গরমে রাস্তায় বেরিয়ে গলা শুকিয়ে গেলে ঠান্ডা এক গ্লাস আখের রস যেন মুহূর্তেই স্বস্তি এনে দেয়। প্রাকৃতিক মিষ্টি স্বাদের এই পানীয় শরীরে দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে, পাশাপাশি কিছুটা তরলও সরবরাহ করে। তাই গরমের দিনে আখের রসের চাহিদা থাকে যথেষ্ট।

কিন্তু ঋতু বদলে বর্ষা নামলেও রাস্তার ধারের আখের রসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে না। বরং এই সময়েই আখের রসের সঙ্গে তার চারপাশের পরিবেশটিও নজরে রাখা জরুরি। কারণ বর্ষায় রাস্তার ধারে জমে থাকা জল, কাদা, নোংরা আবর্জনা, মাছি-পোকামাকড় এবং অপরিষ্কার পরিবেশ পানীয়কে দূষিত করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

– বিজ্ঞাপন –

অর্থাৎ, সমস্যা আখের রসে নয়। আসল প্রশ্ন হল—রসটি কোথায়, কীভাবে এবং কতটা পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে?

আখের রসে কী থাকে?

আখের রসে প্রাকৃতিক শর্করা থাকে, যার মধ্যে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ অন্যতম। এই শর্করা শরীরে দ্রুত শক্তি জোগাতে পারে। পাশাপাশি আখের রসে কিছু পরিমাণ খনিজ ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদানও থাকে।

গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে জল বেরিয়ে গেলে আখের রস কিছুটা তরল জোগাতে পারে। এই কারণেই অনেকেই একে ‘প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক’ বলে থাকেন।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আখের রস ORS-এর বিকল্প নয়। ডায়রিয়া, বমি বা অন্য কোনও কারণে শরীরে জল ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ORS গ্রহণ করাই বেশি উপযুক্ত।

বিজ্ঞাপন

গরমে যেমন সতর্কতা, বর্ষায় তেমনই বাড়তি নজর

গরমের সময় আখের রসের দোকানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকে জল, বরফ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। অপরিষ্কার জল বা বরফের মাধ্যমে পানীয়তে জীবাণু ঢুকে যেতে পারে।

বর্ষায় সেই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয় আরও একটি বিষয়—চারপাশের পরিবেশ।

রাস্তার ধারে বৃষ্টির জল জমে থাকলে তার সঙ্গে মিশে যেতে পারে মাটি, আবর্জনা, নর্দমার নোংরা জল কিংবা অন্যান্য দূষিত পদার্থ। সেই জল সরাসরি রসে মিশছে না হলেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের মাধ্যমে দোকানের মেশিন, পাত্র, হাত বা গ্লাস দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে মাছি-পোকামাকড়ের আনাগোনাও বেড়ে যেতে পারে। ফলে খোলা অবস্থায় রাখা পানীয় সহজেই দূষিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

আখ পেষার মেশিন পরিষ্কার তো?

রাস্তার ধারের আখের রসের ক্ষেত্রে মেশিনটির পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনের পর দিন যন্ত্র পরিষ্কার না করলে তার বিভিন্ন অংশে আখের রসের অবশিষ্টাংশ, ধুলা-ময়লা ও অন্যান্য দূষণ জমতে পারে।

বর্ষাকালে ভেজা পরিবেশ ও কাদা-ময়লা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাই রস খাওয়ার আগে একবার দেখে নিন—মেশিনটি পরিষ্কার কি না, আখ রাখার জায়গায় ময়লা জমে আছে কি না এবং রস বের হওয়ার অংশটি পরিচ্ছন্ন কি না।

বরফ ও জলের দিকেও নজর দিন

অনেকেই আখের রস ঠান্ডা করতে বরফ ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই বরফ কোন জল থেকে তৈরি, তা জানা না থাকলে সমস্যা হতে পারে।

একই কথা প্রযোজ্য রস তৈরির সময় ব্যবহৃত জলের ক্ষেত্রেও। জল নিরাপদ না হলে তাতে থাকা জীবাণু পানীয়ের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বর্ষায় রাস্তার আশপাশে জমে থাকা জল বা অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে জল ও বরফের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

তাই বরফের উৎস নিয়ে সন্দেহ থাকলে বরফ ছাড়া রস খাওয়াই নিরাপদ পছন্দ।

খোলা জায়গায় রাখা রস কতটা নিরাপদ?

তাজা আখের রস পান করাই ভালো। কিন্তু অনেক দোকানে কিছুক্ষণ আগে তৈরি করা রস রেখে পরে বিক্রি করা হয়।

গরম ও আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ রেখে দেওয়া পানীয়তে জীবাণু বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্ষাকালে বাতাসের আর্দ্রতা এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশও খাদ্য ও পানীয়ের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

তার উপর খোলা পাত্রে রাখা রসে মাছি বসা কিংবা ধুলাবালি পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাই চোখের সামনে আখ পিষে তৈরি করা তাজা রসই তুলনামূলকভাবে ভালো পছন্দ।

কী ধরনের অসুস্থতা হতে পারে?

দূষিত জল বা খাবারের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যবাহিত সংক্রমণ ছড়াতে পারে। অপরিষ্কারভাবে তৈরি আখের রসের ক্ষেত্রেও ডায়রিয়া, বমি, পেটের সমস্যা বা ফুড পয়জনিংয়ের মতো অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কোন জীবাণু কীভাবে শরীরে প্রবেশ করেছে, তার উপর অসুস্থতার ধরন নির্ভর করে। কিছু দূষিত খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে টাইফয়েড বা হেপাটাইটিস এ-এর মতো সংক্রমণও ছড়াতে পারে।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খাদ্যবাহিত সংক্রমণ বেশি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে কি আখের রস খাওয়া বন্ধ?

একেবারেই নয়। আখের রস নিজে কোনও ‘বিষাক্ত’ পানীয় নয়। সঠিকভাবে তৈরি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পরিবেশন করা হলে এটি গরমে একটি সতেজ পানীয় হতে পারে।

সমস্যা শুরু হয় যখন সতেজতার সঙ্গে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়।

তাই শুধু রসের স্বাদ বা ঠান্ডাভাব দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে দোকানের পরিবেশটিও একবার দেখে নেওয়া উচিত।

নিরাপদে আখের রস খেতে কী করবেন?

পরিষ্কার দোকান বেছে নিন: আশপাশে জমে থাকা নোংরা জল, কাদা, আবর্জনা বা মাছি-পোকামাকড়ের উপদ্রব বেশি থাকলে সেই দোকান এড়িয়ে চলুন।

চোখের সামনে রস তৈরি করান: আগে থেকে তৈরি করে রাখা রসের বদলে আপনার সামনে আখ পিষে তৈরি করা রস পান করুন।

মেশিনের পরিচ্ছন্নতা দেখুন: মেশিনের রস বের হওয়ার অংশে ময়লা বা পুরনো রস জমে থাকলে সতর্ক হন।

অপরিষ্কার জল বা বরফ এড়িয়ে চলুন: বরফের উৎস নিয়ে সন্দেহ থাকলে বরফ ছাড়া রস খান।

গ্লাস পরিষ্কার কি না দেখুন: অপরিষ্কার গ্লাস বা একই গ্লাস বারবার না ধুয়ে ব্যবহার করা হলে সেই দোকান এড়ানো ভালো।

খোলা অবস্থায় রাখা রস খাবেন না: দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা রসের বদলে সদ্য তৈরি রস বেছে নিন।

নিজের স্বাস্থ্যের কথাও মাথায় রাখুন: আখের রসে প্রাকৃতিক শর্করা যথেষ্ট পরিমাণে থাকে। তাই ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকলে পরিমাণের বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

এক গ্লাস স্বস্তি, নাকি অসুস্থতার কারণ—সিদ্ধান্ত আপনার

গরমে আখের রস যেমন তৃষ্ণা মেটাতে পারে, তেমনই বর্ষায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি বা দূষিত রস হয়ে উঠতে পারে অসুস্থতার কারণ। তাই শুধু গরমের দিনে নয়, বর্ষার ভেজা-নোংরা পরিবেশেও রাস্তার ধারের পানীয় বেছে নেওয়ার সময় বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি।

মনে রাখুন, আখের রসের সমস্যা তার মিষ্টিতে নয়, সমস্যা হতে পারে অপরিচ্ছন্নতায়। পরিষ্কার জল, পরিচ্ছন্ন মেশিন, পরিষ্কার গ্লাস এবং তাজা রস—এই কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তাই পরের বার রাস্তার ধারে এক গ্লাস আখের রস দেখলে শুধু ‘ঠান্ডা তো?’ নয়, একবার চারপাশটাও দেখে নিন। গরমের স্বস্তি যেন বর্ষার নোংরায় অসুস্থতার কারণ না হয়ে ওঠে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *