ছবির উৎস, Philip Brown/Getty Images
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি টোয়েন্টি ফরম্যাটে ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট টিমের ব্যর্থতার ক্ষত অনেকটা ঢাকা পড়ে গেল ভারতের নারী ক্রিকেট টিমের টেস্ট ক্রিকেট জয়ে।
হাতে চারটি উইকেট নিয়ে খেলতে নেমেছিল ইংল্যান্ড। ভারতীয় সময় সাড়ে পাঁচটার আগেই সবকটি উইকেট পড়ে যায়। জয়ী ঘোষিত হয় ভারতীয় দল।
এটি ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য, কারণ তারা ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়েছিল।
এটি লর্ডসে অনুষ্ঠিত প্রথম মহিলাদের টেস্ট ম্যাচ। এই মাঠে প্রথম পুরুষদের টেস্ট ম্যাচ খেলা হয়েছিল ১৪২ বছর আগে।
পুরুষ দলগুলোর মধ্যে প্রথম টেস্ট ম্যাচটি লর্ডসে ১৮৮৪ সালের ২১ থেকে ২৩শে জুলাইয়ের মধ্যে খেলা হয়েছিল। এই ম্যাচে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়াকে এক ইনিংস ও পাঁচ রানে পরাজিত করে।
তারপর থেকে এখানে ১৫০টি টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো মহিলাদের টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই ঐতিহাসিক ম্যাচে প্রথম জয়লাভ করল ভারতীয় নারী ক্রিকেট দল। শেষ ইনিংসে শেষ বলটি করেন স্নেহ রানা। সেই বল তখন ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকা সোফি এক্লেস্টোনের ব্যাট এড়িয়ে সোজা স্টাম্পে ধাক্কা মারে।
তবে প্রথম দিন থেকেই ভারতীয় দলের খেলোয়াড়রা বেশ চাপে রেখেছিলেন ইংল্যান্ডকে।
মোট সাতটি উইকেট হারিয়ে প্রথম ইনিংসে ২৫৮ রান ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৪১ রান তোলেন ভারতীয় খেলোয়াড়রা।
ইংল্যান্ডের ক্রিকেট দল তাদের প্রথম ব্যাটিং ইনিংসে মাত্র ১৭০ রান তুলতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের জয় ঘোষণার আগে তারা ১৮৬ রান করতে পেরেছিলেন।
ছবির উৎস, Stu Forster/Getty Images
প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ হলেন ক্রান্তি গৌড়
টসে জিতে ইংল্যান্ড প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেয়, এরপর ভারতীয় ক্রিকেট দল প্রথম ইনিংসে ২৮৫ রান করে।
স্মৃতি মান্ধানা ৮৩ এবং অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর ৫৮ রান করেন।
ভারতীয় দল দুর্দান্ত বোলিং করে ইংল্যান্ডকে ১৭০ রানে অলআউট করে দেয় এবং ১১৫ রানের লিড নেয়।
প্রথম ইনিংসে, মিডিয়াম-পেসার ক্রান্তি গৌর ৩৭ রানে পাঁচটি উইকেট নিয়ে হল অফ ফেমে জায়গা করে নেন। তিনি লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টেস্ট ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রথম বোলার হন।
সায়লি সাতঘরে ও স্নেহ রানা দুটি করে উইকেট নেন এবং দীপ্তি শর্মা একটি উইকেট নেন।
জয়ের পড়ে ক্রান্তি গৌড় বলেন যে, “বড় হওয়ার সময়ে এমন কিছু ঘটবে বলে আমি কখনো কল্পনাও করিনি। তবে এই টেস্ট ম্যাচটির শুরুর দিন থেকেই আমি নিজেকে বলেছিলাম যে, ‘অনার্স বোর্ডে’ নিজের নাম লেখাতে চাই।”
ছবির উৎস, Stu Forster/Getty Images
নজর কাড়লেন ইয়াস্তিকা ভাটিয়া
ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসে বামহাতি ব্যাটার ইয়াস্তিকা ভাটিয়ার সেঞ্চুরি জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছিল ভারতকে।
লর্ডসের মাঠে তার ১৪৫ বলে সেঞ্চুরির দোরগোড়ায় পৌঁছনো ভারতীয় দলকে তো বাড়তি সুববিধা দিয়েইছিল, কিন্তু এরই সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন লর্ডসে টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা প্রথম নারী।
রবিবার ১২ই জুলাইয়ের ইনিংসে যখন ইয়াস্তিকাখেলতে শুরু করেছিলেন, তখন তিনি অপরাজিত ছিলেন ৩৯ রানে। ইংলিশ বোলার লরেন বেল তার ব্যাটের ভেতরে আঘাত করে স্টাম্পে আঘাত করলেও, বেলস পড়েনি। তাই তাকে আউট ঘোষণা করা যায়নি।
ইয়াস্তিকা ভাটিয়া এই ম্যাচে মোট ১১৩ রান করেন এবং ১৪টি চার মারেন।
লর্ডস টেস্টে সেঞ্চুরি করা ভারতীয় ক্রিকেটারদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন গুজরাতের ভদোদরার ইয়াস্তিকা। এই তালিকায় রয়েছেন ভিনু মানকাড, দিলীপ ভেংসারকার, মহম্মদ আজহারউদ্দিন, সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড় ও লোকেশ রাহুল।
ইয়াস্তিকার এই উজ্জ্বল ইনিংসের পর একাধিক প্রবীণ ক্রিকেটার ও বিশেষজ্ঞ তার প্রশংসা করছেন।
প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার শিখর ধাওয়ান এক্স পোস্টে লেখেন, ‘ইয়াস্তিকা, এই স্মরণীয় ইনিংসের জন্য আপনাকে অনেক অভিনন্দন। আশা করি, ভবিষ্যতে আমরা আপনার ব্যাট দিয়ে এমন আরও অনেক দুর্দান্ত ইনিংস দেখতে পাব।”
ধারাভাষ্যকার হর্ষ ভোগলে লেখেন, “ক্রিকেট যখন শক্তির খেলা নয়, দক্ষতা ও কৌশলের খেলা, তখন ভারতীয় মহিলা দলকে সম্পূর্ণ আলাদা দেখায়। এবারের টেস্ট ম্যাচে ভারতীয় খেলোয়াড়রা প্রতিটি বিভাগেই নিজেদের আধিপত্য দেখিয়েছেন। তিনি ইংল্যান্ডের উপর পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।”
প্রাক্তন ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রী লেখেন, ‘ইয়াস্তিকা, ক্রান্তি… আপনারা দুজনেই অনবদ্য কাজ করেছেন। ক্রিকেটের সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন মাঠ লর্ডস অনার্স বোর্ডে আপনাকে স্বাগত। এই অর্জন আপনার বাকি জীবন আপনার সাথে থাকবে। এই মুহূর্তটি প্রত্যেক ভারতীয় নারী ক্রিকেটারের জন্য অনুপ্রেরণা, যাঁরা বড় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। “
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই ইয়াস্তিকাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, “স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা এবং ইতিহাস গড়ে ফিরে আসা।”
অন্যদিকে স্মৃতি মান্ধানাও দ্বিতীয় ইনিংসে ৭০ রান করে হাফ সেঞ্চুরি করেন। পশ্চিমবঙ্গের রিচা ঘোষও ৫০ রান করেন।
দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেটে ৩৪১ রান করে ভারতীয় দল তাদের ইনিংস সমাপ্ত করে এবং ইংল্যান্ডকে ৪৫৭ রানের লক্ষ্যমাত্রা দেয়।
দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতীয় বোলাররাও খুব নিখুঁত বোলিং করেন। স্পিনার স্নেহ রানা ৪২ রানে চারটি উইকেট নেন।
সায়লি সাতঘরে, ক্রান্তি গৌড় এবং দীপ্তি শর্মা প্রত্যেকে দুটি করে উইকেট নেন।
ছবির উৎস, Stu Forster – ECB/ECB via Getty Images
কী বললেন অধিনায়করা?
এক সাংবাদিক ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন হরমনপ্রীত কৌরকে জিজ্ঞেস করেন যে এই জয় তিনি ম্যাচের আগেই দেখতে পেয়েছিলেন কিনা।
জবাবে ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন মিজ. কৌর বলেন, “ঈশ্বরই ভবিষ্যতের নিয়ন্তা ও তিনি খুব চমৎকারভাবেই নিয়তি লিখেছেন।”
নিজের টিম সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের ওপেনাররাই আমাদের মূল শক্তি। ম্যাচের প্রথমার্ধে তারা যেভাবে ব্যাট করেছে, তা সত্যিই উপভোগ করার মতো দৃশ্য ছিল।
টেস্টের ফলাফল বিষয়ে তিনি বলেন, “কঠিন পরিশ্রমই আসল চাবিকাঠি। আমাদের সাপোর্ট স্টাফরা প্রচুর টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন এবং এই ফরম্যাটের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাদের গভীর ধারণা রয়েছে; তারা প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও মতামত দিয়েছেন।”
এই বলে কোচ অমোল মজুমদারকে ধন্যবাদ দিয়েছেন তিনি।
ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক ন্যাট সিভার ব্রান্ট বলেন, “লর্ডসে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা অসাধারণ ছিল, তবে (আমাদের) এখনও অনেক কিছুতেই উন্নতির অবকাশ আছে।”
তার মতে, “আমার মনে হয়, প্রথম দিন পরিস্থিতির সাথে যতটা ভালোভাবে মানিয়ে নিতে হতো, ততোটা আমরা পারিনি। সঠিক লেংথ খুঁজে পেতে আমাদের কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল। তবে একবার যখন আমরা সঠিক লেংথ খুঁজে পেলাম, তখন মনে হলো আমরা সত্যিই লড়াইয়ে ফিরে এসেছি। কিন্তু এরপর সমস্যা হলো যে আমরা ক্রিজে জুটিগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারিনি, যার ফলে তাদের রানের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই এরপর থেকে ম্যাচে ফেরার জন্য আমাদের বেশ লড়াই করতে হয়েছে।”
তিনি মনে করেন, পুরো ম্যাচজুড়ে বিভিন্ন সময়ে ইংল্যান্ড নারী ক্রিকেট দল দারুণ মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে।
