ছবির উৎস, Bloomberg via Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে, যার মাধ্যমে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আরাঘচি বলেন, “প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হলে” এটি করা সম্ভব। তিনি জানান, ওই শর্তগুলো জুন মাসে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, “এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর”।
ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে এক মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। এসব আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যুও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরব উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর হামলা চালায়। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হতো। প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা দিয়েছে।
ফলে সংঘাতের অবসান ঘটানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপও বেড়েছে, বিশেষ করে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে থাকায়।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
আরাঘচি সাংবাদিকদের বলেছেন, “প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হলে প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু করা সাত দিনের মধ্যেই সম্ভব”।
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ঠিক কী পদক্ষেপ চায়, তা তিনি বিস্তারিত জানাননি। তবে তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে যে পদক্ষেপ নিতে হবে, সেগুলো নতুন কিছু নয়। এগুলো সবই সমঝোতা স্মারকে আগে থেকেই আছে”।
তিনি আরও বলেন, “আমি বলতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যদি চুক্তিতে পৌঁছানোর এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সত্যিকারের আগ্রহ থাকে, তাহলে সবকিছু এখনই প্রস্তুত রয়েছে”।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, “হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র খুব শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তাই আমাদের তাড়াহুড়ো নেই”।

চৌদ্দ দফার ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এতে আরও বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা ‘সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান বন্ধ করবে।
চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো বিষয়ও ছিল।
এতে আরও বলা হয়েছিল, ইরান ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ চালিয়ে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে এবং ভবিষ্যৎ নৌপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে।
তবে কিছুদিন পরই উভয় পক্ষ আবার হামলা শুরু করায় চুক্তিটি ভেঙে যায়।
ইরান এমন কিছু জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো তাদের দাবি অনুযায়ী অনুমতি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনার ওপর হামলা চালিয়েছে এবং ইরানের উপকূলের কাছে থাকা ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা করেছে। পাশাপাশি তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধও বজায় রেখেছে, যার ফলে ইরানের অর্থনীতিতে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে।
এরপর ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল বের করে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। তবে কিছু দিনে এই সংখ্যা মাত্র ৯টিতে নেমে এসেছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত পণ্যবাজার ও বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলার এই তথ্য দিয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
এদিকে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথিরা সম্প্রতি লোহিত সাগরের অপর প্রান্তে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যাহত করার লক্ষ্যে হামলা আরও জোরদার করেছে।
চলতি মাসে হুথিরা দ্রুত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে লোহিত সাগরের উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করেছে। এর মধ্যে মোকা বন্দরও রয়েছে, যা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতে হুথিদের হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মনে করেন নভেম্বরে নির্বাচনের পরপরই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে, যে চুক্তি এখন পর্যন্ত তার নাগালের বাইরে রয়েছে।
তিনি বলেন, “ইরানের সঙ্গে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যা তাদের আবার ঘুরে দাঁড়ানোর এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী দেশ গড়ার সুযোগ দেবে? নাকি আমি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেব এবং দ্রুত তা করব, তাদের আবার মানুষ ও দেশগুলোকে হত্যা ও ধ্বংস করার সুযোগ না দিয়ে আমি কি তাদের নরকে পাঠিয়ে দেব?”
শুক্রবার আরাঘচি বলেন, ইরান “জবরদস্তি, হুমকি বা ভয় দেখানো” মেনে নেয় না। তিনি আরও বলেন, “ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না”।
