ছবির উৎস, Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
পটুয়াখালীর বাউফলে সম্প্রতি এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়ার একটি অডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
ওই ব্যবসায়ীকে কেনো হুমকি দেওয়া হলো এবং পরবর্তীতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করছেন অনেকেই।
এছাড়া ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পরও কেবল চাঁদাবাজির মামলায় কেন তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত ফরিদ উদ্দিন গাজী স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। অতীতেও নানা অপকর্মের সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
যদিও হত্যার হুমকি দেওয়া এই অডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে পটুয়াখালী জেলা বিএনপি।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চান ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল।
নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে এলাকায় প্রচারণাও শুরু করেছেন তিনি।
ছবির উৎস, SCREEN GRAB
যা জানা যাচ্ছে
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফোন রেকর্ডে ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে হুমকি দিতে শোনা যায় বাউফলের উপজেলা বিএনপি নেতা মো. ফরিদ উদ্দিন গাজীকে।
গত বৃহস্পতিবার অডিওটি ছড়িয়ে পড়লে, এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেককেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক নানা ইস্যু নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক করতে দেখা যায়।
এক মিনিট ৫৭ সেকেন্ডের ওই অডিও কল রেকর্ডে নিজের নাম পরিচয় উল্লেখ করে মি. মণ্ডলকে হুমকি দেন মি. গাজী।
হুমকিদাতাকে বলতে শোনা যায়, “দাদু, আমার নাম ফরিদ উদ্দিন গাজী। আমার বাবার নাম শামসুল আলম গাজী। আমার একটা শখ জাগছে, বুঝছেন? আমি একটা জ্যাতা নমো পুড়মু, এ ক্ষেত্রে আপনারে বাইছা নিছি, এতে আপনার মন্তব্য কী?”
অপর প্রান্ত থেকে আবার বলা হয়, “তো আপনার এতে মন্তব্য কী? জ্যাতা নমো পুড়মু, আপনারেই বাইছা নিছি, আপনি কী কন? আপনার সুবিধার জন্য আমার ফোনালাপ রেকর্ড কইরা রাখলে এইটাও রেকর্ড কইরা রাখেন।”
ব্যবসায়ী বলেন, “আমার মন্তব্য কী থাকবে, আপনার মনে খুশি ধরছে, আপনি করেন।”
এরপর হুমকিদাতা আবারও বলেন যে, “আপনাগো তো মরার পর পোড়ে, আমি আপনারে মরার আগেই পুড়তে চাই।”
কথোপকথনের শেষ অংশে তাকে বলতে শোনা যায়, “আপনি এলাকায় আসতেছেন কবে নাগাদ?” ব্যবসায়ী বলেন, “এলাকায় যেহেতু বাড়ি, আসব না? আসব।” তখন হুমকিদাতা বলেন, “তো খবরটা কী আপনি আমাকে দিবেন নাকি আমার খবর রাখা লাগবে?”
ছবির উৎস, Getty Images
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হুমকির এই ঘটনাটি মূলত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গেও যুক্ত।
আসন্ন নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল।
ইতোমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় ব্যানার ফেস্টুনও টাঙিয়েছেন তিনি।
বাউফলের গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলেও উপজেলার রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে মরিয়া বিএনপি।
তবে ক্ষমতাসীন দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা গ্রুপিং থাকায় নির্বাচন নিয়ে সেখানে আগেভাগেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলের ব্যানার ছাড়াই হিন্দু সম্প্রদায়ের একজনের নির্বাচনের প্রস্তুতি ওই এলাকার রাজনৈতিক পরিসরে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মি. মণ্ডলের দাবি, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই তাকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ফরিদ উদ্দিন গাজী।
“আমাকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দিয়েছে। এর আগে ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদাও দাবি করা হয়েছিল,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
অবশ্য ফরিদ গাজীর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটি সত্য নয় বলেই দাবি তার ভাগ্নে মোহাম্মদ জাহিদ এর।
তিনি বলছেন, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার মামাকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। যে অডিও রেকর্ডটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে সেটি পুরো ফোনালাপের খণ্ডিত অংশ বলেও দাবি তার।
“মামার লগে আমার কথা হইছে, যেটুকু কথা ফাঁস করা হইছে, হের আগে পরে অনেক কথা আছে। কিন্তু একটা অংশ কাইটা ফেসবুকে দিয়া দিছে। হের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির যে অভিযোগ আনা হইছে হেইডাও মিথ্যা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. জাহিদ।
ছবির উৎস, Getty Images
কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে
ব্যবসায়ীকে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেওয়ার এই অডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
গত বৃহস্পতিবারের এই ঘটনায় বাউফল থানায় অভিযুক্ত ফরিদ গাজীর বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল।
যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই তাকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। চাঁদা দাবি করে না পেয়ে শেষমেষ পুড়িয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় অভিযুক্ত ফরিদ গাজীকে চেক প্রতারণার একটি পুরনো মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। যদিও পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর করা চাঁদিবাজির মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে।
পুলিশ বলছে, ফরিদ গাজীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়ার অডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
“হুমকি দেওয়ার কয়েকদিন আগে ওই ব্যবসায়ীর কাছে সে (ফরিদ গাজী) চাঁদা চেয়েছিল। এই মামলায় গ্রেফতার করে আদালতে নেওয়া হলে, তাকে কারাগারে পাঠানো হয়,” বিবিসি বাংলাকে জানান বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম।
এছাড়া আদালতের আদেশ পাওয়ার পর জিডির বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, এই ঘটনার পর অভিযুক্ত ফরিদ গাজীকে সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে পটুয়াখালী জেলা বিএনপি।
শুক্রবার জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সই করা একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে প্রাণনাশের হুমকি, বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জীবিত পুড়িয়ে মারার হুমকি সংক্রান্ত কল রেকর্ড সংগঠনের শৃঙ্খলা ও আদর্শ পরিপন্থী।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও সংগঠনের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য পদ সহ সকল সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় তাকে।
বাউফল পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির বলছেন, স্থানীয় বিএনপির গ্রুপিংয়ের সুযোগ নিয়ে বছর খানেক আগে দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন অভিযুক্ত ফরিদ গাজী।
তিনি বলছেন, “স্থানীয়ভাবে দলের বিভিন্ন গ্রুপিং ছিল, যার সুযোগ নিয়ে ফরিদ গাজী নামে এই ছেলেটা দলে ঢুকেছে। ছড়িয়ে পড়া এই অডিওর সত্যতা পাওয়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।”
অতীতেও চাঁদাবাজি, হুমকিসহ নানা অপকর্মে মি. গাজী জড়িত বলে জানান বিএনপির স্থানীয় এই নেতা।
“এই হুমকি ছাড়া এর আগেও বিভিন্ন অপকর্মের কারণে সে একাধিক মামলার আসামী হয়েছে, জেল হাজত খেটেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
