সনাতন ধর্মে অগ্রপূজ্য ভগবান গণেশের জন্ম নিয়ে শিবপুরাণের কাহিনিই আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। মা পার্বতীর গায়ের হলুদ বা চন্দন দিয়ে তৈরি পুতুল থেকে গণেশের সৃষ্টি এবং মহাদেবের ত্রশূলে তাঁর মস্তকচ্ছেদের গল্প আমরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু সনাতন শাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ’-এ শ্রীগণেশের জন্ম ও গজানন (হাতির মাথা লাভ) হওয়ার যে বিকল্প ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে, তা এককথায় অনন্য, রোমহর্ষক এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন অভিজ্ঞ সাব-এডিটরের কলমে সেই অবিকৃত ও সূক্ষ্ম পৌরাণিক উপাখ্যানের বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
১. পার্বতীর কঠোর ‘পুণ্যক ব্রত’ এবং বিষ্ণুর বরদান
– বিজ্ঞাপন –
শিবপুরাণে দেখা যায় গণেশের সৃষ্টি হয়েছিল আকস্মিকভাবে, কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ বলছে এর পেছনে ছিল সুদীর্ঘ তপস্যা। মহাদেব শিবকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার পর দেবী পার্বতীর মনে তীব্র পুত্রলাভের আকাঙ্ক্ষা জাগে। কিন্তু যোগীশ্বর শিব তখন সৃষ্টিসুখে উদাসীন। এমতাবস্থায়, পরম ব্যাকুল হয়ে দেবী পার্বতী দেবর্ষি নারদের শরণাপন্ন হন।
দেবর্ষি নারদ তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা করার পরামর্শ দেন এবং ‘পুণ্যক ব্রত’ নামক একটি অত্যন্ত কঠিন ও পবিত্র ব্রতের বিধান দেন। শাস্ত্র মতে, এই ব্রত পালন করা অত্যন্ত দুরূহ। দেবী পার্বতী সুদীর্ঘকাল ধরে কঠোর নিয়ম, সংযম ও ভক্তির সাথে এই পুণ্যক ব্রত সম্পন্ন করেন। তাঁর এই একনিষ্ঠ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে জগতের পালনকর্তা ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং আবির্ভূত হন এবং বর দেন যে, তিনি নিজেই পার্বতীর গর্ভে পুত্ররূপে অথবা তাঁর কোলে অলৌকিক সন্তান রূপে জন্ম নেবেন।
২. শ্রীকৃষ্ণের অবতার রূপে গণেশের আগমন
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতি খণ্ড অনুযায়ী, ব্রত সমাপ্ত হওয়ার পর এক শুভ ক্ষণে কৈলাসের মণিকোঠায় এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। কোনো মানবীয় গর্ভাধান ছাড়াই, স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত মনোহর, দিব্য ও জ্যোতির্ময় শিশুর রূপ ধারণ করে দেবী পার্বতীর কোলে আবির্ভূত হন।
বিজ্ঞাপন
এই পুরাণের মূল তত্ত্বই হলো—গণেশ অন্য কেউ নন, তিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণেরই এক পূর্ণ অবতার বা তাঁরই দিব্য রূপ। শিশুর অঙ্গজ্যোতিতে সমগ্র কৈলাস আলোকিত হয়ে ওঠে। শিব ও পার্বতী পরম আনন্দে মগ্ন হন এবং ত্রিভুবনে এই নবজাতককে দেখার জন্য উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।
৩. শনিদেবের আগমন এবং তাঁর ‘দৃষ্টি’র ভয়ঙ্কর অভিশাপ
কৈলাসের এই আনন্দ উৎসবে যোগ দিতে মর্ত্য, পাতাল ও স্বর্গলোক থেকে সমস্ত দেব-দেবী, যক্ষ ও গন্ধর্বরা ছুটে আসেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন সূর্যপুত্র শনিদেবও। কিন্তু উৎসবে এসেও শনিদেব এক অদ্ভুত আচরণ করছিলেন। তিনি আনন্দ প্রকাশ করা তো দূরের কথা, মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবজাতক অপরূপ শিশুকে দেখার বিন্দুমাত্র আগ্রহ তাঁর মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না।
এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক করুণ রহস্য। শনিদেবের স্ত্রী অত্যন্ত সাধ্বী ও তপস্বিনী ছিলেন। একবার শনিদেব ধ্যানে মগ্ন থাকায় তাঁর স্ত্রীর দিকে দীর্ঘসময় দৃষ্টিপাত করেননি, এতে ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হয়ে তাঁর স্ত্রী শনিদেবকে অভিশাপ দেন—“আজ থেকে তুমি যার দিকেই প্রথম দৃষ্টিপাত করবে, তোমার কুদৃষ্টির প্রভাবে তার মস্তক ছিন্ন বা ভস্ম হয়ে যাবে।” নিজের এই মারাত্মক শক্তির কথা জেনে শনিদেব জগৎ কল্যাণে সর্বদা নিজের দৃষ্টি নিচের দিকে রাখতেন।
৪. পার্বতীর অনুরোধ এবং শনির অনিচ্ছা
উৎসবকক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা শনিদেবকে এভাবে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে দেবী পার্বতী বিস্মিত হন। মাতৃত্বের অহংকার ও স্নেহে অন্ধ হয়ে পার্বতী শনিদেবকে বলেন, “হে সূর্যপুত্র! আপনি কেন মাথা নিচু করে আছেন? আমার এই পরম সুন্দর পুত্রকে দর্শন করে একে আশীর্বাদ করুন।”
शनিদেব অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দেবী পার্বতীকে তাঁর স্ত্রীর অভিশাপের কথা জানান এবং বলেন যে তাঁর দৃষ্টি শিশুর জন্য অমঙ্গল ডেকে আনতে পারে। কিন্তু দেবী পার্বতী কর্মের গতি ও ভাগ্যের লিখনকে উপেক্ষা করে হাসিমুখে বলেন, “মহাবিশ্বে পরমেশ্বরের ইচ্ছার বাইরে কিছুই ঘটে না। আপনি নির্দ্বিধায় আমার পুত্রকে দর্শন করুন।” মাতার এই অনমনীয় অনুরোধে শনিদেব আর না করতে পারলেন না। তিনি অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখের কোণ দিয়ে অতি সামান্যভাবে শিশুর মুখের দিকে তাকালেন।
৫. মস্তকচ্ছেদ এবং বৈকুণ্ঠে প্রয়াণ
শনির সেই অতি ক্ষুদ্র কুদৃষ্টি শিশুর ওপর পড়ামাত্রই এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেল। কোনো রক্তপাত ছাড়াই, এক তীব্র জ্যোতি সহকারে নবজাতক গণেশের সুন্দর মস্তকটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের বিশেষত্ব হলো, এখানে বলা হয়েছে—যেহেতু গণেশ স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের রূপ ছিলেন, তাই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁর সেই দিব্য মস্তকটি সোজা অন্তরীক্ষ পাড়ি দিয়ে বৈকুণ্ঠে শ্রীকৃষ্ণের মূল দেহে গিয়ে লীন হয়ে যায়। কৈলাসে পড়ে থাকে কেবল মস্তকহীন এক দেব-শিশু। পুত্রের এই অবস্থা দেখে দেবী পার্বতী শোকে ও স্তব্ধতায় মূর্ছা যান। সমগ্র কৈলাসে হাহাকার পড়ে যায়।
৬. উত্তর দিকে শায়িত হস্তী এবং সুদর্শন চক্রের লীলা
এই চরম সংকটের মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন ভগবান বিষ্ণু। মহাদেব ও পার্বতীর দুঃখ দূর করতে তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর বাহন গরূড়ের পিঠে চড়ে মস্তক সন্ধানে বের হন। উত্তর দিকে যেতে যেতে তিনি পুষ্পভদ্রা নদীর তীরে এসে পৌঁছান। সেখানে তিনি দেখতে পান একটি হাতী (বা গজরাজ) উত্তর দিকে মাথা করে গভীর ঘুমে মগ্ন রয়েছে। সনাতন শাস্ত্রে উত্তর দিকে মাথা করে ঘুমানোকে বাস্তু ও নিয়মের পরিপন্থী মনে করা হয়।
ভগবান বিষ্ণু কালবিলম্ব না করে তাঁর অমোঘ সুদর্শন চক্র নিক্ষেপ করেন এবং সেই হস্তীরাজের মস্তকটি কেটে নেন। এরপর সেই হাতির মাথাটি গরূড়ের পিঠে চাপিয়ে দ্রুত কৈলাসে ফিরে আসেন। শিবের উপস্থিতিতে এবং বিষ্ণুর অলৌকিক শক্তিতে সেই হস্তী-মস্তকটি মস্তকহীন শিশুর ধর বা দেহের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। বিষ্ণুর মন্ত্রপূত স্পর্শে শিশুটি আবার প্রাণ ফিরে পায়। হাতির মাথা যুক্ত হওয়ার কারণেই তিনি তখন থেকে ‘গজানন’ নামে পরিচিত হন এবং দেবতারা তাঁকে বিঘ্নহর্তা ও অগ্রপূজ্য হিসেবে মর্ত্যে প্রতিষ্ঠা করেন।
শিবপুরাণের কাহিনিতে যেখানে শিব ও গণেশের যুদ্ধের মাধ্যমে বীরত্ব ও নিয়মের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, সেখানে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের এই কাহিনিটি কর্মফল, শনিদেবের সততা, পার্বতীর মাতৃস্নেহ এবং শ্রীকৃষ্ণের লীলার এক অপূর্ব সমাহার। এটি আমাদের শেখায় যে, স্বয়ং ঈশ্বরের অবতার হলেও প্রকৃতির নিয়ম ও অভিশাপের বিধান অলঙ্ঘনীয়।
