বাহ্যিক একাধিক চাপের মধ্যেও ভারতীয় অর্থনীতি এখনও যথেষ্ট স্থিতিশীল। তবে সামনে একাধিক ঝুঁকি রয়েছে। স্বাভাবিকের তুলনায় কম বর্ষা, অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ব বাণিজ্য ঘিরে অনিশ্চয়তা ভারতের আর্থিক বৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধির উপর চাপ তৈরি করতে পারে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অগস্ট বুলেটিনে প্রকাশিত ‘স্টেট অফ দ্য ইকোনমি’ নিবন্ধে এমনই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
তবে ঝুঁকির পাশাপাশি অর্থনীতির ভিত মজবুত থাকার কথাও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, শিল্পক্ষেত্রে ক্রমোন্নতি এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলির মজবুত মুনাফা বৃদ্ধির হার অর্থনীতিকে সমর্থন করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
– বিজ্ঞাপন –
এটি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তরফে সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো তুলনামূলক কড়া বা ‘হকিশ’ বার্তা। এর আগে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণীতেও ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
জুলাইয়েও অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী
RBI-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, জুলাই মাসেও দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ চাহিদার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছে। ট্রাক্টর এবং দু’চাকার গাড়ির বিক্রি বৃদ্ধির জেরে খুচরো গাড়ি বিক্রিও গতি পেয়েছে।
শহরাঞ্চলের চাহিদাও স্থিতিশীল ছিল বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। গাড়ি ও ট্রাক্টর বিক্রির পরিসংখ্যানকে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বজায় থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শিল্পক্ষেত্রেও আশাব্যঞ্জক ছবি উঠে এসেছে। PMI-এর তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়ে সংস্থাগুলির প্রত্যাশা বেড়েছে। এর ফলে নতুন ব্যবসার সুযোগ এবং চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে RBI।
সব মিলিয়ে, একাধিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভারতীয় অর্থনীতি এখনও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে বলে বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে খুচরো মূল্যবৃদ্ধিতেও খরচ বৃদ্ধির চাপের প্রভাব সীমিত ছিল বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
খাদ্যপণ্যের দামে বাড়ছে চাপ
তবে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে হেডলাইন CPI বা খুচরো মূল্যবৃদ্ধি সামান্য বেড়েছে। এর পিছনে মূল ভূমিকা নিয়েছে খাদ্য ও পানীয়ের দাম।
RBI-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি তথ্য বলছে, খাদ্যপণ্যের দাম একাধিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছে। চাল ও গমের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডালের দামও কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে ভোজ্য তেলের দামেও ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে।
তবে স্বস্তির জায়গা হল, খাদ্য ও জ্বালানি বাদ দিয়ে মূল মূল্যবৃদ্ধি বা কোর ইনফ্লেশন এখনও মোটামুটি স্থিতিশীল। RBI-এর মতে, হেডলাইন মূল্যবৃদ্ধির সাম্প্রতিক বৃদ্ধি মূলত সরবরাহজনিত চাপের ফল। কোর ইনফ্লেশন স্থিতিশীল থাকায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপ এখনও ব্যাপক ভাবে পণ্যের দামে ছড়িয়ে পড়েনি বলেই মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
কম বৃষ্টি হলে বাড়তে পারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ
আগামী দিনে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে বর্ষা। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর বা IMD অগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে মরসুমের দ্বিতীয়ার্ধে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
বর্ষা দুর্বল হলে কৃষি উৎপাদনে তার প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন কমলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও এখনও তা উচ্চস্তরে রয়েছে। ফলে সংস্থাগুলির উপর খরচের চাপ পুরোপুরি কাটেনি।
সব মিলিয়ে, RBI-এর অগস্ট বুলেটিনে ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একই সঙ্গে আশার এবং সতর্কতার ছবি উঠে এসেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা, শিল্পোৎপাদন এবং কর্পোরেট মুনাফা বৃদ্ধির মতো শক্তিশালী ভিত অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেও দুর্বল বর্ষা, খাদ্যপণ্যের দাম, অপরিশোধিত তেলের মূল্য, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা আগামী দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
