নয়াদিল্লি: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের যুগে ১৩৫ বছরের পুরনো আইন বদলে নতুন কাঠামো আনল সংসদ। Bankers’ Books Evidence Bill, 2026-এর মাধ্যমে ১৮৯১ সালের Bankers’ Books Evidence Act-কে আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন আইনে ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল ব্যাংকিং রেকর্ডকে আইনি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। সংসদের বাদল অধিবেশনে বিলটি পাশ হয়েছে। লোকসভায় ৫ অগস্ট বিলটি কোনও আলোচনা ছাড়াই ধ্বনি ভোটে পাশ হয়।
১৮৯১ সালে যখন ব্যাংকের হিসাব মূলত খাতা, লেজার ও অন্যান্য কাগজপত্রে সংরক্ষিত হতো, তখন সেই সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী আইনটি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকিং তথ্যই কম্পিউটার ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় তৈরি ও সংরক্ষিত হয়। নতুন আইন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে আইনি কাঠামোর সামঞ্জস্য ঘটাতে চাইছে।
– বিজ্ঞাপন –
আদালতে ডিজিটাল ব্যাংক রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল ‘bankers’ books’-এর সংজ্ঞার মধ্যে ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল রেকর্ডকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। ফলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে ব্যাংকের ডিজিটাল রেকর্ড আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
তবে শুধু ডিজিটাল রেকর্ড থাকলেই হবে না। সেই রেকর্ডের নির্ভুলতা, নিরাপত্তা এবং অননুমোদিত পরিবর্তন বা তথ্য বিকৃতির সম্ভাবনা না থাকার মতো একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে। ডিজিটাল রেকর্ডের কপির সঙ্গে নির্দিষ্ট তথ্য-সহ একটি সার্টিফিকেটও থাকতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক আধিকারিকের হাতে বা ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে অনুমোদিত হতে পারে।
মূল নথির বদলে সার্টিফায়েড কপি
নতুন ব্যবস্থাতেও ব্যাংকের মূল রেকর্ড আদালতে হাজির করার পরিবর্তে সার্টিফায়েড কপি বা নির্যাস ব্যবহারের সুযোগ থাকছে। বিপুল পরিমাণ ব্যাংকিং তথ্যের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা আদালত এবং ব্যাংক—দুই পক্ষেরই সময় ও পরিশ্রম কমাতে পারে।
ডিজিটাল রেকর্ডের ক্ষেত্রে কপিটি সত্য এবং নির্ভুল কি না, তথ্য অনুমোদিত ব্যক্তি প্রবেশ করিয়েছেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কোনও অননুমোদিত পরিবর্তন বা সিস্টেমে হস্তক্ষেপ হয়েছে কি না—সেগুলিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তদন্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়ার সুযোগ
নতুন আইনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত দিক হল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়ার বিধান।
নির্দিষ্ট পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিকরা আদালতের পৃথক নির্দেশ ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছ থেকে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্য চাইতে পারবেন। সাধারণ পরিস্থিতিতে এই ধরনের তথ্য চাওয়ার বিষয়টি গ্রাহককে জানাতে হবে।
তবে চলমান তদন্ত, সংগঠিত আর্থিক অপরাধ বা জাতীয় নিরাপত্তার মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রাহককে না জানানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। এই বিধান নিয়েই গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বারবার আদালতে হাজির হতে হবে না ব্যাংক আধিকারিকদের
ব্যাংক কোনও মামলার সরাসরি পক্ষ না হলে, শুধুমাত্র ব্যাংকের রেকর্ড প্রমাণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে আদালতে হাজির করানো বা মূল ব্যাংক রেকর্ড পেশ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে সুরক্ষা থাকছে।
তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত আধিকারিককে রেকর্ড পেশ করার নির্দেশ দিতে পারে। যেমন—রেকর্ডের সত্যতা বা নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে, নিয়মিত রেকর্ড সংরক্ষণে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে বা আদালতের নির্দেশ মেনে ব্যাংক রেকর্ড না দিলে এমন নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে।
ব্যাংকের বাইরেও ছড়াতে পারে নতুন আইনের আওতা
নতুন আইনে কেন্দ্রীয় সরকারকে আর্থিক ক্ষেত্রের অন্য সংস্থা বা সংস্থাগুলির কোনও শ্রেণির ক্ষেত্রে এই আইনের বিধান সম্প্রসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এর আওতায় ভবিষ্যতে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক সংস্থা (NBFC), বিমা সংস্থা, পেনশন ফান্ড এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আনা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্র সরকার এই সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে আলাদা শর্ত, ব্যতিক্রম বা পরিবর্তিত বিধানও নির্ধারণ করতে পারবে।
গোপনীয়তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বাস্তবতার সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং আদালতে ইলেকট্রনিক রেকর্ড ব্যবহারের পথ সহজ করাই নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য। তবে পুলিশি তদন্তে গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গ্রাহককে সেই তথ্য না জানানোর বিধান থাকায় ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ, ১৮৯১ সালের কাগজের খাতা-লেজারের যুগ থেকে ব্যাংকিং যখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল বাস্তবতায় পৌঁছেছে, নতুন আইন সেই পরিবর্তনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং তথ্যের ব্যবহার ও সুরক্ষা—দুই ক্ষেত্রেই নতুন কাঠামো তৈরি করছে।
