ছবির উৎস, Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
রাখি বন্ধনের আগে ভারতে একটি গয়নার ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। এই বিজ্ঞাপনে রয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী কৃতি স্যানন।
গয়নার ব্র্যান্ডের যে বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক বেঁধেছে, তা নিয়ে কেউ ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানের সময়ে তার পরনের পোশাক সম্পর্কে সমালোচনা করেছেন, কেউ আবার আবার কুকুরকে রাখি পরানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এরই মাঝেই অভিনেত্রী ও বিজেপির সংসদ সদস্য কঙ্গনা রানাওয়াত ওই বিজ্ঞাপন নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান। এরপর বিতর্ক আরো বাড়ে। ওই বিজ্ঞাপন ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বস্তিকর’ (ইন্টেনশনালি ক্রিপি) বলে মন্তব্য করেছেন কঙ্গনা রানাওয়াত।
বিতর্কের মাঝে কৃতি স্যাননও জবাব দেন। বিজ্ঞাপনে তাকে যে পোশাক পরে দেখা গিয়েছিল তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, “সংস্কৃতি হৃদয়ে থাকে, নেকলাইনে নয়।”
নেকলাইন বলতে পোশাকের গলার কাছের কাটিংকে বোঝায়। এখানে মূলত নেকলাইনের দৈর্ঘ্যকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি।
অন্যদিকে কৃতি স্যাননের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি জানিয়েছেন, স্বাধীনভাবে চললেই নারীদের ট্রল করার এই ট্রেন্ড বন্ধ হওয়া দরকার।
শেষ পর্যন্ত বুধবার ওই গয়নার ব্র্যান্ড তাদের বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্তের ঘোষণার সময় ওই ব্র্যান্ডের তরফে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, “ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং উৎসবের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও গভীর সম্মান রয়েছে। একটা ব্র্যান্ড হিসেবে আমরা সবসময় পুরো পরিবারের সাথে এই আনন্দময় মুহূর্তগুলো উদযাপনে বিশ্বাসী এবং এবার আমরা সেই ভালোবাসা ও উদযাপন আমাদের পোষ্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে চেয়েছি।”
“আমাদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনটি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে সমাজের কোনো অংশের অনুভূতিতে আঘাত করে থাকে, তবে তা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। সম্মান প্রদর্শনস্বরূপ, আমরা সমস্ত গণমাধ্যম থেকে বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি।”
ছবির উৎস, Giva/Instagram
বিজ্ঞাপনে কী দেখানো হয়েছে?
এই ৩৫ সেকেন্ড দীর্ঘ এই বিজ্ঞাপন জুয়েলারি ব্র্যান্ড ‘জিভা’র। গত ১৭ই অগাস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিজ্ঞাপন শেয়ার করা হয়েছিল। বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, কৃতি স্যানন রাখি বন্ধন উদযাপন করছেন।
তার পরনে সাদা লেহেঙ্গা এবং ডিপ-নেক ব্রালেট স্টাইলের ব্লাউজ যার উপরে হাতকাটা জ্যাকেট রয়েছে। প্রকারভেদে ব্রালেট অন্তর্বাস হিসাবে ব্যবহার করা হয় আবার স্টাইলিশ টপ কিংবা ব্লাউজ হিসাবেও ব্যবহার করা হয়।
ওই বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, তিনি তার ভাই এবং পোষ্য কুকুরের সঙ্গে রাখি উদযাপন করছেন। প্রথমে ভাইয়ের হাতে রাখি পরাতে দেখা যায় তাকে এবং পরে পোষ্যকে রাখির মতো ব্রেসলেট পরাতে দেখা যায়।
কী নিয়ে আপত্তি?
সামাজিক মাধ্যমে এই বিজ্ঞাপনের যে বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি তোলা হয়েছে তা হলো অভিনেত্রীর পোশাক। সামাজিক মাধ্যমে অনেক ইউজার জানিয়েছেন, উৎসবের জন্য এমন পোশাক উপযুক্ত নয়।
এক ব্যক্তি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “এটা একটা পবিত্র উৎসবকে উপহাস করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা, অভিনেত্রী কৃতি স্যাননও এখানে সমানভাবে দায়ী।”
আরেক ব্যক্তি লিখেছেন, “প্রতিবাদ জানানো ও (এমন বিজ্ঞাপনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের) দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও এই ধরনের বোকা বোকা বিজ্ঞাপন বারবার আসতেই থাকে।”
কেউ কেউ আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এই বিজ্ঞাপনে কপালে তিলক পরানো ও আরতির মতো প্রথা দেখানো হয়নি। পোষ্যকে রাখি পরানোর দৃশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এরই মাঝে কেউ কেউ ব্র্যান্ডকে বয়কটের ডাকও দিয়েছেন।
ছবির উৎস, @kanganaranaut/Instagram
কঙ্গনা রানাওয়াত কী বলেছেন?
এসবের মাঝে কঙ্গনা রানাওয়াত ইনস্টাগ্রামে নিজের মতামত জানিয়ে একটা দীর্ঘ পোস্ট করেন। তিনি সরাসরি কৃতি স্যানন বা ওই গয়নার ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ না করলেও, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল।
তিনি লিখেছেন, “এই সময়টা নারীদের জন্য চমৎকার সময়, আমাদের আলমারি নানা ধরনের পোশাকে ভরা। আজকের নারী একজন বিশ্বজনীন নারী, ককটেল ড্রেস থেকে লেহেঙ্গা-চোলি, জিন্স থেকে শাড়ি, বিকিনি থেকে সালোয়ার-কামিজ।”
“আমাদের কাছে এত বিকল্প রয়েছে, তাহলে কেন আপনি আপনার ভাইকে বিকিনি বা অন্তর্বাস পরে রাখি পরাবেন? আপনার অন্যান্য সাজসজ্জার বিকল্পগুলো কোথায় গেল?”
ওই পোস্টেই তিনি নাম না করে ওই বিজ্ঞাপনটকে “ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বস্তিকর” বলে আখ্যাও দিয়েছেন।
ছবির উৎস, @rahulgandhi/Instagram
যারা অভিনেত্রীর পক্ষে কথা বলেছেন
বিজ্ঞাপন নিয়ে সমালোচনা হলেও অনেকে অভিনেত্রী কৃতি স্যাননের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই তালিকায় রাহুল গান্ধীও রয়েছেন।
সমালোচনার জবাবে অভিনেত্রী তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নিজের বক্তব্য শেয়ার করেছিলেন। সেই পোস্ট নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করে রাহুল গান্ধী লিখেছেন “একজন নারী কী পরবেন, কী করবেন এবং কোথায় যাবেন -সেটা সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্ব পছন্দ। নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করার জন্য নারীদের ট্রল করা বন্ধ করুন।”
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কৃতি স্যাননকে সমর্থন করে তার ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে ‘স্ম্যাশ দ্য প্যাট্রিয়ার্কি’ হ্যাশট্যাগও ব্যবহার করেছেন। পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা হয়।
পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই অভিনেত্রীর পক্ষে কথা বলেছেন।
সামাজিক মাধ্যমেই এক ব্যক্তি লিখেছেন, “আমরা কি নারীদের পোশাক নিয়ে অহেতুক কথা বলা বন্ধ করতে পারি এবং বিষয়টা সবসময় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত বলে দেখানোর এই ভান করাটাও ছাড়তে পারি?
আরেক ব্যক্তি আবার লিখেছেন, “আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে কৃতির পোশাক একটা নৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। এটা একটা বিজ্ঞাপন, সবার একটু ভেবে দেখা উচিত।”
ছবির উৎস, @kritisanon/Instagram
কৃতি স্যানন কী বলেছেন?
এই বিতর্কের জবাব দিয়েছেন কৃতি স্যানন নিজেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন একজন নারীর সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতাকে তার পোশাক দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।
তিনি লিখেছেন, “উৎসবের আসল অনুভূতি পোশাকে থাকে না, তা অন্তর্নিহিত থাকে মনের গভীর থেকে পালন করা ঐতিহ্যের মাঝে। রাখি সুরক্ষা ও ভালোবাসার এক বন্ধন। আমি আর আমার বোন একে অপরকে রাখি বাঁধি। আমরা একে অপরকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা করি এবং পরস্পরের সুস্বাস্থ্য, সুখ ও দীর্ঘ জীবনের জন্য প্রার্থনা করি।”
পোষা প্রাণীকে রাখি পরানো নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এই ভালোবাসা ও প্রার্থনা আমাদের কুকুরদের জন্যও প্রযোজ্য, কারণ তারাও আমাদের পরিবারেরই অংশ।”
তিনি লিখেছেন, “আমরা নারীদের কী পরতে হবে সেটা বলা কবে বন্ধ করব? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ফ্যাশন বদলেছে। কিন্তু কেন একজন নারীর সংস্কৃতির প্রতি সম্মান এখনো শুধু তার পোশাক দিয়ে মাপা হয়? সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তার হৃদয়ে থাকে, তার নেকলাইনে নয়।”
ছবির উৎস, Tanishq
এর আগে যে বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল
উৎসব সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক ভারতে নতুন বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং চাপের মুখে বেশ কয়েকটা বড় ব্র্যান্ড তাদের বিজ্ঞাপন প্রত্যাহারও করে নিয়েছে। এমনই কয়েকটা সাম্প্রতিক ঘটনা ফিরে দেখা যাক-
তানিশক, ২০২০ সাল: গয়না প্রস্তুতকারক ব্র্যান্ড ‘তানিশক’-কে ২০২০ সালের ১৩ই অক্টোবর তাদের ‘একত্বম’ ক্যাম্পেন থেকে ৪৩ সেকেন্ডের একটা বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
সেই বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছিল একটা মুসলিম পরিবার তাদের বাড়ির হিন্দু পুত্রবধূর সাধ ভক্ষণের অনুষ্ঠান পালন করছে। অভিযোগ ওঠে তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’-কে উৎসাহ দিচ্ছে ওই বিজ্ঞাপন। বিতর্ক শুরু হয়। এক্স হ্যান্ডেলে #বয়কটতানিশক এক্স ট্রেন্ড করতে থাকে। শেষে বিজ্ঞাপনটা প্রত্যাহার করে নেয় ওই ব্র্যান্ড।
সার্ফ এক্সেল, ২০১৯ সাল: কাপড় কাচার গুঁড়ো সাবান সার্ফ এক্সেল হোলির সময় একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করেছিল, যেখানে দেখানো হয়েছিল একটা ছোট্ট মেয়ে তার মুসলিম বন্ধুকে রঙের হাত থেকে বাঁচিয়ে মসজিদে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে নামাজের পর তারা একসঙ্গে হোলি খেলার প্রতিজ্ঞা করে।
এরপর সামাজিক মাধ্যমে #বয়কটসার্ফএক্সেল ট্রেন্ড করতে থাকে এবং এই বিজ্ঞাপন হিন্দু-বিরোধী বলে সমালোচিত হয়। তবে, এই বিজ্ঞাপন সরায়নি ওই ব্র্যান্ড।
ফ্যাবইন্ডিয়া, ২০২১ সাল: ভারতীয় চিরাচরিত পোশাকের ব্র্যান্ড ফ্যাবইন্ডিয়া ‘জশন-এ-রিওয়াজ’ নামে একটা উৎসব কালেকশন লঞ্চ করেছিল। উর্দু নাম নিয়ে আপত্তি ওঠে এবং #দিওয়ালিইজনটজশন-এ-রিওয়াজ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করতে থাকে সামাজিক মাধ্যমে।
ডাবর, ২০২১ সাল: আয়ুর্বেদিক ও প্রাকৃতিক ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী সংস্থা ডাবরের একটা প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। ‘করভা চৌথের’ বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছিল দু’জন নারীকে একে অপরের জন্য উপোস করছেন। করভা চৌথে নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু এবং মঙ্গল কামনা করে উপবাস করেন।
এই বিজ্ঞাপন প্রকাশ্যে আসার পরই মধ্যপ্রদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরোত্তম মিশ্র এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। পরের দিন, ওই সংস্থা সেই বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেয়। ডাবরের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য আমরা নিঃশর্তভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।”
এই সব ক্ষেত্রে একটা বিষয় কিন্তু একই ছিল। বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল সামাজিক মাধ্যমে, পরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং বেশ কয়েকবার চাপের মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড তাদের বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নেয়।
কৃতি স্যাননের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কী হয় সেদিনে অনেকেরই নজর ছিল। শেষপর্যন্ত ওই ব্র্যান্ডও তাদের বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলেছে।
