
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
আট মাসের গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে কাজে গিয়েছিলেন পলাশ জলদাস। বিয়ে করেছিলেন এক বছরের কিছু আগে। কিন্তু শুক্রবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পুরনো জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারিয়ে প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে তার আর ফেরা হলো না, অনাগত সন্তানকেও আর দেখা হলো না।
“ও ছিল আমাদের ২ ভাই তিন বোনের মধ্যে তৃতীয়। আমাদের বাবা দিনমজুরের কাজ করেন। আমি সেলুনে কাজ করি। জাহাজে কাটার ম্যানের কাজ করতেন তিনি,” বলছিলেন নিহত পলাশ জলদাসের ভাই শুভ জলদাস।
যে শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনাটি হয়েছে তার কাছে পরিবারের সবাই একসাথেই থাকতেন তারা। শুভ জলদাস বলছেন, তারা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি যে তার ভাই আর ফিরবে না।
ওই দুর্ঘটনায় আরও যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের একজন হলেন মতিউর রহমান সাজ্জাদ। বিশ বছর বয়েসি এই যুবক মূলত জাহাজটিতে গিয়েছিলেন অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করতে। অক্সিজেন বহনকারী গাড়ির হেলপার হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি।
“তারা অক্সিজেন নিয়ে জাহাজে যাওয়ার পর আমার ভাই যেখানে জাহাজ কাটার কাজ হচ্ছিলে একেবারে সেখানে চলে গিয়েছিল। ফলে দুর্ঘটনার সময় সে আর বেরিয়ে আসতে পারে নাই। আটকা পড়ে সেখানেই মৃত্যু হয়েছে তার,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তার মামাতো ভাই মোঃ শাহজাহান।
তিনি জানান, নিহত সাজ্জাদের বাবা- মা দুজনেই অসুস্থ এবং তিন বোনের মধ্যে বড় বোন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি।
“ওদের পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎসই ছিল সাজ্জাদ। একটা বোন এখনো অবিবাহিত। লেখাপড়া বাদ দিয়ে তিন বছর ধরে সাজ্জাদ জাহাজ ভাঙ্গার কাজ করছিল। আয় রোজগার হচ্ছিল যা দিয়ে পরিবারটি চলতো। আমরা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি যাতে এই পরিবারটির একটি নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করে দেয়,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সীতাকুণ্ড উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ফখরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে শনিবার জানিয়েছেন যে, দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া আহত আরও ৫ জনের চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মি. ইসলাম জানিয়েছেন, জাহাজটিতে দুর্ঘটনা কেন হলো তা খুঁজে বের করতে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং তারা কাজ শুরু করেছে।
এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞরা আজ শনিবার জাহাজটি পরিদর্শন করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

বারবার দুর্ঘটনা কেন
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, জাহাজ ভাঙ্গা হলো বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজগুলোর একটি এবং এই শিল্পটি হলো সবচেয়ে দূষিত শিল্প।
জাতিসংঘের হিসেবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জাহাজ ভাঙ্গা অর্থাৎ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ৮০ ভাগই হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও তুরস্কে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় ভারতে।
এনজিও শিপব্রেকিং প্লাটফরমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের পর থেকে ১ হাজারের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙ্গার কাজ হয় এমন শিপইয়ার্ডগুলোতে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ‘বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকতে বিষাক্ত জাহাজ ভাঙার কাজ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ইউরোপীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো জেনেশুনেই তাদের পুরনো জাহাজগুলো স্ক্র্যাপ বা ভাঙ্গার জন্য বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকতে পাঠাচ্ছে। সেখানে শ্রমিকরা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও পরিবেশদূষণকারী পরিস্থিতির মধ্যে জাহাজগুলো ভেঙে ফেলছেন”।
২০২০ সাল থেকে আনুমানিক ২০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক দেশের সমুদ্রসৈকতে ৫২০টিরও বেশি জাহাজ ভেঙেছেন বলে ২০২৩ সালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। এটি অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও এনজিও শিপব্রেকিং প্লাটফরম এর একটি প্রতিবেদনে একটি পুরো নেটওয়ার্কের কথা বলা হয়েছিল, যার মাধ্যমে ‘জাহাজ মালিকরা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এড়িয়ে যাচ্ছে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ অনুযায়ী, ‘পর্যাপ্ত পরিবেশগত ও শ্রমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই- এমন জায়গায় জাহাজ স্ক্র্যাপ করা নিষিদ্ধ’ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল।
যদিও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) বর্তমান সভাপতি হলেন মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী বলছেন, অভিযোগগুলো পুরনো এবং এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই।
“পরিবেশ, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক সহ সব বিভাগের সার্টিফিকেট পাওয়ার পর একটি পুরনো জাহাজে হাত দেওয়া হয়। জাহাজটির আগের যারা মালিক তাদেরও বিক্রির সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সার্টিফিকেট নিতে হয়। এসব কারণে শিপ ব্রেকিং শিল্পে দুর্ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
তার দাবি অনুযায়ী, জাহাজের আগের মালিকদের দায়িত্ব ছিল জাহাজটি পরিষ্কার করে নিরাপদ করা এবং এরপর সেটি নতুন মালিকদের কাছে আসবে।
তবে শুক্রবার সীতাকুণ্ডের দুর্ঘটনায় নয়জন মারা যাওয়ার পর স্থানীয় সাংবাদিক নয়ন বড়ুয়া জয় বিবিসিকে বলেছিলেন, জাহাজে সিলিন্ডার ছিল। সিলিন্ডারের পাশে একটি ট্যাংক ছিল।
ওই ট্যাংক কাটতে গিয়ে ওখান থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। “কোনো বিস্ফোরণ হয়নি। বিষক্রিয়াতেই সবাই মারা গেছে,” বলছিলেন তিনি।
শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিভাগে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, “সাধারণত এইসব জাহাজ কাটিং-এর আগেই ক্লোরিন অথবা কার্বন মনোঅক্সাইড গ্যাস যাতে উৎপন্ন না হয়, সে কারণে গাদ ফ্রি করে কাটতে হয়। ফ্রি করে না কাটার কারণেই পাইপে যে গ্যাসগুলো জমে ছিল, ওই গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে”।
তবে মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী বলেছেন, “যে জাহাজে দুর্ঘটনা হয়েছে সেটিতে এলএনজি বহন করা হতো। এর আগে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর হয়নি। দেড় বছর আগে পাওয়া এই জাহাজটিতে সাবধানতার সাথে কাজ করা হচ্ছিল। এমনকিও যে ইয়ার্ডে কাজ হচ্ছিলো সেটিও সার্টিফায়েড গ্রিন ইয়ার্ড ছিল। তারা দক্ষতার সাথেই কাজ করে থাকে। এরপরেও কেন দুর্ঘটনা হলো সেটি নিশ্চয়ই তদন্তে বেরিয়ে আসবে”।
তিনি জানান যে একটি জাহাজ ভাঙ্গা বা কাটার কাজ শুরু আগে অনেক ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়।
“কোথায় গ্যাস বা এ ধরনের কিছু আছে তা দেখতে হয়। পুরো জাহাজটি পরিষ্কার করা নিশ্চিত করতে হয়। কোথায় কিভাবে কাজ করা হবে ঠিক করতে হয়। যারা কাজ করবে তারা কিভাবে যাবে, আসবে ও কাজ করবে তা নির্ধারণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্বারা এগুলো নিশ্চিত হওয়ার পর ভাঙ্গার কাজে হাত দেওয়া হয়”।
তবে ওই কারখানার একজন শ্রমিক ঘটনার পর অভিযোগ করেছিলেন, ওই কারখানায় কোনো অক্সিজেন ও গাড়ির ব্যবস্থা ছিল না।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং দুই কমিটিই তাদের কাজ শুরু করেছে।
শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি মহসিন চৌধুরী।
ছবির উৎস, Getty Images
কেন বিপজ্জনক
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলছে, জাহাজের কাঠামো খুব জটিল হওয়ার কারণে জাহাজ ভাঙার কাজ একটি জটিল ও কঠিন প্রক্রিয়া।
“এতে বিপুল পরিমাণ ক্যানসার সৃষ্টিকারী ও বিষাক্ত পদার্থ—যেমন অ্যাসবেসটস, পারদ, সিসা, আইসোসায়ানেট এবং সালফিউরিক অ্যাসিড- শুধু শ্রমিকদের শরীরেই বিষক্রিয়া ঘটায় না, এগুলো মাটি ও উপকূলীয় পানিতেও ফেলে দেওয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে পেশাগত স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ওপর গুরুতর ক্ষতি সৃষ্টি হয়”।
একটি গড় আকারের একটি জাহাজে ৭ টন পর্যন্ত অ্যাসবেস্টস থাকতে পারে বলে আইএলও উল্লেখ করেছে। এগুলো সাধারণত স্থানীয়দের কাছেই বিক্রি করা হয়। এছাড়া জাহাজের রং, কোটিং এবং জাহাজে থাকা বিভিন্ন সরঞ্জাম থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে এমন ভারী ধাতু।
এবার যে জাহাজে দুর্ঘটনা হয়েছে সেটিতে আগে এলএনজি বহন করা হতো। সাধারণত তেল ও গ্যাস বহনকারী জাহাজগুলোতে তেল ও লুব্রিকেন্ট পড়ে থাকার কারণে আরও বেশি ঝুঁকির হয়ে থাকে।
মহসিন চৌধুরী জানিয়েছেন, জাহাজভাঙ্গা শিল্পকে নিরাপদ করতে দেশের আইনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কিছু চুক্তিও রয়েছে।
“আমরা এখন হংকং কনভেনশন অনুসরণ করছি। এতে বিপজ্জনক পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলার বিষয়টিও আছে,” বলছিলেন তিনি।
বাংলাদেশ হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপসে যোগ দিয়েছে ২০২৩ সালের জুনে।
ছবির উৎস, Getty Images
তদন্ত কমিটি
শুক্রবার সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলায় ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছিলেন যে, “জাহাজ কাটছে, তখন গ্যাস লিকেজ হয়ে মারা গেছে”।
জাহাজটিতে দুর্ঘটনা কেন হলো তা খুঁজে বের করতে দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং তারা কাজ শুরু করেছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এদিকে আজ শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জাহাজটিতে স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান।
তিনি বলেন, যেখানে হয়েছে সেটা কমপ্লায়েন্স একটা ইয়ার্ড অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদন্ডে যা যা করা দরকার সেটি তারা করেছে কিন্তু তারপরেও দুর্ঘটনা হয়েছে।
“আমরা দেখছি কেন ঘটনাটা ঘটল। যদি এখানে কারও কোনো অবহেলা থেকে থাকে, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনা না ঘটে,” বলেছেন তিনি।
সীতাকুণ্ড উপজেলার নির্বাহী অফিসার ফখরুল ইসলাম আজ বলেছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
