তপন মল্লিক চৌধুরী
আজ থেকে ৫০ বছর—বেশিও হতে পারে—আগের ঘটনা। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের আইল অব ওয়াইট দ্বীপে টানা প্রায় পাঁচ দিন ধরে চলছে সঙ্গীত উৎসব। হাজার হাজার গানপাগলের ভিড়ে গিটার নিয়ে গান গেয়ে চলেছেন নানা দেশের অসংখ্য শিল্পী। পপ, জ্যাজ, রক, ফোক, কান্ট্রি—পাশ্চাত্য গানের যত ধরন হতে পারে, সবই পরিবেশিত হয়ে চলেছে সেই মিউজিক ফেস্টিভ্যালে।
– বিজ্ঞাপন –
এক, দুই, তিন, চার রাত পেরিয়ে পঞ্চম ও শেষ রাত হাজির। ওই রাত পেরোলেই যবনিকা নামবে। কিন্তু ইতিমধ্যে খোলা আকাশের নিচে জড়ো হয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। অপেক্ষা করছেন, কখন মঞ্চে আসবেন প্রিয় গায়ক। রাত বারোটা তো বেজেই গেছে, একটা, দুটোও বেজে গেল…। ধৈর্য কমছে, বিরক্তির পারদ চড়ছে। শ্রোতারা ক্রমে ক্রমে উত্তেজিত হচ্ছেন। গানবাজনা চলছে ঠিকই, কিন্তু শ্রোতাদের গুঞ্জন ধীরে ধীরে হট্টগোলে পরিণত হচ্ছে।
অবশেষে সমস্ত উত্তেজনার পারদ এক ধাক্কায় নিচে নামিয়ে তিনি মঞ্চে উপস্থিত হলেন ভোর চারটের সময়। গিটারে সুর তুললেন— “Ah, they’ll never, they’ll never ever reach the moon…”। বিষাদমাখা সেই সুর ছড়িয়ে গেল ভোররাতের আধো আলো-আধো অন্ধকারে। আর লক্ষ লক্ষ ধৈর্যহারা, প্রবল উত্তেজিত শ্রোতা নিমেষে যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন মায়াবী সুরের নেশায়।
১৯৭০ সালের আইল অব ওয়াইট ফেস্টিভ্যালে লিওনার্ড কোহেনের ভোররাতের সেই পরিবেশনা আজও কিংবদন্তি। বিভিন্ন সূত্রে দর্শকসংখ্যার হিসাব আলাদা হলেও কয়েক লক্ষ মানুষের সামনে তাঁর সেই পরিবেশনার কথা বারবার ফিরে এসেছে।
দুঃখের সাগরে ডুব দিয়ে যিনি সুরের মুক্তো খুঁজে আনতেন। দূর আকাশের মেঘমালায় ভেসে গিয়ে তিনি নিয়ে আসতেন গানের মণি-মাণিক্য। তাঁর মতো আর কেউ কী লিখতে পারেন, তাঁর মতো আর কেউ কী গাইতে পারেন—বিষাদগাথা!
বিজ্ঞাপন
সেই ‘বিষাদবিধুর গানের সম্রাট’ লিওনার্ড কোহেন সব বিষাদ পেরিয়ে ঘুমের দেশে। সঙ্গীতের মহাকাশ কিছুক্ষণের জন্য হলেও অমানিশায় ছেয়ে গিয়েছিল, যেদিন ধূসর-নীলাভ নক্ষত্রটি সৌরমণ্ডল থেকে ঝরে পড়েছিল।
কানাডীয় কবি, সুরকার ও গায়ক লিওনার্ড কোহেন অবশ্য বরাবরই চেয়েছিলেন লেখক হতে। ছাত্রাবস্থায় তাঁকে যে কোনও গায়কের তুলনায় ঢের বেশি প্রভাবিত করত ডব্লিউ. বি. ইয়েটস ও লোরকার মতো কবি এবং তাঁদের কবিতা। পড়তে ভালো লাগত ওয়াল্ট হুইটম্যান, হেনরি মিলারের লেখা। বিশেষ করে প্রভাবিত ছিলেন তাঁর শিক্ষক ও বন্ধু আরভিং লেটনের দ্বারা।
কিশোর বয়সে গিটার বাজানো শিখে তৈরি করেছিলেন লোকসংগীতের দল ‘বাকস্কিন বয়েজ’। লোরকার কবিতার সঙ্গে পরিচয় তাঁর সৃষ্টিশীল জগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর শহর থেকে দূরে গিয়ে গ্রিক দ্বীপ হাইড্রায় বাড়ি কেনেন কোহেন। সেখানে বসবাসকালে লেখায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন তিনি, তাঁর কাব্যচর্চা গতি পায়। প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ Flowers for Hitler। প্রকাশিত হয় দুটি উপন্যাস—The Favourite Game এবং Beautiful Losers। তাঁর প্রথম অ্যালবাম শ্রোতাদের কাছে হাজির হওয়ার আগেই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাব্যগ্রন্থ Let Us Compare Mythologies এবং The Spice-Box of Earth।
কিন্তু বাজারে তাঁর বই তেমন বিক্রি হয়নি, সমালোচক মহলও সেভাবে সাড়া দেয়নি। হতাশ কোহেন বেরিয়ে পড়েন নতুন কাজের সন্ধানে। কানাডায় ফিরে ঠিক করেন, সব ছেড়েছুড়ে যোগ দেবেন পোশাক নির্মাণ শিল্পে। কিন্তু নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য যিনি যন্ত্রণাবিদ্ধ হচ্ছেন, মনন যাঁকে অবিরত তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তিনি মন ফিরিয়ে থাকবেন কীভাবে?
১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্কে লোকগানের শিল্পী জুডি কলিন্সের সঙ্গে পরিচয়ের পর শুরু হয় গান লেখা। মূলত আর্থিক দুরবস্থা সামাল দিতেই গান লেখা শুরু করেছিলেন তিনি। জীবনানন্দের বনলতা সেন কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরার মতোই কোহেনের ‘Suzanne’ গানটি কবিতার এক অপূর্ব কথকতা। যেখানে কবিতা হয়ে উঠেছে গান, গান রূপ নিয়েছে কবিতায়।
চিরায়ত হয়ে ওঠা এই গান বিশ্বসঙ্গীত জগতে হঠাৎ করে এনে দিয়েছিল এক অন্য মেজাজের স্বাদ। ১৯৬৬ সালে জুডি কলিন্স তাঁর অ্যালবাম In My Life-এ ‘Suzanne’ রেকর্ড করেন। এরপর গানটি অসংখ্য শিল্পীর কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে; নেল ডায়মন্ড, নোয়েল হ্যারিসন, জোয়ান বায়েজসহ বহু শিল্পী গানটি রেকর্ড করেছেন। ‘Suzanne’ পরে কোহেনের অন্যতম বহুল-রেকর্ড করা গান হয়ে ওঠে।
“And you want to travel with her,
And you want to travel blind…”
‘Suzanne’-এর অনুপ্রেরণায় পরিচালক মাইকেল ব্যারি তৈরি করেন The Second Coming of Suzanne। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির চিত্রনাট্যের অনুপ্রেরণা ছিল কোহেনের গান।
১৯৬৭ সালে কলম্বিয়া রেকর্ডস থেকে প্রকাশিত হয় Songs of Leonard Cohen। এই অ্যালবামে ছিল ‘Sisters of Mercy’, ‘Winter Lady’, ‘So Long, Marianne’ এবং অবশ্যই ‘Suzanne’-এর মতো ইতিহাস তৈরি করা গান। জুডি কলিন্সের উৎসাহ এবং ১৯৬৭ সালের নিউপোর্ট ফোক ফেস্টিভ্যালে তাঁর পারফরম্যান্সের পর জন হ্যামন্ড তাঁকে কলম্বিয়া রেকর্ডসে চুক্তিবদ্ধ করেন।
সঙ্গে সঙ্গেই সংগীতবিশ্ব এবং আপামর সঙ্গীতপ্রেমীরা পেয়ে গেলেন প্রেম ও বিষণ্ণতার এক স্বতন্ত্র কবিকে। কোহেনের গানের গভীরতা, কাব্যময়তা, মাদকতা-মাখানো সুরেলা কণ্ঠ এবং সহজিয়া ভঙ্গি শ্রোতাকে বুঝিয়ে দেয়—তিনি অন্য জাতের, ভিন্ন ঘরানার শিল্পী।
১৯৬৯-এ বেরোয় Songs from a Room। ১৯৭১-এ ভালোবাসা, ঘৃণা, হতাশা আর যন্ত্রণার আরেক অনুপম সাঙ্গীতিক দলিল Songs of Love and Hate। ১৯৮৪ সালে Various Positions-এ নতুন সাউন্ড ও সিন্থেসাইজারের ব্যবহারে চমক দেন কোহেন। এই অ্যালবামেই প্রকাশিত হয় ‘Hallelujah’; জেনিফার ওয়ারনেস এই অ্যালবামে কোহেনের সঙ্গে সহ-শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দেন।
১৯৮৮ সালের I’m Your Man অ্যালবামেও বেশ চমক দেন লিওনার্ড। ৭৭ বছর বয়সে প্রকাশিত Old Ideas যেন তাঁর দীর্ঘ জীবনের আর এক অন্তর্মুখী স্বীকারোক্তি। তাঁর কণ্ঠ যেন আরও কোমল, আরও ভরাট। নিভৃতে কথা বলছেন। যেন দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের সামনে। অ্যালবামের গানগুলোতেও তাঁর যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতার ছবি—ভালোবাসার সঙ্গে মিশে গেছে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা, এসেছে মৃত্যুর অনুষঙ্গ।
গলার কর্কশতাকে ব্যবহার করতেন মিহিন শব্দের মণিহারীতে। বুকের ভেতর হু-হু করে দেওয়া গানের কথা দিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনুরাগী তৈরি করেছিলেন। রোমান্সের অবয়ব তৈরি করেছিলেন সুজান, মারিয়ান, জেনদের গল্পে। আবার বিষণ্ণতা, ঠাট্টা-বিদ্রুপও কম নেই। গানের কথা যেমন কাব্যময়, সাহিত্যধর্মী, তেমনই শব্দবন্ধের পরতে পরতে রয়েছে সুর ও ছন্দ।
সেই সুর-ছন্দে কিন্তু প্রতিবাদের স্বর, প্রতিরোধের শ্রুতি। সেই প্রতিবাদ বব ডিলানের মতো ক্ষুব্ধ-কোলাহলময় না হলেও গতানুগতিকতা, প্রাতিষ্ঠানিকতা, ভণ্ডামি, গোড়ামির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপমাখা উদ্বেগ। বাইবেলীয় প্রতীক ও ধর্মীয় অনুষঙ্গও তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে। ‘Hallelujah’ তারই অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
অস্থিরমতি কোহেনের জীবনে প্রেম এসেছে বারবার। তাঁর জীবনে নারীদের সান্নিধ্য ও সম্পর্কও তাঁর সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। জেনিফার ওয়ারনেসের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল সহযোগিতা ছিল; ১৯৭৯-এর Recent Songs-এ ওয়ারনেস গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠসঙ্গী ছিলেন এবং ১৯৮৪-এর Various Positions-এ তিনি কোহেনের সঙ্গে সহ-শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দেন।
দুই সন্তানের বাবা হয়েও থেকে গিয়েছিলেন নিজের কথামতো মুক্ত বিহঙ্গ। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় The Future। নিজের গান লেখা, সুর করাকে তিনি বলতেন ‘sacred mechanics’। সেখানে কেবল বিস্তারজুড়ে বিষাদের স্থান নেই। বরং তিনি কাপলেটে গেঁথে দিতেন তীক্ষ্ণ রসবোধ। আর স্বাধীন হতে পারার আকাঙ্ক্ষা—প্রেম থেকে, শহুরে শোরগোল থেকে, ধর্ম থেকে, ধর্মহীনতা থেকে…
“Like a bird on the wire,
Like a drunk in a midnight choir,
I have tried in my way to be free…”
শরীরের সঙ্গে পবিত্রতার যে যোগ, কথা-সুরে ধরেছিলেন সেই আত্মিকতাকেই। গানেও খুঁজেছেন আধ্যাত্মিকতা, বিষণ্ণতা।
