ভারতের জাতীয় পতাকা আজ যে তেরঙ্গা রূপে পরিচিত, তা কোনও একদিনে তৈরি হয়নি। স্বাধীনতা আন্দোলনের দীর্ঘ পথের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে তার রং, প্রতীক ও নকশা। ১৮৮৩ সালে কথিত একটি প্রাথমিক পতাকার ধারণা থেকে শুরু করে ১৯০৬-এর স্বদেশি আন্দোলন, মাদাম ভিকাজি কামার বিদেশের মাটিতে পতাকা উত্তোলন, হোম রুল আন্দোলনের পতাকা, পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার চরকা—সবশেষে ১৯৪৭ সালে চরকার জায়গায় আসে অশোকচক্র। এই দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাসেই লুকিয়ে রয়েছে স্বাধীন ভারতের জাতীয় প্রতীকের জন্মকথা।
১৮৮৩: জাতীয় পতাকার প্রাথমিক পূর্বসূরির দাবি
পতাকা-গবেষণার কিছু সূত্রে ১৮৮৩ সালে লাহোরে শিরীষচন্দ্র বসুর প্রস্তাবিত একটি পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত সেই পতাকাটি ছিল বর্গাকার এবং তার কেন্দ্রে ছিল লাল সূর্যের প্রতীক।
– বিজ্ঞাপন –
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই পতাকাকে ভারতের ‘প্রথম জাতীয় পতাকা’ হিসেবে সরকারি ভাবে স্বীকৃত বলা যায় না। জাতীয় পতাকার বিবর্তন নিয়ে সরকারি ঐতিহাসিক নথিতে ধারাবাহিকভাবে যে ইতিহাসটি তুলে ধরা হয়, তার গুরুত্বপূর্ণ সূচনা ১৯০৬ সালের কলকাতার পতাকা থেকেই। তাই ১৮৮৩ সালের ঘটনাটিকে ‘জাতীয় পতাকার প্রাথমিক পূর্বসূরির একটি’ হিসেবে উল্লেখ করাই বেশি তথ্যনিষ্ঠ।
১৯০৫: স্বদেশি আন্দোলনের আবহে নতুন পতাকার ভাবনা
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালে বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। এই সময় জাতীয় প্রতীক হিসেবে একটি নিজস্ব পতাকার প্রয়োজনীয়তার ভাবনাও জোরালো হয়।
এই পর্বে ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে যুক্ত একটি পতাকার নকশার কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। লাল রঙের সেই নকশায় বজ্রের প্রতীক ও ‘বন্দেমাতরম’ লেখা ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে এটিও বর্তমান জাতীয় পতাকার সরকারি পূর্বসূরি হিসেবে স্বীকৃত কোনও একক নকশা নয়; বরং সেই সময়কার জাতীয়তাবাদী প্রতীক-চর্চার অংশ।
১৯০৬: কলকাতায় ত্রিবর্ণ পতাকা
জাতীয় পতাকার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলির একটি ১৯০৬ সাল। স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলনের সময় কলকাতার পার্সি বাগান স্কোয়ারে একটি ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারি নথিতেও ১৯০৬ সালের এই পতাকাকে ভারতের পতাকার বিবর্তনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পতাকাটিতে ছিল লাল, হলুদ ও সবুজ রং। বিভিন্ন প্রতীক হিসেবে ছিল পদ্ম, ‘বন্দেমাতরম’, সূর্য ও অর্ধচন্দ্র। অর্থাৎ, তখনও পতাকার নকশায় জাতীয়তাবাদী আবেগ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐক্যের নানা প্রতীক একসঙ্গে জায়গা করে নিচ্ছিল।
১৯০৭: দেশের বাইরে ভারতের পতাকা
এর পরের বছর ১৯০৭ সালে মাদাম ভিকাজি কামা ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, তিনি ভারতের একটি পতাকা বিদেশের মাটিতে উত্তোলন করেন এবং সেটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বার্তা বিশ্বের সামনে পৌঁছে দেয়। স্টুটগার্টের আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনের সঙ্গে এই ঘটনার উল্লেখ বিশেষ ভাবে জড়িত।
এই পতাকায় ‘বন্দেমাতরম’ লেখা ছিল এবং নকশায় ১৯০৬ সালের পতাকার সঙ্গে বেশ কিছু মিল ছিল।
১৯১৭: হোম রুল আন্দোলনের পতাকা
জাতীয় পতাকার বিবর্তনে পরের গুরুত্বপূর্ণ বছর ১৯১৭। অ্যানি বেসান্ত ও বাল গঙ্গাধর তিলকের হোম রুল আন্দোলনের সময় একটি নতুন পতাকা ব্যবহার করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারি নথিতেও ১৯১৭ সালের এই পতাকার উল্লেখ রয়েছে।
এই পতাকায় লাল ও সবুজ রঙের একাধিক অনুভূমিক দাগ, সপ্তর্ষির সাতটি তারা, চাঁদ ও তারা এবং এক কোণে ইউনিয়ন জ্যাক ছিল। এর মূল রাজনৈতিক বার্তা ছিল ভারতের স্বশাসনের দাবি।
১৯২১: পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়ার চরকা
১৯২১ সাল জাতীয় পতাকার বিবর্তনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজয়ওয়াড়া—তৎকালীন বেজওয়াদা—কংগ্রেস অধিবেশনে তরুণ স্বাধীনতা সংগ্রামী পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া মহাত্মা গান্ধীর কাছে একটি পতাকার নকশা উপস্থাপন করেন।
নকশায় রং ও প্রতীকের পরিবর্তনের পাশাপাশি মাঝখানে চরকা স্থান পায়। চরকা তখন স্বদেশি, আত্মনির্ভরতা এবং দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৩১: গৈরিক-সাদা-সবুজ তেরঙ্গার ভিত্তি
১৯৩১ সাল জাতীয় পতাকার ইতিহাসে আর একটি বড় বাঁক। ওই বছর কংগ্রেস একটি ত্রিবর্ণ পতাকা গ্রহণ করে। পতাকার রং ছিল গৈরিক, সাদা ও সবুজ, আর মাঝখানে ছিল চরকা। সরকারি নথি অনুযায়ী, আগের নকশার রং পরিবর্তন করে গৈরিক, সাদা ও সবুজ গ্রহণ করা হয়।
এই পতাকাই পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকার নকশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
২২ জুলাই ১৯৪৭: চরকার বদলে অশোকচক্র
স্বাধীনতার ঠিক আগে এল শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ২২ জুলাই ১৯৪৭, গণপরিষদের বৈঠকে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে বর্তমান তেরঙ্গা গ্রহণ করা হয়।
গৈরিক, সাদা ও সবুজ—এই তিন রং রাখা হলেও মাঝখানের চরকার পরিবর্তে সারনাথের অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র স্থান পায়। নীল রঙের এই অশোকচক্রে রয়েছে ২৪টি কাঁটা বা স্পোক। সরকারি জাতীয় পোর্টাল অনুযায়ী, এই ধর্মচক্র অশোকের সারনাথ সিংহস্তম্ভের আবাকাসে থাকা চক্রের আদলে তৈরি।
১৫ আগস্ট ১৯৪৭: স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা
১৫ আগস্ট ১৯৪৭, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সঙ্গে তেরঙ্গা স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে নতুন মর্যাদা পায়। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারত প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার পরও একই পতাকা দেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে বহাল থাকে।
