের বলা হচ্ছে, এই প্রযুক্তি চাকরি নিয়ে নেবে, সবকিছু বদলে দেবে, সবকিছুকে বিপ্লবীভাবে রূপান্তর করবে। এ ধরনের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জন্য খুবই কঠিন।”
এখানে নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতিও রয়েছে। পছন্দ হোক বা না হোক, এআই এখন আমাদের অধিকাংশের জীবনের অংশ। এর সঙ্গে রয়েছে সিলিকন ভ্যালি থেকে আসা সতর্কবার্তা, যেখানে বলা হচ্ছে “এআই আমাদের সবাইকে ধ্বংস করবে এমন সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বা ১৫ শতাংশ”।
“যদি মানুষ অনুভব করতে পারে যে ঈশ্বর এখনও নিয়ন্ত্রণে আছেন, এখনও এর একটি উদ্দেশ্য আছে, এটি পূর্বনির্ধারিত ছিল, তাহলে তারা বলতে পারে, ‘আমি এই মুহূর্তের মুখোমুখি কীভাবে হতে চাই? আমি কী করব? আমি কীভাবে নিজেকে অশুভের বদলে শুভের পক্ষে অবস্থান করাব’?”
ছবির উৎস, Daniel Boczarski/Getty Images
২০২২ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বিশ্বাস করেন যে আমরা শেষযুগে বাস করছি।
খ্রিস্টানদের মধ্যে এই হার বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দশকের পর দশক ধরে এই বিষয়টি পুনরাবৃত্ত হয়েছে, যেখানে সমসাময়িক উদ্বেগকে খ্রিস্টবিরোধীর চরিত্রের ওপর আরোপ করা হয়েছে।
নর্থ ক্যারোলাইনার ইলন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেফরি সি পিউ বলেন, “আমার দাদী মনে করতেন ফাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট-ই খ্রিস্টবিরোধী।”
মহামন্দার সময়, যখন ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য বিরাজ করছিল, তখন রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তার সমাধান, নিউ ডিল- ছিল অনেকের কাছে বিপ্লবাত্মক।
পিউ বলেন, তার দাদীর এই ধারণা “বর্তমান ঘটনাকে একটি নির্দিষ্ট বাইবেলীয় বর্ণনার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টার অযৌক্তিকতাকে তুলে ধরে”।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রে শেষযুগ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতা, এটি ১৯৬০-এর দশকে নতুন গতি পায়।
পিউ বলেন, “সেটি ছিল একটি বিশেষ সামাজিক অস্থিরতার সময়।”
“আমরা দুইজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার শিকার হতে দেখেছি, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে ধরলে তিনজন। আমরা এমন শহর দেখেছি যেগুলো শ্বেতাঙ্গদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষোভে জ্বলছিল। আমরা এমন এক প্রজন্মের তরুণদের দেখেছি, যারা আগে কখনও না দেখা উপায়ে নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করেছিল,” যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন থেকে যুব প্রতিসংস্কৃতি পর্যন্ত।
‘ভীতিকর প্রযুক্তি’
এরপর ১৯৭০-এর দশকে ‘দ্য লেইট গ্রেট প্ল্যানেট আর্থ’ বইটি জনপ্রিয়তা পায়, যা সমসাময়িক ঘটনা ও ভূরাজনীতির সঙ্গে শেষযুগ-সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।
পিউ বলেন, “সেই সময় থেকে প্রতিটি সামাজিক অস্থিরতাকেই শেষযুগের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হতে থাকে।”
শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কমিউনিজমকে খ্রিস্টবিরোধী হিসেবে দেখা হতো।
৯/১১ হামলার পর, কিছু খ্রিস্টানের কাছে ইসলাম সেই ভূমিকায় আবির্ভূত হয়।
ড. পিউ যোগ করেন, “আপনি যে যুগেই থাকুন না কেন, সেই যুগের ভয়গুলো প্রায়ই এই শেষযুগ-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর ওপর প্রতিফলিত হয়।”
‘মেইড ইন আওয়ার ইমেইজ: গড, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অ্যান্ড ইউ’ বইয়ের লেখক অস্ট্রেলীয় পাদরি স্টিফেন ড্রিস্কল নিশ্চিত নন যে খ্রিস্টবিরোধী আসলে কে বা কী।
তার মতে, এআই “মানবজাতির তৈরি সবচেয়ে ভীতিকর প্রযুক্তিগুলোর একটি” এবং এটি একটি “যৌক্তিক সম্ভাব্য প্রার্থী”।
তবে ভবিষ্যৎ অনুমান করতে বাইবেল ব্যবহার করা খুব একটা সহায়ক নয়।
ড্রিস্কল বলেন, “খ্রিস্টবিরোধী কে, তা নিয়ে অনুমানের চেয়েও বাইবেলের দেওয়ার মতো আরও অনেক কিছু আছে।”
এটি “পরিবর্তনের জন্য আমাদের প্রস্তুত করে, কাজ সম্পর্কে একটি ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দেয় এবং এআই অ্যালাইনমেন্ট সম্পর্কে বাস্তববাদী হওয়ার উপায় দেয়।”
‘ঈশ্বরের আনুগত্য করুন’
পুরাতন নিয়মে “ধান মাড়াইয়ের স্লেজ ও নানান কৃষি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন” নিয়ে আলোচনা আছে এবং সেখানে বলা হয়েছে “এসবই প্রভুর কাছ থেকে এসেছে”।
“ঈশ্বর প্রযুক্তিগত প্রজ্ঞার ঈশ্বর”, যিনি “পাথর, ব্রোঞ্জ, লোহা, ইস্পাত, পারমাণবিক যুগ থেকে এআই যুগ পর্যন্ত প্রতিটি প্রযুক্তিগত সময়ের” ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
ড্রিস্কল বলেন, পুরাতন নিয়মে নির্বাসিত ড্যানিয়েল বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারকারী একাধিক সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করেন।
তিনি “সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না বা আসন্ন সাম্রাজ্যগুলোকে থামাতে পারেন না, এমনকি যদি তারা বিপর্যয় নিয়ে আসে”।
“কিন্তু তিনি বিশ্বস্ত, আশাবাদী থাকতে পারেন, ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারেন, মানুষকে ভালোবাসতে পারেন এবং যেখানেই থাকুন না কেন ঈশ্বরের আনুগত্য করতে পারেন।
“তিনি সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, কিন্তু ভালোভাবে বাঁচতে পারেন।”
তাই আমরা পৃথিবীর শেষের মুখোমুখি হচ্ছি কি না, শেষ পর্যন্ত সবকিছু সর্বোত্তমভাবেই সম্পন্ন হবে।
ড্রিস্কল বলেন, “যা কিছু ঘটে তার সবই ভালো নয়,” তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “ঈশ্বর ভালো, এবং তিনিই নিয়ন্ত্রণে আছেন।”
