তপন মল্লিক চৌধুরী 

দেশের নির্বাচন কমিশন আজ সবচেয়ে ধিক্কৃত, নিন্দিত ও কলঙ্কিত সংস্থা — যার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সর্বকালের তলানিতে। গত ৩০-৪০ বছরের মধ্যে ভারতের নির্বাচন কমিশনের উপর দেশবাসীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা এত তলানিতে কখনও নামেনি। আজ পর্যন্ত কোনো সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে এত সন্দেহ, সমালোচনার তির ছুটে আসেনি।

– বিজ্ঞাপন –

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে — এরা ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকার, আরও নির্দিষ্টভাবে বিজেপির স্বার্থেই শুধু কাজ করেনি, বিগত লোকসভা নির্বাচনে এমন বহু আসনের ফলাফল বিজেপি-এনডিএর দিকে ঘুরিয়ে মোদী সরকারকে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় বসাতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে ভোট ফর ডেমোক্র্যাসির একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, ভোটের দিন প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত ভোটদানের হিসাব এবং পরে প্রকাশিত চূড়ান্ত হিসাবের মধ্যে মোট ৪ কোটি ৬৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৮৮৫ ভোটের পার্থক্য ছিল। ওই রিপোর্টের বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, এই অতিরিক্ত ভোটের প্রভাব ৭৯টি লোকসভা আসনের ফলাফলে পড়ে থাকতে পারে। রিপোর্টে ১৫টি রাজ্যের বিভিন্ন আসনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। হঠাৎ ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে।

শুধু ২০২৪ নয়, ২০১৯-এর সাধারণ নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী দাসের গবেষণাপত্রে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে electoral manipulation-এর বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। তাঁর গবেষণায় ঘনিষ্ঠ লড়াইয়ের আসনে বিজেপির সাফল্য, ভোটার তালিকা এবং ভোটদানের বিভিন্ন পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সেই গবেষণা প্রকাশের পর অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৩ সালে সব্যসাচী দাস পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের প্রতিবাদে অধ্যাপক পুলাপ্রে বালাকৃষ্ণনও পদত্যাগ করেন। 

অতীতে অপরাধী, বাহুবলী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দাপট দেখালেও নির্বাচন কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাত—এমনটাই ছিল সাধারণ ধারণা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা বলতে হচ্ছে, বর্তমান ইসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি সেই সাংবিধানিক সংস্থার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, সততা ও দক্ষতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থার জায়গা থেকে এতটা দূরে চলে গেল? 

বিজ্ঞাপন

কীভাবে ইসি বিজেপির স্বার্থে বিরোধী দলের ভোটার, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে, নির্বিচারে বাদ দিয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। যাদের কিছুতেই বাদ দেওয়া গেল না, ভোটের সময় কীভাবে তাঁদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা হল, তারও বিভিন্ন অভিযোগ ও নথি সামনে এসেছে। শুধু সংখ্যালঘুই নয়, যাঁদের বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক বলে মনে করা হয়েছে, সেই সমস্ত হিন্দু ভোটারের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরেও এই অভিযোগ সামনে এসেছিল। 

আর আজ যখন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR চলছে, তখন সেই প্রশ্ন আরও ভয়াবহ হয়ে সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে SIR-এর ফলে ১৩ কোটির বেশি নাম খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অবশ্য কমিশনের বক্তব্য, এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটারদের নামও রয়েছে। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ায় ভোটারদের অধিকার এবং গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই। 

আর ঠিক এই সময়েই দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি ক্ষেত্রে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকি এক দিনেই চারটি সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। Form 6-এ পরিবর্তন, ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ দিল্লিতে কেন্দ্রীভূত করা, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে আপিল এবং গোয়ায় যোগ্য ভোটারদের নাম তালিকাভুক্ত না করার মতো বিষয় নিয়েও আপত্তি উঠেছিল। 

কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই আপত্তির কী হল?

প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, কমিশনে আলোচনা চলাকালে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু SIR-সহ কমিশনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত তিন নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, এটি একটি বহু-সদস্যবিশিষ্ট সাংবিধানিক সংস্থা এবং ভিন্নমত বা মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ারই অংশ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন কমিশনের এই ব্যাখ্যাকে আদৌ আমল দিতে নারাজ। বরং একের পর এক নেতা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী অনেক আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনের ‘ভোট চুরি’ নিয়ে সরব ছিলেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি বলেন, “ভোট চুরি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে ঘটা এক অপরাধ। এটা আমাদের সংবিধানের ওপর সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস ও নির্বাচন কমিশন এই ভোট চুরি করেছে। তারা দেশদ্রোহী। তাদের বিচার হবেই।”

আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও ছেড়ে দেননি। সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার নিজের ইচ্ছেমতো নির্বাচন কমিশনকে পরিচালনা করছেন।” তাঁর দাবি, অবিলম্বে জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা রুজু করা হোক। SIR প্রক্রিয়া বাতিল করা হোক এবং দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড়ের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন বাতিল করে পুরনো তালিকা অনুযায়ী নির্বাচন হোক। বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারাও প্রায় একই ধরনের দাবি তুলেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর দাবি, এমনটা যে হবে, সেই আশঙ্কা তাঁরাই প্রথম প্রকাশ করেছিলেন। সে কারণেই জ্ঞানেশ কুমারের ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকার কারণেই বিজেপি ২০২৪ সালের ভোটে জিতেছে। পরের দু’বছর যত ভোট হয়েছে, প্রতিটিতেই কমিশনের দৌলতে তারা জয় পেয়েছে। ২০২৬ সালেও পশ্চিমবঙ্গে ভোট লুট করে জিতেছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।

মমতার দাবি, যেসব ভোটারের নাম বাদ গেছে, তাঁদের আবার তালিকাভুক্ত করতে হবে। যে রাজ্যে বিজেপি জিতেছে, সেখানে পুরনো ভোটার তালিকা অনুযায়ী ভোট করাতে হবে। তিনি বলেছেন, “জ্ঞানেশ কুমার যতক্ষণ সিইসি পদে বহাল থাকবেন, ততক্ষণ ভারতজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলবে। তাঁকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো প্রয়োজন।” মমতা আরও বলেন, “এই পদটি তাঁর মতো কোনও ব্যক্তির জন্য নয়। এটা স্বাধীনতার জন্য আরেকটি লড়াই, এবার এই আপসকারী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং ভারতকে ধ্বংস করে দেওয়া বিজেপির হাত থেকে মুক্তির লড়াই।” এগুলি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অভিযোগ ও বক্তব্য হিসেবেই উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে আগেই বলেছিলেন, জ্ঞানেশ কুমার নিরপেক্ষ নন। তাঁর উচিত সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেওয়া। সেই দলেরই অন্য নেতা সৌরভ দাস বলেন, প্রমাণিত হয়ে গেছে, নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি আপসকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ভোট দেওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন সেই অধিকার হরণ করেছে বলে তাঁর অভিযোগ। সৌরভ বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার দেশের জনগণের এক নম্বর শত্রু। তিনি প্রকৃত দেশবিরোধী।”

প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বালও অনেকের মতো জ্ঞানেশের অপসারণ দাবি করে বলেছেন, অবিলম্বে এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করা দরকার। এই প্রক্রিয়ার দরুন এখনই ১৩ কোটি ভোটারের নাম কাটা গেছে। কমিশনের বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। 

এই ১৩ কোটি নামকে স্থায়ীভাবে ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে—এমন অর্থ নয়; এটি বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের হিসাব। কমিশনের প্রক্রিয়ায় আপিল ও যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। 

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যদি দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি একের পর এক এত গুরুতর অভিযোগ তোলে, যদি সেই প্রতিষ্ঠানের অন্দরেই দুই কমিশনার লিখিতভাবে ১৪ বার আপত্তি জানান, যদি কোটি কোটি ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে এবং সেই প্রক্রিয়া নিয়ে এত প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ আস্থা রাখবে কোথায়? 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *