বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায়ের দুই ধ্রুবতারা— উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন। খাতার কলমে ১৯৫২ সালে ‘শেষ কোথায়’ ছবির মাধ্যমে সুচিত্রা সেনের রুপোলি সফর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, দুর্ভাগ্যবশত সেই ছবি মুক্তির আলো দেখেনি। তবে পরের বছরই, অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে প্রথমবার উত্তম কুমারের বিপরীতে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। আর সেই যে রুপোলি পর্দায় এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হল, তা বাঙালি আজও পরম যত্নে মনে রেখেছে। দীর্ঘ ২৬ বছরের অভিনয় জীবনে সুচিত্রা সেন মোট ৬০টি ছবিতে কাজ করেছিলেন, যার মধ্যে ঠিক অর্ধেক— অর্থাৎ ৩০টি ছবিতেই তাঁর নায়ক ছিলেন উত্তম কুমার। কালক্রমে এই জুটিই হয়ে ওঠে বাংলা সিনেমার সর্বকালের সেরা এবং অবিসংবাদিত রোম্যান্টিক জুটি।

পর্দার সেই ম্যাজিক, সেই রসায়ন তো সকলেরই চেনা। কিন্তু লাইমলাইটের বাইরে, সেটের নেপথ্যে কেমন ছিল তাঁদের সমীকরণ? ২০১০ সালের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত মহানায়কের ছোট ভাই, অভিনেতা তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণ থেকে উঠে এসেছিল দুই তারকার ঘরোয়া বন্ধুত্বের এক দারুণ মজার টুকরো গল্প।

সে সময় স্টুডিওর এক ফ্লোরে সুচিত্রা সেনের ‘ফরিয়াদ’ ছবির শুটিং চলছে, আর পাশের ফ্লোরেই অন্য একটি ছবির কাজে ব্যস্ত উত্তম কুমার। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তরুণ কুমারও। হঠাৎই চেনা মেজাজে উত্তম কুমারের ফ্লোরে হাজির হলেন স্বয়ং ‘রমাদি’। একঘর লোক, টেকনিশিয়ানদের সামনেই সোজা মহানায়ককে প্রশ্ন করলেন, “কী উত্তম, শুটিং করছো?” উত্তম কুমার কিছুটা অবাক হয়েই বললেন, “হ্যাঁ, কেন বলো তো?”

উত্তরের তোয়াক্কা না করেই সুচিত্রা সেন ছবির পরিচালককে ডেকে নির্দেশ দিলেন, “ফ্লোরের সব লাইটগুলো একটু বন্ধ করে দিন তো!” তারপর উত্তমের দিকে ঘুরে বললেন, “তোর সঙ্গে আজ ডায়মন্ডহারবারে যাওয়ার কথা ছিল না? আর তুই এখানে শুটিং করছিস?” অত বড় মেগাস্টার তখন আমতা আমতা করছেন। পরিস্থিতি সামলাতে উত্তম কুমার কোনওমতে সুচিত্রাকে শান্ত করে বললেন, “আচ্ছা তুমি এখন তোমার ফ্লোরে যাও, আমি শটটা দিয়ে নিই। তারপর তোমার মেকআপ রুমে গিয়ে একসঙ্গে চা খাব।” যাওয়ার আগে রমাদি আবার শাসিয়ে গেলেন, “না এলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে!”

সেদিন উত্তম কুমারের শট শেষ হতে একটু দেরি হতেই সুচিত্রা সেন আবার হাজির। কপট রাগ দেখিয়ে উত্তমকে ফ্লোরের এক কোণায় ডেকে বললেন, “কী রে, তুই এলি না? নায়িকার সঙ্গে খুব প্রেম হচ্ছে বুঝি?” মহানায়ক কিছু বলার আগেই তাঁর ঠোঁটে হাত দিয়ে সুচিত্রা বলে উঠলেন, “আর একটা কথাও নয়। বাইরে আমার গাড়ি রেডি আছে, চল দু’জনে ডায়মন্ড হারবার ঘুরে আসি।”

বিপন্ন উত্তম কুমার তখন বোঝানোর চেষ্টা করছেন, “রমা, তুই পাগল হয়েছিস নাকি? এতে তোর বদনাম হয়ে যাবে। খবরের কাগজে লিখবে উত্তম সুচিত্রাকে নিয়ে পালিয়েছে!” কিন্তু সুচিত্রা সেনও দমবার পাত্রী নন। হেসেই উত্তর দিয়েছিলেন, “একটু বদনাম হোক না, ভালোই তো হবে!”

তরুণ কুমার জানিয়েছিলেন, পুরো বিষয়টিই আসলে ছিল নিখাদ খুনসুটি। শুটিং ফ্লোরে মহানায়কের পেছনে লাগার সুযোগ সুচিত্রা সেন কখনোই হাতছাড়া করতেন না। পর্দায় তাঁরা যতই বুঁদ করে রাখা প্রেমিক-প্রেমিকা হোন না কেন, ক্যামেরার পেছনে তাঁদের সম্পর্কটা ছিল এক অটুট, সহজ এবং গভীর বন্ধুত্বের। আর সেই আত্মিক টানের জোরেই আজও টলিউডের ইতিহাসে তাঁরাই একমাত্র ‘মহানায়ক’ আর ‘মহানায়িকা’।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *