১৯৬১ সালে অজয় করের পরিচালনায় পর্দায় এসেছিল ‘সপ্তপদী’। গত ছয় দশক ধরে বাঙালি প্রেমের সংজ্ঞা খুঁজতে বারবার ফিরে গেছে উত্তম-সুচিত্রার এই কালজয়ী সৃষ্টির কাছে। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের নস্টালজিয়া হোক বা কৃষ্ণেন্দু-রিনা ব্রাউনের রসায়ন— এই রসদ ছাড়া যেন বাঙালি সিনেপ্রেমীদের মন ভরে না। কিন্তু জানেন কি, আমাদের চেনা এই হ্যাপি এন্ডিং বা রোমান্টিক ক্লাইম্যাক্স কিন্তু রুপোলি পর্দায় দেখানোর কথা ছিল না? সুচিত্রা সেনের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই বদলে গিয়েছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাস।

তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘সপ্তপদী’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল এই ছবি। সাহিত্যিকের মূল গল্প মেনে পরিচালক অজয় করও ছবির সমাপ্তি সাহিত্য নির্ভরই রাখতে চেয়েছিলেন। উপন্যাসে নায়ক কৃষ্ণেন্দুর শেষ পরিণতি ছিল কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হওয়া। কিন্তু শুটিং চলাকালীন চিত্রনাট্য বুঝতে পেরে তীব্র আপত্তি জানান সুচিত্রা সেন। তাঁর স্পষ্ট কথা ছিল, অনস্ক্রিন উত্তম-সুচিত্রার এমন এক কালজয়ী প্রেমের শেষে নায়কের শরীর এমন মারণ রোগে ক্ষয়ে যাবে, তা সাধারণ দর্শক কোনওদিনই মেনে নিতে পারবেন না।

সুচিত্রা বুঝেছিলেন, এই দৃশ্য কেবল রোমান্টিক জুটির আবেদন নষ্ট করবে না, বরং প্রেমের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে আঘাত করবে। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ায় সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। পরিচালক যখন মূল গল্পের শেষ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন, তখন স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাহিত্যিক।

ঠিক এই সময়েই নিজের বিচক্ষণতার পরিচয় দেন মহানায়িকা। তিনি এক দারুণ বুদ্ধি খাটান। উত্তমের ভাই তরুণ কুমারকে দূত বানিয়ে পাঠান তারাশঙ্করের কাছে। সুচিত্রার যুক্তি পৌঁছে দেওয়া হয় সাহিত্যিকের কানে— ‘যে মানুষটি শুধুমাত্র ভালোবাসার খাতিরে নিজের ধর্ম, পরিবার সবকিছু ত্যাগ করল, শেষ পরিণতিতে তার কুষ্ঠ হওয়া কি মেনে নেওয়া যায়? এতে তো সমাজ ভালোবাসাকেই একপ্রকার পাপ বলে মনে করবে!’ সুচিত্রার এই গভীর আবেগ ও যুক্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল সাহিত্যিককেও। অবশেষে গল্পের শেষাংশ নতুন করে লেখার অনুমতি দেন তারাশঙ্কর।

মজার বিষয় হল, শুরুতে এসব সমীকরণের কিছুই জানতেন না উত্তম কুমার। তবে মহানায়িকার এই পরিবর্তন যে শেষ পর্যন্ত ছবির এবং তাঁদের জুটির ভালোর জন্যই করা হচ্ছে, তা বুঝতে পেরে বিন্দুমাত্র আপত্তি জানাননি মহানায়ক।

বাকিটা তো ইতিহাস! যদি সেদিন মহানায়িকা নিজের মতে অনড় না থাকতেন, তবে হয়তো ‘সপ্তপদী’ আজ ক্লাসিক প্রেমের মহাকাব্য হয়ে উঠতে পারত না। সুচিত্রা সেনের সেই মোক্ষম চালের কারণেই বাংলা সিনেমা পেয়েছিল তার সর্বকালের অন্যতম সেরা রোমান্টিক ক্লাইম্যাক্স।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *