১৯৪৭ সালের অগস্টে দেশভাগের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান। রাজনৈতিক ভাবে দু’টি পৃথক রাষ্ট্র তৈরি হলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রাতারাতি আলাদা হয়ে যায়নি। বরং স্বাধীনতার পর প্রায় ১১ মাস পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের দায়িত্ব সামলেছিল ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা RBI।
আজকের দিনে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সেই সময়ের মুদ্রার ইতিহাসে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। পাকিস্তানের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তৈরি না হওয়া পর্যন্ত RBI-ই পাকিস্তান সরকারের ব্যাঙ্কিং ও মুদ্রা সংক্রান্ত ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিল।
– বিজ্ঞাপন –
কেন পাকিস্তানকে RBI-এর সাহায্য নিতে হয়েছিল?
দেশভাগের সময় পাকিস্তানের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বা সুসংগঠিত ব্যাঙ্কিং পরিকাঠামো ছিল না। ফলে নতুন দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখতে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় RBI-কে। পাকিস্তান সরকারের আর্থিক লেনদেন, মুদ্রা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ব্যাঙ্কিং কার্যক্রম চালু রাখতে RBI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
মজার বিষয় হল, দেশভাগের আগে RBI-এর মুদ্রা দফতরের কার্যালয় ছিল করাচি ও লাহোরেও। দেশভাগের পর সেই পরিকাঠামোর একটি অংশ নতুন পাকিস্তানের সীমানার মধ্যে পড়ে যায়।
ভারতীয় নোটেই লেখা হল ‘Government of Pakistan’
পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে নতুন নকশার নোট ছাপানো সম্ভব হয়নি। তাই আগের প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থাই সাময়িক ভাবে চালু রাখা হয়। পাকিস্তানের সরকারি মুদ্রা-ইতিহাসেও উল্লেখ রয়েছে যে দেশভাগের সময় পাকিস্তানের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল না এবং আগের প্রচলিত নোট ও কয়েনই ব্যবহার করা হয়।
এই অন্তর্বর্তী সময়ের মুদ্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল নোটের উপর পাকিস্তান সরকারের পরিচয়। ভারতীয় নোটের নকশা বজায় রেখেই তাতে ‘Government of Pakistan’ এবং উর্দুতে ‘Hakumat-e-Pakistan’ লেখা হয়েছিল। ফলে নোটগুলি হয়ে উঠেছিল দেশভাগের পরবর্তী সেই অদ্ভুত সময়ের ঐতিহাসিক দলিল।
বিজ্ঞাপন
অবশেষে এল পাকিস্তানের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক
পাকিস্তান দ্রুত নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়। ১৯৪৮ সালের ১২ মে State Bank of Pakistan Order জারি করা হয়। এরপর ৩০ জুন পাকিস্তানে RBI-এর দায়িত্ব শেষ হয় এবং পরদিন, অর্থাৎ ১ জুলাই ১৯৪৮, State Bank of Pakistan কাজ শুরু করে।
করাচিতে নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের উদ্বোধন করেন মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ। প্রথম গভর্নর হন জাহিদ হুসেন।
তবে এখানেই মুদ্রার গল্প শেষ হয়নি। পাকিস্তানকে নিজস্ব নোট ছাপাতেও সময় লেগেছিল। ১৯৪৮ সালের ১ অক্টোবর পাকিস্তান সরকার ৫, ১০ ও ১০০ রুপির জরুরি নোট প্রকাশ করে। পরের বছর মার্চে State Bank of Pakistan নিজস্ব নোটের প্রথম সিরিজ চালু করে।
দুই দেশের টাকার পথ আলাদা হল আরও পরে
রাজনৈতিক দেশভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আলাদা হল ১৯৪৮-এ। কিন্তু ভারতীয় ও পাকিস্তানি রুপির আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে আরও পরে।
১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত স্টার্লিংয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রুপির অবমূল্যায়ন করলেও পাকিস্তান সেই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করেনি। এর ফলে দুই দেশের মুদ্রার মধ্যে আগের সমতা ভেঙে যায় এবং দুই দেশের বাণিজ্যেও বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়।
অর্থাৎ, দেশভাগের সীমানা ১৯৪৭-এই তৈরি হলেও মুদ্রার পূর্ণ বিচ্ছেদ ছিল ধাপে ধাপে চলা একটি প্রক্রিয়া। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়গুলির একটি হল—স্বাধীন পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রথম কয়েক মাসের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ছিল ভারতের RBI।
